‘‘ওরা আমায় ‘ড্যাডি’ (বাপ) বলে ডাকে!’’ গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তাঁর ‘জেদে’ ইউরোপীয় দেশগুলির বিরোধিতা উড়িয়ে, বুধবার ব্যঙ্গের সুরে এমনই দাবি করলেন আমেরিকা রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সম্প্রতি ডেনমার্কের অধীনস্থ গ্রিনল্যান্ড আমেরিকার দখলে আনা নিয়ে ট্রাম্প যে সমানে দাবি করে চলেছেন, পশ্চিমি জোট তাতে ভাঙনের মুখোমুখি। ন্যাটো শরিকদের সঙ্গে তুমুল বাগবিতণ্ডা ও বাণিজ্য সংঘাতে জড়িয়েছে ওয়াশিংটন। গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন ‘কর্তৃত্ব’ স্বীকার না করায় গত সপ্তাহেই পশ্চিম ইউরোপের একাধিক দেশের ওপর ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক চাপিয়েছেন ট্রাম্প। পরে তা বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার হুমকি দিয়েছেন। এরই মধ্যে, চলতি সপ্তাহ থেকে সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের অধিবেশন শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা সেখানে বক্তব্য রাখেন। বুধবার অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন ট্রাম্প। গ্রিনল্যান্ডের ‘দখল’ নিয়ে আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যে টানাপোড়েন যে কার্যত ঠান্ডা যুদ্ধের দিকে এগিয়েছে, ট্রাম্পের এদিনের ভাষণে তা স্পষ্টত বোঝা গিয়েছে।
বুধবার ডাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চে, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণের কেন্দ্রে অর্থনীতি বা বাণিজ্যের বদলে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যতই কেন্দ্র হয়ে ওঠে। গ্রিনল্যান্ডকে তিনি আমেরিকার ‘জন্মগত অধিকার’ বলে দাবি করেন। যে করেই হোক এই ডেনমার্কের অধীনস্থ এই স্বশাসিত দ্বিপরাষ্ট্রকে আমেরিকার অধীনে আনার জন্য তিনি যাবতীয় চেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেন, ‘‘আমি বলপ্রয়োগ করতে চাই না, করবও না। তবে আমাদের চাহিদাতে অনড় থাকব। আমরা শুধু একটা জায়গাই চাই— গ্রিনল্যান্ড।’’
বুধবার বলপ্রয়োগে অনিচ্ছা দেখালেও, দিন দুয়েক আগেই ট্রাম্প ওয়াশিংটনের এক সংবাদ সম্মেলনে ইঙ্গিত দেন, গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার অংশ হিসেবে ‘গ্রহণ’ করতে, পরিস্থিতির নিরিখে তাঁর প্রশাসন সামরিক-অসামরিক দুই রকম পদক্ষেপের কথাই ভাবতে পারেন। এছাড়াও বুধবারের ভাষণে, ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের ‘মালিকানা হস্তান্তর’ নিয়ে পত্রপাঠ বৈঠক ও ফয়সালার দাবি করেছেন।
বুধবার ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, গ্রিনল্যান্ডের মতো ‘বড়, সুন্দর বরফের দ্বীপ’ কেবল আমেরিকার হাতেই নিরাপদ থাকবে। ডেনমার্কের অধীনে গ্রিনল্যান্ড সুরক্ষিত নয়। তিনি আরও বলেন, ‘‘লিজ বা লাইসেন্স চুক্তিতে কোনও ভূখণ্ড রক্ষা করা যায় না। একমাত্র বিকল্প পূর্ণ মালিকানা!’’ প্রসঙ্গত গত শতকের পাঁচের দশকে আমেরিকা ও ডেনমার্কের মধ্যে একাধিক চুক্তির ভিত্তিতে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক বাহিনী গত সাত দশক ধরে স্থায়ী উপস্থিতি রেখেছে। বাস্তবে গ্রিনল্যান্ড কেবল নামেই স্বশাসিত। তার বিদেশ নীতি ও প্রতিরক্ষা নীতি পরিচালনা করে ডেনমার্ক। সেখানে সামরিক উপস্থিতি রাখার অধিকার একমাত্র আমেরিকার রয়েছে। তা সত্ত্বেও ট্রাম্পের দাবি, গ্রিনল্যান্ড নাকি নিরাপদ নয়। রাশিয়া ও চীন নাকি অচিরেই এই দ্বীপরাষ্ট্রকে ‘গিলে খাবে!’
গত সাত দশক ধরে গ্রিনল্যান্ডের মানুষ পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে সরব। তবে বর্তমানে আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলির এই দড়ি টানাটানিতে তাঁরা উভয়সঙ্কটের স্বীকার। আমেরিকার থেকে ডেনমার্কের ‘অধীনেই’ গ্রিনল্যান্ডের সাধারণ মানুষের বড় অংশ থাকার পক্ষপাতী। সম্প্রতি সেখানকার স্থানীয় সরকারও একই মতামত রেখেছে। তবে ট্রাম্প তা মানতে রাজি নন। গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নেওয়ার বদলে, সেখানকার প্রত্যেক জন নাগরিককে মাথাপিছু ১ লক্ষ ডলার দেওয়ার ‘অফার’-ও দিয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি। তার জবাবে গ্রিনল্যান্ডের মূলনিবাসী মানুষ স্পষ্টত জানিয়েছেন, নিজেদের দেশ তাঁরা বিক্রি করতে রাজি নন।
বুধবার ডাভোসে ট্রাম্প নিজের ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে আরও উগ্র অবস্থান নিয়েছেন। মার্কিন রাষ্ট্রপতির নানা মন্তব্যে কূটনৈতিক মহলে জোড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বক্তৃতার এক পর্যায়ে ট্রাম্প ইউরোপের প্রতি নিজের অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘‘আমি ইউরোপকে সাহায্য করছি, ন্যাটোকে সাহায্য করছি। ওরা আমায় ‘ড্যাডি’ বলে ডাকে।’’ এরই মধ্যে নিজের ভাষণে গ্রিনল্যান্ডের বদলে একাধিকবার ট্রাম্প আইসল্যান্ডের নাম উচ্চারণ করেন, যা শ্রোতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা দাবি করার পিছনে যুক্তি হিসেবে ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রসঙ্গ তোলেন। ইউরোপীয় দেশগুলিকে হুমকির সুরে তিনি বলেন, ‘‘আমরা না থাকলে আজ আপনারা জার্মান বা জাপানি ভাষায় কথা বলতেন।’’ ডেনমার্ক মাত্র ছয় ঘণ্টার মধ্যেই জার্মান বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছিল বলে মন্তব্য করে তিনি আমেরিকার ত্যাগ ও ব্যয়ের কথা মনে করিয়ে দেন। ইউরোপ ও ন্যাটো-র প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন, ‘‘আমরা ন্যাটো-র পাশে ১০০ শতাংশ থাকি, কিন্তু তারা আমাদের পাশে থাকবে কিনা, আমি নিশ্চিত নই।’’
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এদিন ট্রাম্পের মন্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে একাধিক পশ্চিমি দেশের সরকার। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানান, একজোট হয়ে আমেরিকার ‘দাদাগিরি’ মোকাবিলা করতে হবে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেন, আমেরিকা শুল্ক নিয়ে কোন আগ্রাসী আচরণ করলে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘ঐক্যবদ্ধ ও সমানুপাতিক’ প্রতিক্রিয়া জানাবে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, ‘‘আমেরিকার হুমকিতে আমরা নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসব না।’’ ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রোঁও ‘গা জোয়ারি’ প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানান।
Trump Greenland
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আরও উগ্র অবস্থান ট্রাম্পের
×
Comments :0