যাদবপুরের ঘটনায় চারদিক থেকে যেভাবে নিন্দা-মন্দের ঝড় উঠেছে তাতে শাসক বিজেপি এতটাই বেকায়দায় যে দলের ও সরকারের অভ্যন্তরে মতভেদ তাড়া করা বা চাপে রাখা যাচ্ছে না। প্রকাশ্যে রীতিমতো প্রলাপ শুরু হয়ে গেছে। দলের নেতা শমীক একরকম বলছেন আর সরকারের নেতা শুভেন্দু অন্যরকম বলছেন। শমীক আবার ঢোক গিলে পরে ভাষ্য বদলাচ্ছেন। মন্ত্রী অগ্নিমিত্রার মতে ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের ঢোকা, এমব্লেম ভাঙা যে দলই করুক সমর্থনযোগ্য নয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির বাইরে থাকাই ভালো। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের মতে দু’দল ছাত্রের ঝামেলা। তাতে বড়দের না ঢোকাই ভালো। শুভেন্দুর প্রতিদ্বন্দ্বী কট্টর আরএসএস দিলীপ ঘোষ হাতে মাথা কাটার মতো বলে দিয়েছেন। কোনও অবস্থাতেই বাম ছাত্রদের বরদাস্ত নয়। একবার সার্জিকাল স্ট্রাইক করে এসএফআই অফিস গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আবার সার্জিকাল স্ট্রাইক হবে। অতপর দিলীপ ঘোষকে টেক্কা দিতে মুখ্যমন্ত্রী আসরে নেমে এক ধাপ এগিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন যাদবপুরের ভেতরে ও বাইরে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করা হবেই। হুঙ্কার দিয়েছেন এ রাজ্যে থাকতে হলে বন্দেমাতরম গাইতে হবে।
মুক্ত চিন্তা ও উচ্চ মেধার পীঠস্থান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে মধ্য রাতে তাণ্ডব চালিয়েছিল হিন্দুত্ববাদী সনাতনী ছাত্র সংগঠন এবিভিপি। বড় লাঠি হাতে ভাঙচুরের পাশাপাশি বাম ছাত্র সংগঠনের পতাকা, পোস্টার ফেস্টুন পুড়িয়েছিল তারা। ভেঙে ছিল এমব্লেম। ছাত্র-ছাত্রীদের উপর হামলা, পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছিল তারা। একেবারে পেশাদার দাগী গুন্ডাদের মতো তাণ্ডব চালায় ভণ্ড দেশপ্রেমী জাতীয়তাবাদী দুষ্কৃতীরা। এবিভিপি’র কর্মী আদিত্য, শুভজিৎ সহ হামলাকারীদের সঙ্গে ছিল এবিভিপি’র রাজ্য সম্পাদক নীলকণ্ঠ ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় কর্মসমিতির সদস্য শুভব্রত অধিকারীরাও। আশ্চর্যজনকভাবে যথা সময়ে সেখানে হাজির হয়ে যান প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য বুদ্ধদেব সাউ। আরএসএস ঘনিষ্ট হবার সুবাদে প্রাক্তন রাজ্যপাল তাঁকে ঐ পদে বসিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি আরএসএস পন্থী শিক্ষক নেতা হিসাবে পরিচিত। চার নম্বর গেট দিয়ে বহিরাগত গুন্ডারা ক্যাম্পাসে ঢোকার সময় তিনি এবং এবিভিপি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতারা ঢোকেন। গুন্ডারা বেরোবার পর এরাও বেরিয়ে যান। বাইরে তখন হিংস্র ও আগ্রাসী মেজাজে যাদবপুরের বিধায়ক শর্বরী। সারারাত তাণ্ডব করবেন বলে ঘোষণা করেন মিডিয়ার সামনে।
নেতা, অধ্যাপক, বিধায়করা একই সময়ে একই জায়গায় জড়ো হয়ে যাওয়া থেকে পরিষ্কার গোটাটাই পূর্বপরিকল্পিত। তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আত্মগোপনে ছিল। পুলিশ ছিল নিদ্রামগ্ন। নিরাপত্তারক্ষীরা গেটের তালা খুলে অবাধে ঢুকতে দেয় গুন্ডাদের। ঘটনাক্রম, তার প্রেক্ষাপট এবং ষড়যন্ত্রের ছক যত উন্মোচিত হচ্ছে ততই ঘৃণায় ছিঃছিঃ করছেন সাধারণ মানুষ। প্রবল সমালোচনা, বিরোধিতা, নিন্দা, ধিক্কারে দিশাহারা অবস্থা নেতা-মন্ত্রীদের। তাই এক একজন এক একরকম মন্তব্য করছেন। কেউ কেউ আবার পালটি খেয়ে পরে ভিন্ন সুরে কথা বলছেন। দু’দিন ধরে জল মাপছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কি অবস্থান নেবেন ঠিক করতে পারছিলেন না। এমনিতেই তিনি আদি বিজেপি’র চক্ষুশূল। মুখ্যমন্ত্রী হলেও স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা আছে। তৃণমূলী বিজেপি শিরোমণি হিসাবে দিলীপ ঘোষদের নিশানায় তিনি। তাই দিলীপ ঘোষের থেকে বেশি দেশপ্রেমী, জাতীয়তাবাদী, সনাতনী প্রমাণ করতে তিনি চেষ্টার কসুর করছেন না। যাদবপুর নিয়ে তাঁর মন্তব্য তারই নমুনা।
editorial
যাদবপুর নিয়ে বেসামাল শাসক
×
Comments :0