উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের জামিনের আবেদন সুপ্রিম কোর্টে খারিজ হবার রায়কে কেন্দ্র করে নানা মহলে গুরুতর নানা প্রশ্ন জোরালোভাবে উঠে আসছে। এই রায়ে অনেকেই বিস্মিত, বিরক্ত, ক্ষুব্ধ এমনকি আশঙ্কিতও। অনেকে মনে করছেন এই রায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতের স্ববিরোধিতাকেই প্রকাশ্যে হাজির করে দিয়েছে। অতীতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় জামিন সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্ট যে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে আসছিলো এই রায় স্পষ্টত সেই অবস্থানকে অস্বীকার করেছে। বিচারাধীন কোনও বন্দির অপরাধ প্রমাণিত হবার আগেই কার্যত অনন্তকাল বন্দি রাখাকে বৈধতা দিয়েছে এই রায়। ফলে অভিযুক্তের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার খর্ব হচ্ছে। তদন্তের কাজে দীর্ঘ বিলম্ব, অভিযোগ প্রমাণের তথ্যাদি জোগাড় করতে না পারার দায় দিয়ে বর্তাচ্ছে অভিযুক্তের উপর। ফলে অপরাধী সাব্যস্ত হবার আগেই সুদীর্ঘ সাজা প্রাপ্তির রাস্তা প্রশস্ত করে দেওয়া হয়েছে।
২০২০ সালে এনআরসি’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদের উত্তাল সময়ে দিল্লির দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে দাঙ্গাবাজ মিথ্যা অভিযোগে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল উমর, শারজিল তাদের অন্যতম। প্রথমদিকে দাঙ্গার উসকানিদাতা, পরে দাঙ্গার মূল কারিগর, আরও পরে সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রীকারী হিসাবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতর ধারা যোগ করে মামলা দায়ের করা হয় যাতে তাদের আজীবন জেলে রাখা যায়। অথচ যারা সত্যি সত্যি দাঙ্গায় মদত দিয়েছে, হিংসাত্মক ভাষণ দিয়ে ঘৃণা ছড়িয়েছে বিজেপি’র সেই সব নেতাদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেই। আসলে বিরোধী কণ্ঠ এবং প্রতিবাদ-প্রতিরোধ স্তব্ধ করার লক্ষ্যে সাজানো মামলায় খালিদদের গ্রেপ্তার করে মোদী-শাহ-রাই বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছেন।
যদি অমিত শাহর পুলিশ ষড়যন্ত্র না করত তাহলে এমন অন্য মামলার মতই উমরদের অনেক আগে জামিন হয়ে যেত। মুখে বার বার অভিযোগ গুরুতর বলা যথেষ্ট নয়, দরকার প্রমাণ হাজির করা। প্রমাণ হাজির করতে পুলিশ যদি ব্যর্থ হয়, তদন্তে যদি দীর্ঘসূত্রিতা চলে তাহলে কবে প্রমাণ মিলবে সেই আশায় বছরের পর বছর কাউকে বন্দি করে রাখা যায় না। এটাই সর্বোচ্চ আদালতের প্রতিষ্ঠিত বিধান। ‘জামিনই নিয়ম, জেল ব্যতিক্রম।’ পাঁচ বছরের বেশি বন্দি থাকার পর প্রমাণের অপেক্ষায় আরও এক বছর জেলে থাকা নিশ্চিত করার রায় আর যাই হোক সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া যায় না।
একই অভিযোগে বন্দি হলেও উমর, শারজিল ছাড়া বাকি পাঁচজনকে জামিন দেওয়া হয় এই যুক্তিতে যে তাদের অপরাধ লঘু। যে মামলার তদন্তই শেষ হলো না, বিচারই হলো সেই মামলার অভিযুক্তদের অপরাধ মাপা যায় কোন মাপকাঠিতে? তাছাড়া জামিন মামলা যে মোটেই মূল মামলা নয় সেটা ভুলে যায় যায় কি? জামিন মামলায় অভিযুক্তদের অপরাধের মাত্রা মাপা যায় না।
দ্রুত তদন্ত সেরে বিচার প্রক্রিয়াও দ্রুত সম্পন্ন করা অভিযুক্তদের সাংবিধানিক অধিকার হিসাবে গণ্য হয়। অর্থাৎ তদন্তে দেরি হচ্ছে তাই বিচার প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হচ্ছে, এই অজুহাতে জামিন আটকানো যায় না। তেমনি অনুমান এবং প্রমাণকে এক করে ফেলা যায় না।
দিল্লি পুলিশ যেভাবে মামলা নির্মাণ করেছে তাকে যুক্তিগ্রাহ্য করা সহজ নয়। প্রমাণ ছাড়া শুধু ভাষণ দিয়ে কাউকে অপরাধী সাজানো যায় না। উমরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যদি সত্যি হতো তাহলে তার প্রমাণের অভাব হতো না। অনেক আগেই বিচার শেষ হয়ে যেত।
Editorial
এ কেমন বিচার
×
Comments :0