গল্প
নতুনপাতা
--------------------------
স্পোর্টস
--------------------------
সৌরীশ মিশ্র
"দ্যাখো, সোনাই কি বলছে! বলছে, তোমার সাথে যাবে।"
সৌগতবাবু বাড়ির একতলার ছোট্ট বারান্দাটায় একটা মোড়ায় বসে মাথা নীচু করে ডান পায়ের স্নিকারটার ফিতা বাঁধছিলেন। তখুনি, তাঁর স্ত্রী নিভাদেবী তাঁদের পুত্র স্বর্ণাভকে সাথে নিয়ে ঘরের ভিতর থেকে বারান্দাটার মুখটায় এসে কথাকটা বললেন স্বামীকে।
"তুই আবার যাবি কেন? ওখানে বন্ধুদের দেখলেই ছোটাছুটি শুরু করে দিবি। আর তারপর পড়ে-টড়ে গেলে এই অবস্থার মধ্যে, মুশকিল হয়ে যাবে খুব। না, না, তুই যাস না।" ফিতা বাঁধতে-বাঁধতেই একটিবার মুখ তুলে দশ বছরের ছেলের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললেন সৌগতবাবু।
বাবার কথা শুনে মনটাই খারাপ হয়ে গেল স্বর্ণাভর পুরো। আজ পাড়ায় স্পোর্টস। ও খেলাধুলা এতো ভালোবাসে। আর ও যাবে না মাঠে! তাও শুধু হাতটা ভেঙেছে বলে ওর! তাছাড়া, এখন তো ব্যাথাও নেই হাতে তার একটুও। তবে!
"বাবা, যাই না? প্রমিস করছি, দৌড়াদৌড়ি করবো না। যাই না তোমার সাথে?" বাবাকে মরিয়া চেষ্টা করে কনভিন্স করার স্বর্ণাভ।
সৌগতবাবুর জুতো পরা হয়ে গিয়েছিল। তিনি উঠে পড়লেন মোড়া থেকে। সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। প্রায় ছ'ফুটের মতোন লম্বা সৌগতবাবু। চাবুকের মতোন চেহারা। একটুও বাড়তি মেদ নেই শরীরে। একটা সময় নিয়মিত খেলাধুলা করতেন। এখন ব্যবসা আর সাংসারিক চাপে সেটা সম্ভব না হলেও, শরীরচর্চা রেগুলারলি করেন। এই পাড়ার স্পোর্টস কনভেনর তিনি। স্বর্ণাভও হয়েছে সৌগতবাবুর মতোন, পুরো খেলা-পাগল। সবরকম স্পোর্টসেই ইন্টারেস্ট তার। তবে ভালোবাসে ফুটবলটাকে একটু বেশিই সে। সৌগতবাবুর ইচ্ছা আছে, ছেলেকে একজন ভালো ফুটবল প্রশিক্ষকের হাতে দেন। ইতিমধ্যেই এদিক-ওদিক খোঁজ নেওয়া শুরু করে দিয়েছেন তিনি এ ব্যাপারে।
তবে, এই মুহূর্তে, সৌগতবাবুর মনের ভিতর একটা দোনামনা চলছে, ছেলেকে মাঠে স্পোর্টসে নিয়ে যাওয়া নিয়ে। তাঁর ভিতরের যে স্পোর্টসম্যান-সত্তাটা আছে সেটা তাঁকে সায় দিচ্ছে এই নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটায়। আর অন্যদিকে, তাঁর পিতৃসত্তা তাঁকে বাঁধা দিচ্ছে দুটো কারণে। এক, যেটা একটু আগে ছেলেকে বলেছেন তিনি, অর্থাৎ, ভাঙা হাতে যদি ফের চোট পায় ছেলে, তবে ভোগান্তি, কষ্ট আরো বাড়বে ওর, আর দ্বিতীয় কারণটি যেটা ছেলেকে বলেননি সেটা হোলো, প্রতি বছর স্পোর্টসে একাধিক প্রাইজ় পায় স্বর্ণাভ। এবারে ওর সব বন্ধুরা পার্টিসিপেট করবে নানান ইভেন্টে, প্রাইজ়-ও পাবে, এ সব দেখবে চোখের সামনে ছেলেটা, মন খারাপ যদি হয় ওর? যতোই হোক, ছোটো তো ও এখনো।
সৌগতবাবু স্বর্ণাভর দিকে তাকালেন সোজা। একটা গাঢ় নীল রঙের জ্যাকেট পড়েছে ছেলে। ফরসা গায়ের রঙের জন্য দারুণ লাগছে ওকে। স্বর্ণাভকে হাত বাড়িয়ে নিজের সামনে টেনে নিলেন সৌগতবাবু। তারপর বললেন, "যাবি বলছিস, কিন্তু, গিয়ে কি করবি তুই ওখানে? কোনো ইভেন্টেই তো পার্টিসিপেট করতে পারবি না এবার তুই?"
"আমি পার্টিসিপেট করতে পারবো না তো কি! আমার সব বন্ধুরা তো পার্টিসিপেট করবে। আমি ওদের এনকারেজ করবো ওরা যাতে ওদের বেস্টটা দেয় ফিল্ডে।" সাথে সাথেই বলে ওঠে স্বর্ণাভ।
ছেলের কথাগুলো শুনে ভালো লাগে খুব সৌগতবাবুর। তিনি বলেই ওঠেন, "শাবাশ সোনাই। এইরকম স্পোর্টসম্যান স্পিরিটই তো চাই।" সৌগতবাবুর মনে যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বটা এতোক্ষণ ছিল কেটে গেছে পুরো স্বর্ণাভর কথায়। তিনি ছেলের পিঠে সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিলেন একটু, তারপর বললেন, "যা, মোড়াটায় বোস্, জুতোটা পরিয়ে দিই।"
--------------------------------
Comments :0