ঈশিতা মুখার্জি
শিক্ষাক্ষেত্রে বার্ষিক সমীক্ষা চালায় প্রথম নামে একটি সংস্থা। ২০২৫ সালের সেই সমীক্ষায় জানা যায় যে পশ্চিমবঙ্গে ১৫/১৬ বছর বয়সের কিশোরেরা স্কুলছুট হচ্ছে। ২০০৬ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে স্কুলছুট কমে এসেছিল, কিন্তু কোভিড অতিমারীর পর তা কিছুটা কমলেও ২০২২ সালের পর তা হুহু করে বেড়ে যাচ্ছে। ঐ একই বয়সের কিশোরীরা তুলনামূলকভাবে বলা যায় কম স্কুলছুট হচ্ছে। কিন্তু জাতীয় পরিবার নমুনা সমীক্ষা জানাচ্ছে যে কন্যাশিশুর বিয়ে পশ্চিমবঙ্গে অন্য রাজ্যের চেয়ে অনেক বেশি। বেড়ে গেছে কিশোরীদের বিয়ে। মাধ্যমিক পরীক্ষা কেন্দ্রের যা খবর প্রকাশিত হয়েছে, তাতেই জানা গেছে যে কিশোরী পরীক্ষার্থীদের কয়েকজন অন্তঃসত্ত্বা। এসআরএস বা স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম ২০২৫ সালে জানিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গে ৬.৩% নাবালিকা বিয়ে ঘটছে যা সারা দেশে অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে সব থেকে বেশি। একেই অনেকে কন্যাশ্রী প্যারাডক্স বা বিপরীত ফল বলছে। যে প্রকল্প বড়াই করে শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি ঘটিয়ে নাবালিকা বিয়ে কমানোর কথা বলেছিল, সেখানে প্রকল্পভোগীও থাকছে এবং প্রকল্পের ব্যর্থতাও একসাথে থাকছে— এটাই বৈপরীত্য বা প্যারাডক্স। বাংলার জনজাতিগোষ্ঠীর শিশু কিশোরদের মধ্যে অসুস্থতা বেশি বলে কয়েকটি গবেষণাপত্রে জানা গেছে, এছাড়াও শিশু ও কিশোর কিশোরীদের অসুস্থতা সরকারি হাসপাতালে বেশি ধরা পড়ছে। শিশুদের মধ্যে কম ওজন বা ওজন উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে কম বলে দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক এসআরএস’র পরিসংখ্যানে।ভবিষ্যৎ বাংলার কথা ভাবতে গেলে এদের কথাই আমাদের ভাবতে হবে। আরও ভাবতে হবে ২০২৫ সালে বাংলার ঘরে শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের এই অবস্থা কেন।
যারা ভবিষ্যতের বাংলার নেতৃত্ব দেবে এবং ভবিষ্যতের বাংলা গড়বে তারা তো আজ কিশোর-কিশোরী। তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের এই পরিস্থিতি স্পষ্টই বাংলা জুড়ে গ্রাম শহরে অনেক পরিবারে দারিদ্র, অভাব, অনটন রয়েছে এমনটাই বোঝায়। পরিবারে আর্থিক অভাব, তাই কিশোরেরা পড়া ছেড়ে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে পাড়ি দিচ্ছে অন্য রাজ্যে। কিশোরীদের ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। সন্তানেরা ঘর থেকে বাইরে চলে গেলে খাবার জোগাড় করার খরচ কমে। খাবার জোগাড় করার জন্য ঋণ নিতে হচ্ছে পরিবারকে ক্ষুদ্র ফিনান্স কর্পোরেশনের থেকে। অর্থাৎ পরিবারের কাছে আর্থিক সংস্থান নেই। এ কিরকম আর্থিক ব্যবস্থা? পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গের একটি প্রশ্ন এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। বাংলার শিশুকিশোরেরা যেন বাংলার মানুষদের আজ এই প্রশ্নই করছে। প্রশ্নটি হলো–“ তোমরা তো বেশিদিন এই বাংলা ভোগ করবে না, এই বাংলায় থাকবো আমরা, তোমাদের চেয়ে আরও অনেক বেশিদিন এই রাজ্যে আমরা বাস করব, তোমাদের এই বাংলা ধ্বংস করার, আমাদের পঙ্গু করে রাখার কোনও অধিকার নেই।“
রাজ্যের মানুষের আর্থিক সংস্থান নেই, রাজ্য সরকারও ঋণের ভারে জর্জরিত। ২০২৫-২৬ সালে রাজ্য সরকারের বাজেটে প্রস্তাবিত ঋণের পরিমাণ ছাড়াতে চলেছে। আর্থিক বছরের প্রথম ৯ মাসে রাজ্য সরকার ঋণ নিয়েছিল ৭৮,০০০ কোটি টাকা। আগামী ৩ মাসে রাজ্য সরকার প্রস্তাব দিয়েছে ৪৬,০০০ কোটি টাকা ঋণের। এর অর্থ রাজ্য সরকারও আর্থিকভাবে অঙ্কের হিসাবে অর্থাভাবে ভুগছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অবশ্য তাদের রিপোর্টে জানিয়েছে রাজ্য বেহিসাবি অর্থাভাবে ভুগছে।
এখানেই আমাদের ধাঁধাঁ—রাজ্যের মানুষ অর্থাভাবে ভুগছেন, রাজ্য সরকার অর্থাভাবে ভুগছে, ওদিকে রাজ্য থেকেই লুটের টাকা উদ্ধার হয়েই চলেছে ক্রমাগত। চাকরি কেলেঙ্কারি, কয়লা কেলেঙ্কারি, বালি কেলেঙ্কারি, সারদা কেলেঙ্কারি ইত্যাদি একটির পর একটি আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটেই চলেছে এই রাজ্যে। প্রতিটি আর্থিক কেলেঙ্কারির আর্থিক পরিমাণ পাহাড় প্রমাণ। যেমন প্রায় বিস্মৃতির আড়ালে চলে যাওয়া সারদা কেলেঙ্কারির আর্থিক দুর্নীতির পরিমাণ উপমহাদেশে অতীতের এই ধরনের “পনজি স্কিম”-এ আর্থিক কেলেঙ্কারির পরিমাণের চেয়ে সবচেয়ে বেশি। শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ সংক্রান্ত কেলেঙ্কারির আর্থিক পরিমাণ এতটাই যে আন্দাজ করাও কঠিন। অ্যাসোসিয়েশন অব ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মসের তথ্য জানাচ্ছে এ রাজ্যে কোটিপতি সাংসদ এবং বিধায়কের সংখ্যা অনেক। বাংলার দুরবস্থার ধাঁধাঁ এখানেই। বাংলার সব অর্থ কোথায়? কেন বাংলার সরকারের, মানুষের এত অর্থাভাব, কিন্তু আর্থিক কেলেঙ্কারি পিছু ছাড়ছে না এ রাজ্যের? বুঝে নিতে হবে প্রতিটি আর্থিক কেলেঙ্কারিই হলো রাজ্যবাসীর অর্থ লুট। এই লুটের পরিমাণ অর্থ যদি লুট না হতো, তাহলে তা রাজ্যবাসীর কাছেই থাকত। রাজ্য সরকারের অর্থাভাব বুঝতে গিয়ে খোঁজ নিতে হয় রাজ্য বাজেটের। রাজ্য অর্থ মন্ত্রীর পেশ করা খতিয়ানে শুধুই একটির পর একটি জনকল্যাণমুখী প্রকল্প। প্রকল্প তো মানুষের উপকারে আসার কথা, কিন্তু বাজেটে সে প্রকল্পের আর্থিক সংস্থান কোথায়? তাহলে রাজ্যের অর্থ মন্ত্রী যে বাজেট কয়েকবছর বিধানসভায় পেশ করেছেন, তার কোও আর্থিক নিয়মনীতি নেই। রাজ্যের আর্থিক স্থিতি সম্পর্কে যে আর্থিক রিভিউ প্রকাশ করার কথা সেই রিভিউয়ের পরিসংখ্যানে কোনও হিসাব মেলে না।
বাংলার আর্থিক অভাব অনটনের ছায়া রাজ্য সরকারের পেশ করা বাজেটে স্পষ্ট। সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে নীতি আয়োগ রাজ্যগুলির যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে মোট জাতীয় উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গের অংশ ১৯৯০-৯১ সালে ছিল ৬.৮%। ২০২০-২১ সালে তা হয়েছে ৫.৮%। পশ্চিমবঙ্গের মাথা পিছু আয় জাতীয় মাথা পিছু আয়ের চেয়ে ২০% কম ২০২০-২১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী। ২০২৫ সালে প্রকাশিত এই রিপোর্ট জানাচ্ছে যে রাজ্যের উৎপাদনের ৫৪.৯% আসে পরিষেবা ক্ষেত্র থেকে। অনেক কম আসে শিল্প এবং কৃষি থেকে। বাংলায় কি কৃষি এবং শিল্পের ভবিষ্যৎ নেই? নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু রাজ্য সরকারের তরফে আজ পর্যন্ত কোনও কৃষিনীতি বা শিল্পনীতি প্রকাশিত হয়নি। রাজ্যের কৃষি এবং শিল্পক্ষেত্র মিলিয়ে মোট উৎপাদন রাজ্যের উৎপাদনের অর্ধেকের কম! যে রাজ্যে কৃষি এবং শিল্প- এ দুইয়ের কোনও ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্বাচিত সরকার বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিয়ে কোনোদিন কোনও পরিকল্পনা করেনি, সে রাজ্যে তো রয়েছে চরম আর্থিক অব্যবস্থা। বাংলার এই মুহর্তে কোনও পরিকল্পনা পর্ষদ নেই। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা শব্দটি মুছে দিয়েছে, যেমন দিয়েছে কেন্দ্রের সরকার।
২০১১ সালে বাংলায় ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস দলের সরকারে আসার আগে বাংলায় ছিল বামফ্রন্ট সরকার। ২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রে রয়েছে বিজেপি সরকার। রাজনৈতিক দল উল্লেখ করার উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক অর্থনীতির বিভিন্নতা আলোচনার জন্য। কেন বাংলার মানুষের আজ এই আর্থিক দুরবস্থা— সে প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই রয়েছে রাজনৈতিক অর্থনীতির মধ্যে। বিতর্ক থাকলেও বামফ্রন্ট সরকারের ঘোষিত কৃষিনীতি এবং শিল্পনীতি ছিল। অর্থাৎ বামফ্রন্ট সরকার নিঃসন্দেহে মনে করত কৃষি এবং শিল্পের ভিত্তিতেই রাজ্যবাসীর আর্থিক উন্নয়ন সম্ভব। মৌলিক এই দুটি ক্ষেত্রকে আর্থিকভাবে বিপন্ন করে কিভাবে বাংলার উন্নয়ন সম্ভব? এ তো নতুন কথা কিছু নয়। প্রশ্ন তাহলে ওঠা স্বাভাবিক নয় কি কেন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার এবং কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সেভাবে কোও ঘোষিত কৃষি বা শিল্পনীতি নেই শুধুমাত্র কয়েকটি প্রকল্প ছাড়া? কৃষিক্ষেত্রে কৃষকের আত্মহত্যা বাড়ছে বাংলায় যেমন রয়েছে সারা দেশে। কৃষি বিপন্ন, কিন্তু কৃষির উপরেই নির্ভরশীল বেশি মানুষ। এরকম নীতি নিয়ে কোথাও কোনও অগ্রগতি ঘটবে না, ক্রমাগত পিছিয়ে যাবে রাজ্য, এটাই কি স্বাভাবিক নয়?
এ পরিণতিতে বাংলার বেশির ভাগ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নিশ্চয়ই কেউ লাভ করেছেন। তা না হলে এই অর্থনীতি টিকে থাকছে কিসের উপর? অর্থনীতি টিকে থাকার চাবিকাঠি হলো বিপর্যস্ত অর্থনীতিই আর্থিক দুর্নীতির আঁতুড়ঘর। বিপর্যস্ত এই অর্থনীতিতে আর্থিক বৈষম্য বেড়েছে প্রবলভাবে। গ্রামবাংলায় গড়ে উঠেছে নব্যধনীর সাথে, মধ্যসত্ত্বভোগীর সাথে, রেন্ট প্রাপ্তদের সাথে খেতমজুরের আয়ের বিপুল ফারাক, শহরেও বাড়ছে এই ফারাক। বৈষম্য বাড়ছে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির, তফসিলি জাতি ও উপজাতি মানুষের মধ্যে। এই আর্থিক বৈষম্যের উপরিভাগে রয়েছে যারা, অর্থাৎ যারা লাভবান তারাই এই ব্যবস্থা বজায় রাখতে চাইবে, তারাই এই লুটের রাজনীতি বজায় রাখবে, তারাই এই বদ্ধ অর্থনীতির মধ্যে আর্থিক লাভ খুঁজবে। আর্থিক দুর্নীতি আসলে সাদা টাকা দ্রুত কালো করে এবং আর্থিক বৈষম্যের উপরিভাগের এই মানুষজন ধীরে ধীরে এই দুর্নীতিতে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে, রাজনৈতিক ক্ষমতা, আর্থিক ক্ষমতা মিলে মিশে এক হয়ে এক জাল গঠন করে। এই জাল বদ্ধ করে তোলে সাধারণ মানুষের জীবন, যাদের বেঁচে থাকার জন্য ক্ষুদ্র ফিনান্সের ঋণ বা সরকারের জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের টাকা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
এই বাংলার বদ্ধ জলা থেকে কি মানুষের মুক্তি নেই? রাজনৈতিক আর্থিক ক্ষমতা সামাজিক ক্ষমতায় পরিণত হয়ে সমাজ শাসন করে ধর্ম, জাতপাতের ভিত্তিতে, পিতৃতন্ত্রের ভিত্তিতে। এই ক্ষমতা ইতিহাসে কোনোদিন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এই ক্ষমতার লুটের পিরামিডের উপরিভাগ ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে ছোট থেকে ছোট হয়ে যাবেই। কিন্তু কৃষি, শিল্প, রাজ্যের অর্থনীতির ভিত্তি। কৃষি বা শিল্পের নীতির চোখ থাকে উৎপাদন বৃদ্ধির। উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন পরিকাঠামো এবং প্রযুক্তির উন্নতি। ডিজিটাল শব্দটায় জাদু থাকলেও ইন্টারনেট পরিষেবা বেসরকারি হাতে, তা মানুষকে নগদে কিনতে হয়, সরকার দায়িত্ব নিলে তবেই ডিজিটালের জাদু দেখা যায়। আর্থিক বৈষম্য যে পরিমাণ ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি করে, তা সমস্ত বৈষম্য ছাপিয়ে চলে যায়। বাংলার মানুষ ভুগছেন এই বৈষম্যতেও। এই বাংলার নতুন পথে চলা সম্ভব, বাংলার মানুষের আর্থিক বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব যদি কৃষি এবং শিল্পোন্নয়নের চোখ দিয়ে রাজ্যবাসীর উন্নয়নের কথা ভাবা যায়। এই বাংলার মানুষের অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করা সম্ভব যদি ডিজিটাল বৈষম্য কাটানোর পরিকল্পনা করা যায়। এর জন্য অর্থনীতির রাজনীতি অন্য হতে হবে। আর্থিক অনটনে মানুষ দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা দেখতে পায় না, আশু প্রয়োজন মেটানোর কথা ভাবে। এটাই নব্য ধনীর তার নিজস্ব সম্পদ বৃদ্ধি করার অস্ত্র। বেশির ভাগ মানুষ মাথার উপর ছাদ, পেটের ভাত জোগাড় করতে নাজেহাল হয়ে যাচ্ছে, তাই আগামী বছর কি হবে, তার ভাবার অবকাশ নেই এবং কোনও না কোনোভাবে অর্থই তার একমাত্র বাঁচার রসদ। কিন্তু তাই কি কোনও দলের সরকার শুধুমাত্র প্রকল্প নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে? এই ব্যবস্থাই এ রাজ্যের আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ এবং এই ব্যবস্থার শেষেই একমাত্র বাংলার বিপর্যয় কাটানোর একমাত্র পথ। বাংলার শিশু কিশোরেরা কিন্তু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে, তারা বাঁচার কথা বলছে। বাঁচার কথা বলছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
Comments :0