বক্তৃতার ফুলঝুরি ফুটিয়ে বা নিজের ঢাক নিজে পিটিয়ে যে দেশের অর্থনৈতিক শক্তি-সামর্থ্য ও প্রভাব বাড়ানো যায় না বরং তার জন্য যথাযথ নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয় এবং সেই মতো কাজ করতে হয় সেটা নরেন্দ্র মোদীদের চীনের কাছ থেকে হাঁটু গেড়ে শেখা উচিত। চীন দেখিয়ে দিয়েছে ট্রাম্পের শুল্ক সন্ত্রাসের ধাক্কায় যখন গোটা বিশ্ব বাণিজ্যের লন্ডভন্ড অবস্থা তখন সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে ঘর গোছাতে হয় এবং বিশ্ব বাণিজ্য মানচিত্রে নিজেদের জায়গা কীভাবে বাড়িয়ে নিতে হয়। দ্বিতীয়বারের জন্য আমেরিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে ২০২৫ সালের শুরুতেই বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের পণ্যের উপর চড়া হারে আমদানি শুল্ক চাপায় ট্রাম্প। প্রথম দিকে চীনের বিরুদ্ধে শুল্ক চাপে ১৪৫ শতাংশ। পরে দু’দেশের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে শুল্ক নামে ১০ শতাংশে। ভারতের বিরুদ্ধে গোড়ায় শুল্ক হার ৩০ শতাংশের মতো থাকলে শেষ পর্যন্ত সেটা ৫০ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। দু’দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চলতে থাকলেও কোনও চুক্তি সম্ভব হয়নি। ফলে শুল্ক থেকে গেছে সেই ৫০ শতাংশেই। সম্প্রতি হুমকি এসেছে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ না হলে ৫০০ শতাংশ হারে শুল্ক চাপানো হতে পারে। আবার ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করলেও অতিরিক্ত শুল্ক চাপবে। অর্থাৎ চারদিক থেকে ফাঁস জড়িয়ে ভারতের গলা টিপে মারার ব্যবস্থা করছে ট্রাম্প। চীনের বিরুদ্ধে তো বাণিজ্য যুদ্ধ চলছে বেশ কয়েক বছর ধরে। নানা অজুহাতে চীনের বিরুদ্ধে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি হচ্ছে ট্রাম্পের আগের আমল থেকেই। কিন্তু ভারতের সঙ্গে চীনের মূল পার্থক্য তারা ট্রাম্পের আক্রমণের মুখে নতজানু হয়নি, উলটে পালটা আক্রমণ চালিয়েছে। তাতে ট্রাম্প বাধ্য হয়েছেন চীনের সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসতে।
কিন্তু ভারত আমেরিকার বিরুদ্ধে কোনও পালটা পদক্ষেপ নেয়নি। বরং ট্রাম্পের দাবি মেনে নিয়ে ভারতে মার্কিন পণ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার দেবার ব্যবস্থা করেছে। রাশিয়া থেকে তেল আমদানি দ্রুত কমিয়েছে। আমেরিকা থেকে তেল, গ্যাস, অস্ত্র ইত্যাদি আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছে। তার আগেই অবশ্য ইরান ও ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনা বন্ধ করেছিল মোদী সরকার। সবটাই ট্রাম্পের ভয়ে।
কিন্তু এত করেও ট্রাম্পের মন পাওয়া যায়নি। তাই চুক্তিও হয়নি, শুল্কও কমেনি। ফলে দেশের রপ্তানি বড়সড় ধাক্কা খেতে থাকে। ভারতের বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য আমেরিকা। সেখানে রপ্তানি মার খাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেড়ে যায়। মোদীর ভারত এই সময়কালে ট্রাম্পের তোয়াজেই ব্যস্ত ছিল। বিকল্প কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। আমেরিকার বাইরে অন্যান্য দেশে রপ্তানি বাড়ানোর কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়নি। অথচ চীন সেটাই করেছে। আমেরিকাকে যেমন পালটা আঘাত করেছে তেমনি সমান্তরালে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় বাণিজ্য বিস্তারে সক্রিয় হয়েছে। ফল স্বরূপ আমেরিকায় রপ্তানি কমলেও অন্যান্য দেশে রপ্তানি অনেক বেড়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অন্তত ২০ শতাংশ বেড়ে ১.২০ লক্ষ কোটি ডলার হয়েছে।
Editorial
ভারত ব্যর্থ, চীন সফল
×
Comments :0