সুব্রত রায়
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সুভাষচন্দ্র বসু একটি আবেগের নাম। স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও সারা দেশজুড়ে তাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে এক বিশেষ আবেগ পরিলক্ষিত হয়। সমাজতন্ত্রের ভাবনার পাশাপাশি, সাম্প্রদায়িকতা ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন সংগ্রাম তাঁকে ঐতিহাসিক চরিত্রে পরিণত করেছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সুভাষচন্দ্রের ঐতিহাসিক অবস্থানে কমিউনিস্টদের ভূমিকা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা আজকের প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়। তবে মনে রাখতে সুভাষচন্দ্র ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দুটি পৃথক দুটি সত্তা। তাই বহুক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টি যেমন সুভাষচন্দ্রকে সহযোগিতা করেছে, তেমনি বেশ কিছু ক্ষেত্রে আদর্শকেন্দ্রিক বিরোধিতা থাকাও স্বাভাবিক।
১৯১৭ সালের নভেম্বরে রুশ সাম্রাজ্যবাদকে উচ্ছেদ করে কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে সফল হয় পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। এর ঠিক তিন বছর পর ১৯২০ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার মস্কো শহরে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের দ্বিতীয় মহাসম্মেলনে লেনিন পরাধীন দেশগুলোতে বিপ্লবের রণকৌশল সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পেশ করেন— "যেসব অনগ্রসর দেশে এখনো সামন্ততান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থা চালু আছে ঐসব দেশের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, ১) কমিউনিস্ট পার্টির স্বাতন্ত্র্যতাকে সযত্নে রক্ষা করে সেই সব দেশের বৈপ্লবিক জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে সাহায্য করাই হবে ঐসব দেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান ও অবশ্য কর্তব্য।"
ঠিক এক বছর পরে ১৯২১ সালে সুভাষচন্দ্র বসু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিতে আইসিএস ত্যাগ করে ইংল্যান্ড থেকে ফিরে গান্ধীজীর পরামর্শক্রমে বাংলার তদানীন্তন নেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বে কংগ্রেসে যোগদান করেন।
১৯২২ সাল ভারতের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ঐ বছরই নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির গয়ার অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হন চিত্তরঞ্জন দাস। গয়ার অধিবেশন একটি বিশেষ কারণে উল্লেখযোগ্য। কংগ্রেসের গয়ার অধিবেশনেই সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার, ভারতের প্রথম একজন কমিউনিস্ট নেতা হিসাবে যিনি প্রকাশ্যে বক্তৃতা করেন।
১৯২২ সালের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো কমরেড লেনিনের পরামর্শে ভারত থেকে সুভাষচন্দ্র বসু সহ পাঁচ জনকে ১৯২২ সালের নভেম্বরে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের চতুর্থ কংগ্রেসে যোগ দেবার জন্য কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়ার হয়।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের পরবর্তী সময়ে সুভাষচন্দ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন নেতা হিসাবে পরিচিত হন। ১৯২৫ সালে কমরেড স্টালিন পরাধীন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির উদ্দ্যেশ্য বলেছিলেন, "ভারতের নয়ার উপনিবেশে মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে এখানে জাতীয় বুর্জোয়াররা আপসকামী... এই আপসকামী বুর্জোয়ারদের সাথে সাম্রাজ্যবাদের বোঝাপড়া আছে। … এরা সাম্রাজ্যবাদের থেকেও বিপ্লবকে বেশি ভয় পাচ্ছে... এই অংশকে ধ্বংস করতে না পারলে বিপ্লবকে জয় যুক্ত করা যাবে না... কমিউনিস্ট পার্টি আপসমুখী জাতীয় বুর্জোয়ারদের বিচ্ছিন্ন করে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে শহর ও গ্রামের ব্যাপক পেটিবুর্জোয়ার জনগণকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অবশ্যই বিপ্লবী আপসহীন জাতীয়তাবাদীদের সাথে প্রকাশ্যে সমঝোতা গড়ে তুলবে"। (সূত্র: জে ভি স্টালিন সিলেক্টেড ওয়ারর্কস, Vol-7)।
সুভাষচন্দ্র ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় বুর্জোয়ারদের আপসহীন অংশের নেতা। ১৯৩৮-এ সুভাষচন্দ্রের বক্তব্যেও স্ট্যালিনের কথার প্রায় প্রতিধ্বনি শোনা যায়। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও ডেইলি ওয়ারর্কারের সম্পাদক রজনী পাম দত্তকে দেওয়ার এক সাক্ষাৎকারে সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, "আমার ব্যক্তিগত মতামত এই যে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বৃহৎ লড়াইয়ের প্রেক্ষিতে সংগঠিত করা উচিত এবং জাতীয় কংগ্রেসের দ্বিবিধ উদ্দেশ্য থাকা প্রয়োজন – প্রথমত, রাজনৈতিক মুক্তি অর্জন করা ও দ্বিতীয়ত, একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থাপন করা"
সুভাষচন্দ্র ১৯২৮-এ কলকাতায় নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে জহরলাল নেহরুকে সঙ্গে নিয়ে প্রস্তাব রাখেন কংগ্রেসের লক্ষ্য হওয়ার উচিত ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসের পরিবর্তে পূর্ণ স্বরাজের দাবি জানানো। গান্ধীজী এই প্রস্তাবের সরাসরি বিরুদ্ধে ছিলেন। যদিও ভোটাভুটিতে ঐ প্রস্তাব পরাজিত হয়, তথাপি এই ঘটনা ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিকে আরও জোরালো করে তোলে। উল্লেখ্য, ১৯২১ সালে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির আমেদাবাদ অধিবেশনে কমিউনিস্ট হসরত মোহানি ও কুমারানন্দ স্বামী পূর্ণ স্বরাজের দাবি তুলেছিলেন।
১৯২৮ সালের কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনেই আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। এই অধিবেশনে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে প্রায় ৫০,০০০ শ্রমিক কিছুক্ষণের জন্যে কংগ্রেস অধিবেশনের মণ্ডপ দখল করে নিয়ে নিজেরাই প্রতীকীভাবে পূর্ণ স্বরাজের পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করে। শ্রমিকদের এই পদক্ষেপ ভারতের তদানিন্তন আপসহীন রাজনীতিকে প্রচণ্ডভাবে উৎসাহিত করে। সুভাষচন্দ্র বসুও জাতীয় আন্দোলনের পাশাপাশি দেশের শ্রমিক কৃষক আন্দোলনেও যোগ নেন। সুভাষচন্দ্র জামশেদপুরের টিস্কো লেবার ইউনিয়নের সভাপতি হন। ১৯২৯-এর নভেম্বর-ডিসেম্বারে নাগপুরে অনুষ্ঠিত সম্মেলন থেকে কমিউনিস্টদের সমর্থনেই সুভাষচন্দ্র AITUC-র সর্বভারতীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা এস ভি দেশপান্ডে। মানতেই হবে AITUC-র সর্বভারতীয় সভাপতি নির্বাচিত হওয়ারয় সুভাষচন্দ্র জাতীয় রাজনীতিতে অনেক বেশি প্রতিষ্ঠা পান। এক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।
১৯৩৮ সালে হরিপুরা অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র বসু ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে স্বাধীনতা পরবর্তীতে সমাজতান্ত্রিক পথে এদেশের পুনর্গঠনের জন্য বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহার সহযোগিতায় ‘জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি’ গঠন করেন। সুভাষচন্দ্র পণ্ডিত জহরলাল নেহরুকে এই কমিটির সভাপতি মনোনীত করেন। কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পিসি যোশী সুভাষচন্দ্রের হরিপুরায় সভাপতির ভাষণে অভিভূত হয়ে বলেছিলেন ‘The best ever’।
কংগ্রেস সভাপতি থাকাকালীন সুভাষচন্দ্র বামপন্থীদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গঠন বাম সংহতি কমিটি (Left Consolidation Committee) গঠন করেন। কমরেড সোমনাথ লাহিড়ী কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে বাম সংহতি কমিটির সদস্য ছিলেন।
এই সব ঘটনাবলী স্বাভাবিকভাবেই কমিউনিস্ট পার্টিকে সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে উৎসাহিত করেছিল। যার ফলে কমিউনিস্ট পার্টিই সর্বপ্রথম পরবর্তী বছরে ত্রিপুরী (মধ্য প্রদেশের একটি এলাকা) কংগ্রেসের সভাপতি হিসাবে দ্বিতীয়বারের জন্য সুভাষচন্দ্রের নাম প্রস্তাব করে। কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড পি সি যোশী প্রকাশ্যে দলীয় মুখপত্র (ন্যাশানাল ফ্রন্ট) সহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে সুভাষচন্দ্র বসুকে দ্বিতীয়বারের জন্য কংগ্রেসের জাতীয় সভাপতি করার দাবি জানান। গান্ধীজী’র প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি জয়লাভ করেন।
সুভাষ চন্দ্রের সঙ্গে ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট নেতৃত্বের সর্বদা অম্ল মধুর সম্পর্ক ছিল। কখনোই অস্বীকার করা যাবে না কমিউনিস্ট পার্টি যখন বেআইনি তখনও সুভাষচন্দ্র কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র 'ন্যাশনাল ফ্রন্টে' মাঝে মাঝেই লিখতেন। আবার ঠিক উলটোদিকে সুভাষচন্দ্র সম্পাদিত ফরোয়ার্ড ব্লক সাপ্তাহিক পত্রিকায় এস এ ভাঙ্গে, বঙ্কিম মুখার্জি, গোপাল হালদার, হীরেন মুখার্জির মতো কমিউনিস্ট নেতারা নিয়মিত লিখতেন। এই পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীতে বিনয় ঘোষ, এস উপাধ্যায়, গোপাল হালদারদের মতো কমিউনিস্ট ব্যক্তিত্বদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি ও মহারাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলনের নেতা কে যোগলেকার সুভাষচন্দ্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
শুধু তাই নয়, দেশত্যাগকালে সুভাষচন্দ্র কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের একাংশ এবং কীর্তি পার্টির কর্মীদের একাংশের উপর নির্দ্বিধায় আস্থা রেখেছিলেন। ১৯৪১ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে পর্যন্ত সুভাষচন্দ্র দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন প্রতিনিধিদের সাথে গোপন বৈঠকের জন্য কমিউনিস্ট নেতা স্নেহাংশুকান্ত আচার্যের একটি বিশেষ বাড়ি ব্যবহার করতেন। এমনকি দেশভাগের সময় কমিউনিস্ট নেতা স্নেহাংশু আচার্য সুভাষচন্দ্রকে দশ হাজার টাকা দিয়েছিলেন তাঁর পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সুভাষচন্দ্র ও তাঁর আজাদ হিন্দ সরকারের সাথে অক্ষ শক্তির সম্পর্ক নিয়ে এদেশের কমিউনিস্টদের সম্পর্কের অবনতি হয়। কারণ কমিউনিস্ট পার্টি স্বাভাবিক নিয়মেই ফ্যাসিবাদ বিরোধিতার অবস্থান নিয়েছিল। সুভাষচন্দ্রের তখন একমাত্র লক্ষ্য ছিল ভারতের স্বাধীনতা। যদিও জার্মান ও জাপান বহু চেষ্টা সত্ত্বেও সুভাষচন্দ্র এবং তাঁর আজাদ হিন্দ সরকার কিছুতেই সোভিয়েত রাশিয়ারর বিরুদ্ধে যাননি বা সোভিয়েত বিরোধী প্রচারে অংশ নেননি। আজাদ হিন্দ সরকার কেবলমাত্র ব্রিটেন ও আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। অন্যদিকে সোভিয়েত রাশিয়ারও সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে কোনও বিরূপ বিবৃতি দেয়নি বলেই জানা যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির সোভিয়েত রাশিয়ার আক্রমণকে সুভাষচন্দ্র কোনোভাবেই সমর্থন করেননি। “রুশ-জার্মান যুদ্ধে ভারতের সহানুভূতি স্পষ্টতই রাশিয়ারর দিকে। কারণ ভারতবাসী সুচিন্তিতভাবে মনে করে জার্মানি আক্রমণকারী।” (১৭ জুলাই, ১৯৪১, সুভাষ রচনাবলী)
অন্যদিকে জার্মান বিদেশ দপ্তরের একজন উপ সচিব হের ওয়েরম্যান জার্মান সরকারকে রিপোর্টে লিখেছিলেন, "বসুর কথা থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে,... তিনি রুশ-জার্মান যুদ্ধের বিষয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বক্তব্যের দ্বারা প্রভাবিত।" (সুভাষ রচনাবলী)
মজার বিষয় এই যে, বিশ্বযুদ্ধ শুরুর প্রাকলগ্নে সুভাষচন্দ্রের গন্তব্য ছিল সোভিয়েত রাশিয়ার এবং বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পরও রাশিয়ার যাবার লক্ষ্যেই তাঁর ছিল শেষ বিমান যাত্রা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই অংশটি বাদ দিলে সুভাষচন্দ্রের সাথে কমিউনিস্ট পার্টির পারষ্পরিক সহযোগিতার বহু নিদর্শন আছে।
একই সাথে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতা তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। এদেশে থাকাকালীন তিনি হিন্দু মহাসভার রাজনীতির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। দেশত্যাগের কিছু আগে ১৯৪০ সালের ১২ মে ঝাড়গ্রামের লালগড় মাঠে (বর্তমান দুর্গা ময়দান) এক জনসভায় সুভাষচন্দ্রের ভাষণে তা প্রকটভাবে ধরা পড়েছিল। সুভাষচন্দ্র ঐ ভাষণে বলেছিলেন, “সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীদের ত্রিশূল হাতে হিন্দু মহাসভা ভোট ভিক্ষায় পাঠিয়েছে। ত্রিশূল ও গৈরিক বসন দেখলে হিন্দু মাত্রই শির নত করে। ধর্মের সুযোগ নিয়ে ধর্মকে কলুষিত করে হিন্দু মহাসভা রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে। হিন্দু মাত্রেরই তার নিন্দা করা উচিত।’’ ১৯৩৮ সালের ১৪ জুন কংগ্রেস সভাপতি থাকাকালীন কুমিল্লায় একটি সভায় সুভাষচন্দ্র সাম্প্রদায়িকতার তীব্র বিরোধিতা করে বলেছিলেন, ‘‘...হিন্দুরা ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বলিয়ার ‘হিন্দুরাজের’ ধ্বনি শোনা যায়। এগুলি সর্বৈব অলস চিন্তা। ...শ্রমসিক্ত জনসাধারণ যে সব গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সম্মুখীন, সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি তাহার কোনোটির সমাধান করিতে পারিবে কী? কীভাবে বেকারত্ব, নিরক্ষরতা, দারিদ্র প্রভৃতি সমস্যার সমাধান হইবে সে সম্বন্ধে তাহার কোনও পথনির্দেশ করিয়ারছে কী?’’
অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকার গঠনকালে তিনি ১১ সদস্যকে মন্ত্রীসভার ৪ জন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী বেছেছিলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে। এছাড়াও বিভিন্ন বক্তৃতা ও লেখায় সাম্প্রদায়িকতা ও জাতপাতের বিরুদ্ধে সুভাষচন্দ্রের সুচিন্তিত মত বারবার প্রকাশিত হয়েছে। রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় তিনি হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার উত্থান নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। তাই হিন্দু সম্প্রদায়কেই তিনি হিন্দু ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার রুখে দাঁড়াতে বলেছিলেন বারবার।
ব্রিটিশ সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে দেশত্যাগ, আজাদ হিন্দ সরকার গঠনের মাধ্যমে বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ, সোভিয়েত রাশিয়ারর প্রতি তাঁর দৃঢ় আস্থা, অক্ষশক্তির নেতাদের প্রবল চাপের কাছেও মাথা নত না করা এবং সর্বোপরি রহস্যময় অন্তর্ধান চে গুয়েভারার মতো ভারতবর্ষে সুভাষচন্দ্রকেও রূপকথার রাজপুত্রে পরিণত করেছে।
কিন্তু রাজনীতির একজন ছাত্র হিসাবে আমার উপলব্ধি একটু ভিন্ন। ত্রিপুরী কংগ্রেসই সুভাষচন্দ্রকে দেশনায়ক সুভাষচন্দ্রে পরিণত করেছে তথা এদেশের একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতায় পরিণত করেছে। আজাদ ফৌজ তাঁকে নেতাজী বললেও মূলতঃ দেশের মানুষের কাছে সুভাষচন্দ্রের পরিপূর্ণ জাতীয় নেতায় উত্তরণ ১৯৩৯ সালে। কমিউনিস্ট পার্টির ত্রিপুরীতে দ্বিতীয়বার কংগ্রেস সভাপতি পদে সুভাষচন্দ্রের নাম প্রস্তাব, গান্ধীজীর বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ত্রিপুরী কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচনে সুভাষচন্দ্র প্রার্থী হওয়ার এবং কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগিতায় সভাপতি পদে গান্ধীজীর প্রার্থীকে পরাস্ত করে ঐতিহাসিক বিজয় 'বাংলার নেতা' সুভাষচন্দ্রকে 'জাতীয় নেতা' তথা দেশে গান্ধীজী বিরোধী প্রধান মুখ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেয়। আর এইসব ঘটনাগুলোতে সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক জীবনে কমিউনিস্টদের ভূমিকা অপরিসীম।
Comments :0