ন্যায্য দাবিতে আশা কর্মীদের আন্দোলনে পুলিশের আক্রমণকে ‘অসভ্যতার সীমা লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেছেন সিপিআই(এম)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী। তিনি বলেছেন, আশা কর্মীদের ওপর পুলিশের আক্রমণ আবার দেখিয়ে দিল মহিলাদের প্রতি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি। ভাণ্ডার দেখিয়ে যারা ভেবেছিল মহিলাদের ভোট কিনে রাখা যাবে আজকে তারা রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখুন। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে পুলিশ মহিলাদের বাস থেকে নামিয়ে পিটিয়েছে, মারতে মারতে ট্রেনে তুলে দিয়েছে। অসভ্যতার সীমা লঙ্ঘন করেছে।
তিনি বলেছেন, আশা কর্মীরা ন্যায্য দাবিতে সঙ্গত আন্দোলন করছেন। ন্যূনতম মজুরির দাবি করবেন না কেন? অন্য রাজ্যে আশা কর্মীরা যে সুযোগ পান, এরাজ্যে তা পাবেন না কেন? মুখ্যমন্ত্রী লম্বা-চওড়া ভাষণ দিয়ে প্রতিশ্রুতি দেন, এখন ডেপুটেশন গ্রহণ করবেন না কেন? এটা কি পুলিশ-রাষ্ট্র নাকি? মুখ্যমন্ত্রী নিজে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পুলিশমন্ত্রী। মহিলা মুখ্যমন্ত্রী মহিলা কর্মীদের দাবিটুকুও জানাতে দেননি। যেভাবে মহিলা কর্মীদের ওপরে আক্রমণ করা হয়েছে মানুষ তার প্রতিবাদ করবে। অভয়া, হাঁসখালি, কামদুনি, পার্ক স্ট্রিট, দেখিয়ে দিয়েছে মহিলারা নিরাপদে নেই এরাজ্যে। আজকের পুলিশী আক্রমণে আবার তা প্রমাণিত হলো।
ন্যূনতম ১৫ হাজার টাকা স্থায়ী সাম্মানিক, সমস্ত বকেয়া প্রদান সহ একাধিক দাবিতে রাজ্যজুড়ে আন্দোলন চালাচ্ছেন আশা কর্মীরা। নিজেদের দাবি আদায়ে ২৯দিন ধরে রাজ্য জুড়ে কর্মবিরতি পালন করছেন তাঁরা। বুধবার স্বাস্থ্যভবনে ডেপুটেশন জমা দিতে যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু শিয়ালদহ, হাওড়া সহ রাজ্যের একাধিক জায়গায় তাঁদের আটকানো হয়েছে। কোথাও থানায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কোথাও স্টেশনে নামতেই ফের লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে গিয়ে ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়েছে। এমনকি, মহিলাদের ওপরে লাঠি চালানোও হয়েছে। ঘোষিত কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে ধর্মতলা এবং সল্টলেকে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান বিক্ষোভ করেন আশা কর্মীরা।
এদিন সিআইটিইউ অনুমোদিত পশ্চিমবঙ্গ আশা কর্মী ইউনিয়নের সম্পাদিকা সাবিনা ইয়াসমিন আশা কর্মীদের এই আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়ে বলেন, যে সমস্ত দাবি নিয়ে আশা কর্মীদের একটি সংগঠনের নেতৃত্বে এদিন শিয়ালদহ সহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন, সেই একই দাবিতে আমরাও দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছি। আমরা পরিষেবা বজায় রেখে লড়াই করছি, তাঁরা কর্মবিরতির মধ্যে দিয়ে রাস্তায় নেমে লড়াই করছেন। এই সমস্ত আশা কর্মীরা ন্যায়সঙ্গত দাবিতে আন্দোলনে শামিল হয়ে কোন অপরাধ করেননি, অথচ তাঁদের ওপর পুলিশী অত্যাচার নামিয়ে আনা হলো, লাঠি চালানো হলো, গ্রেপ্তার করা হলো। আমরা এই পুলিশী নির্মমতার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
সাবিনা ইয়াসমিন আরও বলেন, লড়াই সবার অধিকার, লড়াই সবাই করতে পারে। কোন আশা কর্মীকে যদি হেনস্তা করা হয় আমরা তার প্রতিবাদে ঝাঁপিয়ে পড়বো। আশা কর্মীদের আন্দোলনের পাশে আমরাও থাকবো। আমরা লড়াই যেভাবে চালাচ্ছি সেভাবেই চালিয়ে যাবো। আমাদের দাবি একই, ন্যূনতম মজুরির। সারা ভারতে মজুরি মাসে ২৬ হাজার টাকা, মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমরা রাজ্য সরকারের কাছে দাবি করেছি ন্যূনতম ১৫ হাজার টাকা মজুরি দিতে হবে, কর্মরত অবস্থায় মারা গেলে ৫ লক্ষ টাকা, মোবাইলের ডেটা প্যাকেজ বাবদ ৩৩০ টাকা দিতে হবে। পাশাপাশি, মেডিক্যাল ও মাতৃত্বকালীন ছুটি দিতে হবে। এই সব দাবিতে আমাদের লড়াই চলবে। সরকার এবং পুলিশের উদ্দেশ্যে আমরা বলছি, আপনারা আশা কর্মীদের হেনস্তা বন্ধ করুন। আশা কর্মীদের লড়াইটা তাঁদের লড়তে দিন, তাঁদের দাবিগুলি নিয়ে অন্তত স্বাস্থ্যভবনে পৌঁছতে দিন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে।
এদিকে এদিন সাংবাদিকদের অপর একটি প্রশ্নের উত্তরে সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, বিজেপি প্রচার করছে, মুসলিমরা তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক। বাস্তবে এরকম কোন ভোটব্যাঙ্ক হয় না। হিন্দু মুসলিম কোন মানুষ কারো কেনা গোলাম নয়। মুসলিমরা সবাই তৃণমূলকে সমর্থন করছে এটা ভুল কথা। মুসলিমরাও বুঝতে পারছেন মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। মাদ্রাসা শিক্ষক নিয়োগ, ওয়াকফের কেন্দ্রীয় আইন কার্যকরী করা, ওবিসি সংরক্ষণ বানচাল করা, সব ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের অধিকার কেড়ে নিয়েছে তৃণমূল। বিজেপি’র পথেই এরাজ্যে তৃণমূল কাজ করছে। তাই মুসলিমরাও অপেক্ষায় আছেন, জবাব দেবেন যথাসময়ে। বাংলার ঐতিহ্য রাজনীতি থেকে ধর্মকে দূরে রাখা। যারা দেশভাগ করেছিল বাংলার রাজনীতিতে তাদের ঠাঁই হয়নি। এখন তৃণমূল সরকারে আসার পরে বিজেপি’র সঙ্গে মিলে ওরা হিন্দু মুসলিম ভোট ভাগাভাগির চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলার মানুষ তা হতে দেবেন না, এখানে রাজনীতি জীবন-জীবিকার ভিত্তিতে হবে, ধর্মের ভিত্তিতে নয়।
সিঙ্গুরে প্রধানমন্ত্রীর পর মুখ্যমন্ত্রীর সভা করতে যাওয়ার কর্মসূচি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, বিজেপি নেতারা এমন ভাব করেছিলেন যেন মোদী ঘাড়ে করে শিল্প নিয়ে আসবেন সিঙ্গুরে। কিন্তু মোদী একটা শব্দও উচ্চারণ করেননি। কর্মসংস্থানে ওঁর কোন আগ্রহ নেই। আর মমতা ব্যানার্জি সিঙ্গুরে গিয়ে কী বলবেন? বাংলা যখন কর্মসংস্থানে এগোচ্ছিল, তখন বিজেপি’র প্রশ্রয়ে তৃণমূল বাংলার শিল্পায়নকে ধ্বংস করেছে।
Sujan Chakraborty
আশা কর্মীদের আক্রমণ অসভ্যতার সীমা লঙ্ঘন, বললেন সুজন চক্রবর্তী
×
Comments :0