Post editorials

বিশ্বকাপ: চোখ কপালে না কি টিভি’র পর্দায়! শমীক লাহিড়ী

উত্তর সম্পাদকীয়​

 

১৬ নভেম্বর ২০২২। বিশ্বের জনসংখ্যা পৌঁছেছে ৮০০ কোটিতে।
২০ নভেম্বর ২০২২। ৫০০ কোটি মানুষ টেলিভিশনের সামনে জড়ো হবে একটা খেলাকে কেন্দ্র করে। ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫০০ কোটি মানুষের আবেগ-ভালোবাসা দোলা খাবে বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে। আর কোনও খেলাকে কেন্দ্র করে এবং একটা টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু উত্তাল হয়ে ওঠে না।
১৯৩০ সালে কিংবদন্তী ফুটবল প্রশাসক তৎকালীন ফিফার সভাপতি জুলে রিমের হাত ধরে পথ চলা শুরু হয়েছিল প্রথম ফিফা আয়োজিত দেশ ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফুটবলের। পরবর্তীতে তার নামেই নামাঙ্কিত হয়েছিল ফুটবল বিশ্বকাপ। ব্রাজিল পরপর ৩বার বিশ্বকাপ জেতায় ‘জুলে রিমে কাপ’- এর স্থায়ী মালিকানা তাদের হাতে চলে যায় ১৯৭০ সালে। মাঝে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের সময় কেবলমাত্র ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে এই টুর্নামেন্ট হয়নি। ২০২২ সালের বিশ্বকাপের আগে ২১টা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপে ফিফার মোট খরচ হয়েছিল মাত্র ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, যেখানে এই বছর খরচ হবে ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এবারের বিশ্বকাপে কয়েকটি অভূতপূর্ব ঘটনা সমগ্র বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের চোখ কপালে তুলে দিয়েছে। শুধুমাত্র এই টুর্নামেন্টের জন্য এবার খরচ হচ্ছে ২২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৮.৭৭ লক্ষ কোটি টাকা। এযাবৎ কোনও বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে এই বিপুল অর্থ খরচ হয়নি। ২০১৮ সালে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে খরচ হয়েছিল ১১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০১৪ সালে ব্রাজিলে খরচ হয়েছিল ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই বিপুল অর্থ খরচের মূল কারণ, কাতারে বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজিত হতে পারে এমন কোনও স্টেডিয়ামই ছিল না। নতুন করে বিশ্বকাপের ৬৪টি ম্যাচের জন্য ৮টি স্টেডিয়াম বানাতে হয়েছে, যার আনুমানিক খরচ ৮ বিলিয়ান মার্কিন ডলার। কিন্তু মজার ব্যাপার এই টুর্নামেন্ট শেষ হয়ে গেলে এই স্টেডিয়ামগুলি কোনও কাজেই লাগবে না। কারণ সে দেশের জনসংখ্যা মাত্র ২৯ লক্ষ ৯৬ হাজার। তাই এমনভাবে স্টেডিয়ামগুলি বানানো হয়েছে যাতে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবার পর এগুলির চেয়ার, ইস্পাত ইত্যাদি নানাবিধ ব্যবহৃত সরঞ্জাম খুলে অন্যান্য কাজে লাগানো যায় বা বিক্রি করা যায়।
এছাড়াও নাকি ৬০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়েছে পরিকাঠামো নির্মাণের জন্য। যেমন, বিভিন্ন শহরের স্টেডিয়ামগুলিতে যাতায়াতের জন্য ড্রাইভারবিহীন মেট্রোরেল, রাস্তা, ফ্লাইওভার, হোটেল, পর্যটন কেন্দ্র ইত্যাদি তৈরি করার জন্য। বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবার পর সে দেশের ৩০ লক্ষ মানুষের কী কাজে এগুলি লাগবে, তা অবশ্য সংগঠক দেশ কিছু জানায়নি। তবে ৩০ লক্ষের দেশ হলেও এই বছর কাতারের মোট জাতীয় উৎপাদন দাঁড়াবে ১৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ হবার কারণ সে দেশের অফুরান প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের ভাণ্ডার। 
এর আগে পৃথিবীতে এমন কোনও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয়নি যা একসাথে ৫০০ কোটি মানুষ দেখেছে। অন্তত এই টুর্নামেন্টের আয়োজক ফিফার বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যানটিনো’র দাবি এটাই।
এবারের বিশ্বকাপে টিকিটের দামও হয়েছে আকাশছোঁয়া। টিকিটের ৪ রকমের দাম নির্ধারণ করেছে ফিফা, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। ২০ নভেম্বর উদ্বোধনী ম্যাচের টিকিটের দাম যথাক্রমে ৮,৬১০ টাকা থেকে শুরু করে ১৭,২২০ টাকা পর্যন্ত। শেষ ১৬ দলের ম্যাচগুলির টিকিটের মূল্য ৯,৪৩০ টাকা থেকে শুরু করে ২২,৫৫০ টাকা পর্যন্ত। কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচগুলির টিকিটের মূল্য ১৬,৮৯২ টাকা থেকে শুরু করে ৩৪,৯৩২টাকা পর্যন্ত। সেমিফাইনাল দুটির টিকিটের জন্য দর্শকদের রেস্ত গুনতে হবে ২৯,২৭৪ টাকা থেকে শুরু করে ৭৮,৩৯২ টাকা পর্যন্ত। যদি কেউ তৃতীয় স্থান নির্ণায়কের খেলা দেখতে চায় তাহলে গুনতে হবে  ১৬,৮৯২ টাকা থেকে শুরু করে ৩৪,৯৩২ টাকা পর্যন্ত। আর ফাইনাল দেখার খরচ ৪৯,৫২৮ টাকা থেকে শুরু করে  ৮,৬৭,৭৭৪ টাকা পর্যন্ত। অবশ্য কাতারবাসীর জন্য সস্তার কিছু টিকিট রাখা হয়েছে, যার মূল্য ৫৭৪ টাকা থেকে শুরু করে ৬৫৬ টাকা পর্যন্ত। এই নিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছে আয়োজক ফিফা এবং সংগঠক দেশ কাতার। (১ মার্কিন ডলার = ৮২ টাকা)
এই ফুটবল প্রতিযোগিতায় ৩২ দেশের ৮৩২জন পৃথিবী বিখ্যাত খেলোয়াড়রা অংশ নেবেন। বিশ্বের ফুটবল এখন নিয়ন্ত্রণ করে মূলত ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলি। এইসব ক্লাবগুলি  খেলোয়াড়দের বেতন ও অন্যান্য সুবিধা সহ বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করে। এদের অনেক খেলোয়াড়দেরই বিভিন্ন দেশের হয়ে খেলতে দেখা যাবে বিশ্বকাপে। সেই হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে দামী দল ইংল্যান্ড, যার মূল্য ধরা হয় ১.৩৫ বিলিয়ন ইউরো, মানে ১১,৪০৮ কোটি টাকা। ফ্রান্সের জাতীয় দলের মূল্য এই হিসাবে দাঁড়ায়  ৯,৬৩৩ কোটি টাকা,  ব্রাজিল - ৮,৯৫৭ কোটি টাকা, স্পেন - ৮,৭০৪ কোটি টাকা, জার্মানি - ৮,৬১৯ কোটি টাকা, পর্তুগাল - ৭,৯০৩ কোটি টাকা, আর্জেন্টিনা - ৬,৪০৭ কোটি টাকা (১ইউরো = ৮৪.৫০টাকা)। 
আসলে ইউরোপের ক্লাবগুলিতে খেলা ফুটবলের মহাতারকাদের দরও আকাশছোঁয়া। ফোর্বস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর সর্বোচ্চ আয়কারী মাত্র ১০জন ফুটবলারের মোট আয়ের পরিমাণ ৬৫২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাৎ প্রায় ৫,৩৮০ কোটি টাকা এই বছরেই। এর মধ্যে সর্বোচ্চ আয়ের তারকা হলেন ফ্রান্সের মাত্র ২৩ বছর বয়সি কিলিয়ান এমবাপে। এই বছর তাঁর আয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১,০৫৬ কোটি টাকা। তবে এর মধ্যে খেলার বিনিময়ে আয় হয় একটি অংশ এবং বিজ্ঞাপন সহ অন্যান্য সূত্র থেকে আয় হয় বাকিটা। যেমন এবছর ৩৫ বছর বয়সি ফুটবলের জাদুকর মেসির মোট আয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৯৭৫ কোটি টাকা, কিন্তু এর অর্ধেক আয় খেলার বিনিময়ে আর বাকিটা অন্যান্য সূত্র থেকে আসবে। যে সব মহাতারকা ফুটবলাররা বছরে ৮২০ কোটি টাকার বেশি আয় করেন তাদের মধ্যে এমবাপে, মেসি ছাড়াও আছেন পর্তুগালের রোনাল্ডো। এই ম্যাগাজিনের হিসাব অনুযায়ী এই ৩ মহাতারকা ছাড়াও আয়ের দিক থেকে তালিকার শীর্ষে রয়েছেন ব্রাজিলের নেইমার জুনিয়র, মিশরের মহম্মদ সালাহ,  নরওয়ের আরলিং হালান্ড, পোল্যান্ডের রবার্ট লেওয়ানডস্কি, বেলজিয়ামের ইডেন হ্যাজার্ড ও কেভিন ডে ব্রুইন। অবশ্য এই মহা আয়ের মহা তারকাদের অনেককেই এবারের বিশ্বকাপে খেলতে দেখা যাবে না নানা কারণে।
ইউরোপের গুটিকয়েক ধনী ক্লাবের সাথেই যুক্ত বিশ্বের মহাতারকা ফুটবলাররা। এই বারের বিশ্বকাপে খেলবেন এমন ৮৯ জন তারকা খেলোয়াড় যাঁরা মূলত ইউরোপের ৬টি ক্লাবেই খেলেন। জার্মানির লিগ বুন্দেশলিগার চাম্পিয়ান দল বায়ার্ন মিউনিখ দলের ১৬ জন খেলোয়াড়কে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের হ’য়ে খেলতে দেখা যাবে। একইভাবে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ম্যানচেস্টার সিটি দলের ১৬ জন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড দলের ১৪ জন, চেলসি দলের ১৩ জন, স্প্যানিশ লা লিগার বার্সেলোনা দলের ১৭ জন, রিয়েল মাদ্রিদ দলের ১৩ জনকে খেলতে দেখা যাবে বিভিন্ন দেশের হয়ে। এছাড়াও ইটালির সিরি’এ লিগের নাপোলি, এসি মিলান, জুভেন্তাস এবং লাজ্জিও ক্লাবের বেশ কয়েকজন তারকাকেও বিভিন্ন দেশের হয়ে খেলতে দেখা যাবে। নেদারল্যান্ডের এরিডিভিস লিগের নামীদামি ক্লাবগুলির অনেককেও দেখা যাবে বিভিন্ন দেশের হয়ে খেলতে।
এমনকি এশিয়ার ফুটবলেও গুটিকয়েক ক্লাবেরই আধিপত্য বজায় আছে। কাতারের ‘স্টার ফুটবল লিগ’- এর চাম্পিয়ান দল আল-শাদ দলের ১৩জন খেলোয়াড়কে নিজের দেশের হয়ে খেলতে দেখা যাবে। সৌদি আরবের ‘সৌদি প্রো লিগ’- এর চ্যাম্পিয়ান দল আল-হিলাল দলের ১২ জন খেলোয়াড় সেই দেশের জাতীয় দলে স্থান পেয়েছেন। এর থেকে বোঝা যায় হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র ক্লাব নিজেদের দখলে রেখেছে ফুটবল দুনিয়াকে।  
এটা অনুমান করা হয় ২০২১ সালে ফুটবলের নানা সাজসরঞ্জাম বিক্রির বাজারের পরিমাণ ছিল ৬লক্ষ ৩৮হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে পরবর্তী বিশ্বকাপ ২০২৬ সালে হওয়ার পর ফুটবলকে কেন্দ্র করে আনুমানিক অর্থনীতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৩০ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি।
পৃথিবীর আর কোনও খেলাকে কেন্দ্র করে এই বিশাল অর্থনীতি তৈরি হতে পারেনি। তবে একটা আশঙ্কা ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েই যাচ্ছে– ‘বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর খেলা’ অর্থের চাপে হারিয়ে না যায় এবং সবচেয়ে গরিব মানুষ যারা এই খেলাকে বিশ্বে সর্বজনীন করে রেখেছে তারা ফুটবল থেকে বঞ্চিত না হয়!
 

0 Comments

Login to leave a comment