নজরে বেহাল শিক্ষা-৩
শিক্ষার অব্যবস্থার বিরুদ্ধে নয়াদিল্লিতে ছাত্রদের বিক্ষোভ কেন্দ্রীয় সরকারকে নাড়িয়ে দিয়েছে। রাজ্যে স্কুলের অব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে গেছিলেন ইন্দাসের ছাত্র। বিজেপি কর্মীরা খুন করেছে তাঁর বাবাকে। কিন্তু ভয় দেখিয়ে রাজ্যে শিক্ষার অব্যবস্থাকে চাপা দেওয়া যাচ্ছে। স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়— পশ্চিমবঙ্গে বেহাল শিক্ষা ব্যবস্থা। তারই কিছু ছবি তুলে ধরতে এই প্রতিবেদন।
জয়ন্ত সাহা: কোচবিহার
খলিসামারিতে মনীষী পঞ্চানন বর্মার বাড়ি। তাঁর জীবন রাজ্যের সংস্কৃতি, শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেখানে তাঁর নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস। কিন্তু এই ক্যাম্পাসে স্নাতকোত্তর স্তরে ইতিহাস বিভাগে আবেদন করেছেন ১ জন ছাত্র!
পরিস্থিতির বড়সড় ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ নেই। বিভাগ কী উঠে যাবে? প্রশ্নের জবাব কর্তৃপক্ষের কাছেই নেই।
তবে উদাহরণ শুধু ইতিহাস বিভাগ নয়। বাংলা বিভাগেও আবেদনকারীর সংখ্যা মাত্র এক জনই। চার বছরের স্নাতক কোর্সের পর এবারই প্রথম পড়ুয়ারা স্নাতকোত্তরে আবেদন করার সুযোগ পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসের হাল কী? বাংলায় ৩৮, সংস্কৃতে ১৬, হিন্দিতে ২, ইংরেজিতে ৬২, ইতিহাসে ৩০, দর্শনে ২২, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ৬৮, শিক্ষাবিজ্ঞানে ১৬, ইকোনমিক্সে ৫, কমার্সে ৭, ফিজিক্সে ২৬, কেমিস্ট্রিতে ২১, অঙ্কে ১৩, ভূগোলে ২৮, জুলোজিতে ১৭,বোটানিতে ৩১ জন আবেদন করেছেন স্নাতকোত্তরে পড়বেন বলে। মূল ক্যাম্পাসের সান্ধ্যকালীন ইংরেজি বিভাগে মাত্র ১জন আবেদন করেছেন। আর সান্ধ্যকালীন বিভাগে বাংলা ইতিহাস,রাষ্ট্রবিজ্ঞান, এবং সংস্কৃতের মতো বিষয়ে আবেদনকারীর সংখ্যা একেবারে শূন্য! এই হাল হলে পঠনপাঠন শুরু হবে কি করে? ফের কী ভর্তির আবেদনের জন্য পোর্টাল খোলা হবে? সেটাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে আলোচনা চলছে। গত বছরও স্নাতকোত্তরে সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার খানেক পড়ুয়া ছিল। এবারে সেই সংখ্যা এক ধাক্কায় নেমে এসেছে ৫৪৮-এ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্টার মাধবচন্দ্র অধিকারী জানিয়েছেন,‘‘পড়ুয়াদের অনেকেই হয়তো চার বছরের ডিগ্রি কোর্স শেষ করে এক বছরের স্নাতকোত্তর পড়তে চাইছে। এই কারণে হয়তো স্নাতকোত্তরে পড়ুয়া কম আসছে। আমরা সরকারি নির্দেশ মেনে আগস্ট মাসেই ক্লাস শুরু করে দেবো। বিষয়টি শিক্ষা দপ্তরকে জানাবো।’’
জেলার শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষয় রোগ শুধু কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়। কোচবিহার জেলার বামফ্রন্ট আমলে গড়ে ওঠা মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্র (এমএসকে) গুলিও এখন শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে। গত ১৫ বছরে এই স্কুলগুলিতে কোনও নিয়োগ হয়নি। উদ্বেগ প্রকাশ করলেন এবিটিএ’র রাজ্য সম্পাদক সুজিত দাস। ছবিটি কেমন?
বৃহস্পতিবার ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল সাড়ে ৮টার কাছাকাছি। পচগড়ের ভবেরহাট ক্ষিতীশ চন্দ্র নাগ মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্রে (এমএসকে)-র বারান্দায় চার জন ছাত্রী খেলছিল। ক্লাস নেই এখন? জিজ্ঞেস করতেই তারা বললো,‘‘একটা ক্লাস হলো। একটু পরে আবার হবে। পাশের ক্লাসে একজন শিক্ষক চারজন ছাত্রকে পড়াচ্ছেন।’’ ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক মৃণালকান্তি সরকার জানালেন,‘‘চারজন শিক্ষক মিলে স্কুল চালাই। ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত সব মিলিয়ে ২২ জন পড়ুয়া। এদের মধ্যে ১২-১৩ জন স্কুলে আসে।’’ ক্লাস হিসাবে পড়ুয়ার সংখ্যা যথাক্রমে এই রকম— পঞ্চম শ্রেণিতে ২, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৯ সপ্তম শ্রেণিতে, ১০ এবং অষ্টম শ্রেণির ২ জন পড়ুয়া। চার শিক্ষকের মধ্যে ইংরেজি আর অঙ্কের কোনও শিক্ষক নেই। অন্যরাই সেগুলো দেখাচ্ছেন। এভাবেই চলছে এমএসকে। প্রায় ৭০ শতক জমির ওপরের এই স্কুলের বেশির ভাগ ক্লাস রুম এখন আর খুলতে হয় না। অথচ এক সময়ে স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ১৬৫ জনের বেশি ছিল। স্কুলের বেঞ্চ, টেবিল ভাঙলে আর মেরামত হয় না। গত দু’বছরে আসেনি কম্পোজিট গ্র্যান্টের টাকা। বন্ধ হয়ে গেছে। টিএলএমের বরাদ্দ স্কুল গ্র্যান্ট আসেনি কয়েক বছর ধরে। স্কুলের বিদ্যুতের বিল দু’বছর মেটানো হয়নি। যে কোনোদিন সংযোগ কেটে দিতে পারে বিদ্যুৎ নিগম। কোচবিহার-১ ব্লকের দীনেশ চন্দ্র এমএসকে চলছে ৬০ জন পড়ুয়া নিয়ে। দোমুখা নয়ারহাট এমএসকে’তেও দু’জন শিক্ষক ৬৫ জন পড়ুয়াকে পড়াচ্ছেন। দেওয়ানহাট এমএসকে’তে পড়ুয়ার সংখ্যা মাত্র ৪৫ জন। এখানেও মাত্র দু’জন শিক্ষক। জেলার শিতলখুচি ব্লকের ৭ টি এমএসকের মধ্যে ৬ টিই রুগ্ন। শিক্ষক আর পড়ুয়ার অভাবে ধুঁকছে স্কুলগুলি। গোলেনাওহাটি এমএসকে-র প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহমান বলেন, একসময়ে এই স্কুলে ২০০-র বেশি পড়ুয়া ছিল। শিক্ষক ছিল চার জন। এখন তিনজন শিক্ষক ৬৫ জন পড়ুয়াকে পড়াচ্ছি। আগামী মাসে একজন অবসর নেবেন। কোচবিহার জেলায় ৬৮ টি মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্রই এখন শিক্ষক আর পড়ুয়ার অভাবে ধুঁকছে। প্রতিটি স্কুলের পরিকাঠামো ২০০৩ সালেই গড়েছিল তৎকালীন সরকার। মূলত শিক্ষকের অভাবের কারণেই এমএসকে-তে অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানকে ভর্তি করতে চাইছেন না।
Comments :0