মুক্তধারা
প্রবন্ধ
স্বাধীনতা সংগ্রামী বিজয় মোদক ও বলাগড়
অয়ন মুখোপাধ্যায়
৬ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
বলাগড়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস লিখতে গেলে কমরেড বিজয় কৃষ্ণ মোদককে বাদ দিয়ে কখনওই লেখা যাবে না। আজ তাঁর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় বলাগড় বিজয় কৃষ্ণ মহাবিদ্যালয়ের সূত্র ধরে। কিন্তু কলেজের নামের আড়ালে যে মানুষটি রয়েছেন, তাঁর জীবনজুড়ে যেমন রয়েছে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বিপ্লবের ইতিহাস, তেমনই রয়েছে দীর্ঘ কারাবাস, কৃষক-জেলে আন্দোলন, দুর্ভিক্ষে ত্রাণকাজ এবং পরিশেষে সংসদীয় রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়।
১৯০৬ সালের ২৭ জুন বিজয় কৃষ্ণ মোদকের জন্ম। কিশোর বয়সেই তিনি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সংস্পর্শে আসেন। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। জাতীয় শিক্ষা, স্বদেশি ভাবনা এবং বিপ্লবী রাজনীতির পরিবেশ তাঁকে খুব দ্রুত প্রভাবিত করে।
১৯২২ সালে আরামবাগে বন্যা হলে তিনি ত্রাণের কাজে নামেন। ছাত্রজীবনেই তাঁর রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তিনি রাজনীতিকে শুধু স্লোগানের মধ্যে বেঁধে রাখেননি; মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাকেও রাজনীতির অংশ বলে মনে করেছেন।
পরে তিনি প্রযুক্তিবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু নিশ্চিন্ত পেশাজীবনের বদলে তিনি বেছে নেন বিপ্লবী রাজনীতি।
১৯২৫ সালে কমরেড বিজয় মোদক যুগান্তর দলে যোগ দেন। দক্ষিণেশ্বর বোমা মামলার সূত্রে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। মুক্তির পরেও তিনি আন্দোলন ছাড়েননি।
১৯২৮ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পূর্ণকালীন কর্মী হন। একই সঙ্গে আরামবাগ অঞ্চলে কৃষক সংগঠন ও ত্রাণের কাজে যুক্ত থাকেন। ১৯৩১ সালে ইন্ডিয়ান প্রলেতারিয়ান রেভলিউশনারি পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর রাজনীতিতে শ্রেণিচেতনা আরও স্পষ্ট হয়। শুধু ব্রিটিশ শাসনের অবসান নয়, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিকেও তিনি স্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
ব্রিটিশ সরকার তাঁকে দীর্ঘ সময় বন্দি রাখে। দেউলি বন্দিশিবিরে তিনি প্রায় সাত বছর কাটান। ১৯৩৮-৩৯ সালের দিকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন।
এই সময় থেকেই বলাগড় তাঁর রাজনৈতিক কর্মজীবনের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বলাগড়ের বন্যাপ্রবণ গ্রামগুলিতে ত্রাণের কাজ করতে গিয়ে তিনি সেখানকার কৃষকদের সংগঠিত করেন এবং গ্রামীণ জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যান। শ্রীকান্ত গ্রামে একটি স্কুলঘর তৈরির সময় ইঞ্জিনিয়ার বিজয় মোদক নিজে মাথায় মাটির ঝুড়ি বহন করেছিলেন। এই একটি ঘটনাই তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের অনেকটা বুঝিয়ে দেয়। কমরেড বিজয় মোদক নেতা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব রেখে রাজনীতি করেননি।
১৯৪১ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার জন্য ব্রিটিশ সরকার আবার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে তিনি আবার ত্রাণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
১৯৪৬ সালে কাজল গুহার সঙ্গে মিলে তিনি বলাগড়ে জেলে বা ধীবরদের সংগঠন গড়ে তোলেন। গঙ্গানির্ভর বলাগড়ের অর্থনীতিতে জেলে সম্প্রদায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাঁরা দীর্ঘদিন সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক ছিলেন। বিজয় মোদক তাঁদের জীবিকা ও অধিকারের প্রশ্নকে সংগঠিত রাজনীতির মধ্যে নিয়ে আসেন।
স্বাধীনতার পরেও তাঁর আন্দোলন থামেনি। ১৯৪৮ সালে সরকার তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করে। মুক্তির পর তিনি বড়কামালপুরের কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
১৯৫৩ সালে কুঞ্জলাল দাশগুপ্তের সঙ্গে বলাগড়ে উদ্বাস্তু আন্দোলন সংগঠিত করেন। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন ও অধিকারের প্রশ্ন তখন হুগলি জেলার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে উঠেছিল।
১৯৫৬ সালে তিনি অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির হুগলি জেলা কমিটির সম্পাদক হন। ১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা নেন এবং গ্রেপ্তার হন। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হলে তিনি সিপিআই(এম)-এর সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৬ সালের মধ্যেও তাঁকে দীর্ঘ সময় বন্দি থাকতে হয়।
গণআন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনী রাজনীতিতেও বিজয় মোদক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। ১৯৫৭ সালে বলাগড় বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত বিধায়ক থাকেন। এরপর জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৬৭, ১৯৭১ ও ১৯৭৭ সালে হুগলি লোকসভা কেন্দ্র থেকে এবং ১৯৮০ সালে আরামবাগ লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন। অর্থাৎ গ্রামীণ সংগঠক থেকে তিনি ধাপে ধাপে জাতীয় সংসদে পৌঁছেছিলেন।
কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়কে শুধু বিধায়ক বা সাংসদ হিসেবে দেখলে জীবনের বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। সংসদে যাওয়ার বহু আগে থেকেই তিনি কৃষক, জেলে, উদ্বাস্তু এবং দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বলা যায়, তাঁর নির্বাচনী সাফল্য ছিল দীর্ঘ মাঠের রাজনীতিরই পরিণতি।
১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বলাগড় বিজয় কৃষ্ণ মহাবিদ্যালয় তাঁর নাম বহন করে। এই নামকরণ নিছক সম্মান নয়; বলাগড়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের স্বীকৃতি।
১৯৯৪ সালের ৯ মে বিজয় কৃষ্ণ মোদক মারা যান। তাঁর জীবন ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লব থেকে স্বাধীন ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র পর্যন্ত প্রায় গোটা বিশ শতকের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী।
বিজয় মোদকের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত এখানেই—তিনি স্বাধীনতাকে শুধু ব্রিটিশ শাসনের অবসান হিসেবে দেখেননি। কৃষকের জমি, জেলের জীবিকা, উদ্বাস্তুর আশ্রয়, দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের খাদ্য এবং গ্রামের শিক্ষার সুযোগ—এই বাস্তব প্রশ্নগুলির মধ্যেই তিনি স্বাধীনতার অর্থ খুঁজেছিলেন।
তাই বিজয় মোদক শুধু বলাগড়ের একজন প্রাক্তন বিধায়ক বা হুগলির প্রাক্তন সাংসদ নন। তিনি সেই রাজনৈতিক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা স্বাধীনতার লড়াইকে সরাসরি গ্রামের মানুষের জীবন ও অধিকারের লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। বলাগড়ের ইতিহাসে তাঁর গুরুত্ব সেখানেই
Comments :0