মাত্র ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ড। বৃহস্পতিবার সকালে সম্ভবত এই সময়টুকুই ছিল লোকসভায় চলতি বাদল অধিবেশনের সবচেয়ে শান্ত মুহূর্ত। অধিবেশন শুরু হল, জাতীয় সঙ্গীত বন্দে মাতরম্ বাজল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-সহ সাংসদরা দাঁড়িয়ে সম্মান জানালেন। এরপরই লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ঘোষণা করলেন, ‘হাউস অ্যাডজার্নড সাইন ডাই’ অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতুবি হয়ে গেল অধিবেশন।
তবে তার আগে সকাল থেকেই উত্তপ্ত ছিল সংসদ চত্বর। বেলা ১১টার আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লোকসভায় ঢুকতেই বিরোধী সাংসদরা স্লোগান দিতে শুরু করেন ‘ক্ষমা চাইতে হবে’, ‘লাঠিচার্জের নির্দেশ কে দিয়েছিল?’ পাল্টা হইচই শুরু করেন শাসকদলের সাংসদরাও। অমিত শাহ তাদের শান্ত হয়ে আসন গ্রহণের ইঙ্গিত দেন। পরে শাসকদলের সাংসদরা বসে পড়েন।
এরপর লোকসভায় প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বাজতে শুরু করে ‘বন্দে মাতরম্’। আর তার পরেই স্পিকার ওম বিড়লা ঘোষণা করেন অধিবেশন মুলতুবির কথা। এর মধ্য দিয়ে স্লোগান, হট্টগোল, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং রাজনৈতিক সংঘাতেই শেষ হল ২০ জুলাই শুরু হওয়া বাদল অধিবেশন।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, অধিবেশন শেষ হওয়ার আগে স্পিকার সাধারণত যে বিদায়ী ভাষণ দেন, যেখানে সংসদের কাজকর্ম ও উৎপাদনশীলতার খতিয়ান তুলে ধরা হয়, এবার তা দেননি। কারণ, আলোচনার সুযোগই কার্যত তৈরি হয়নি।
অধিবেশনের শুরু থেকেই বিরোধীদের লাগাতার বিক্ষোভের কেন্দ্র ছিল একাধিক বিষয়। প্রথমে নিট প্রশ্নফাঁস, পরে অযোধ্যার রাম মন্দিরের অনুদানের টাকা চুরির অভিযোগ নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ। এর পাশাপাশি দিল্লিতে ২০ জুলাই আন্দোলনরত পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপ নিয়েও অমিত শাহের বিবৃতি দাবি করে বিরোধীরা।
বুধবার অমিত শাহ জানিয়েছিলেন, পড়ুয়াদের বিষয়টি নিয়ে তিনি আলোচনায় প্রস্তুত এবং বিরোধীরা যে প্রশ্নই তুলবেন, প্রতিটির উত্তর দেবেন। আলোচনার জন্য স্পিকারের সঙ্গে বিরোধীদের সময় নির্ধারণেরও প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিরোধীরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে অমিত শাহের পদত্যাগের দাবি তোলে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, ‘পড়ুয়াদের উপর গুলি চালানোর নির্দেশ কে দিয়েছিল? দিল্লি পুলিশ এবং র্যা ফ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে। অমিত শাহ কি নির্দেশ দিয়েছিলেন? দিলে তিনি দায়ী, আর না দিলে তিনি অক্ষম। দুই ক্ষেত্রেই তার পদত্যাগ করা উচিত।’
লোকসভা মুলতুবি হওয়ার পরও রাজনৈতিক উত্তেজনা থামেনি। স্পিকারের প্রথাগত চা-চক্রও বয়কট করেন ইন্ডিয়া মঞ্চের নেতারা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-সহ এনডিএ-র শীর্ষ নেতারা সেই বৈঠকে উপস্থিত থাকলেও বিরোধী শিবিরের নেতারা যাননি।
সূত্রের খবর, সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং কে সি বেণুগোপালকে চা-চক্রে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তারা সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের দপ্তরে চলে যান।
কাগজে-কলমে লোকসভায় মোট ১১টি বিল পাশ হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত নতুন আইন ছাড়া প্রায় সব বিলই বিরোধীদের স্লোগান ও হট্টগোলের মধ্যে দ্রুত পাশ করানো হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনও বিস্তারিত আলোচনা ছাড়াই ধ্বনি ভোটে কয়েক মিনিটের মধ্যে বিল পাশ হয়।
এর মধ্যে শুধুমাত্র প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত নতুন আইন নিয়ে প্রায় ১১ ঘণ্টা আলোচনা হয়। এরপরই সেটি পাশ করা হয়। বাকি বিলগুলির ক্ষেত্রে সেই ধরনের বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।
বুধবার সংসদে কয়েক মিনিটের জন্য সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে এফসিআরএ বিল নিয়েও তীব্র বাদানুবাদ হয়। সরকার বিলটি যৌথ সংসদীয় কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। কংগ্রেস এবং সমাজবাদী পার্টি-সহ বিরোধীরা বিলটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে একে সংখ্যালঘু-বিরোধী এবং এনজিও-বিরোধী বলে অভিযোগ করে। যদিও সরকার সেই অভিযোগ খারিজ করে। শেষ পর্যন্ত বিলটি জেপিসিতে পাঠানো হয়।
অধিবেশনের শেষ দিন সংসদ চত্বরেও মুখোমুখি অবস্থানে দেখা যায় সরকার ও বিরোধী শিবিরকে। ইন্ডিয়া মঞ্চ অমিত শাহকে নিশানা করে বিক্ষোভ চালিয়ে যায় এবং রাম মন্দিরের অনুদানের টাকা নিয়ে অভিযোগ তোলে।
অন্যদিকে এনডিএ-র সাংসদরা ঝাড়খণ্ডে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপের প্রতিবাদে পাল্টা বিক্ষোভ করেন। সেই আন্দোলনে কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধীকেই নিশানা করে শাসকদল।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ বাদল অধিবেশনের শেষ ছবিটা ছিল সংসদের ভিতরে স্লোগান ও হট্টগোল, আর বাইরে পাল্টা রাজনৈতিক বিক্ষোভ। বিতর্কের বদলে সংঘাতই হয়ে উঠলো অধিবেশনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
Monsoon Session 2026
হট্টগোল, স্লোগান আর পাল্টা আক্রমণের মধ্যেই শেষ বাদল অধিবেশন
×
Comments :0