কৃষি সঙ্কটে জেরবার কৃষকের ঋণের বোঝা বাড়লেও তার ঋণে মকুব হয় সামান্যই। অন্যদিকে কর্পোরেটের মুনাফা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে তার ঋণ মকুবের পরিমাণও। আবার বড় কর্পোরেটের মধ্যে ইচ্ছাকৃত ঋণ ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়ে চলেছে। অর্থ মন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সংসদে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঋণ মকুবের যে তথ্য পেশ করেছেন তাতে কৃষি সঙ্কটে কর্পোরেটের ঋণ মকুবের বৈষম্য প্রকট হয়ে ধরা পড়েছে। দেখা গিয়েছে, কৃষি ক্ষেত্রে যে ঋণ মুকব হয়েছে তার ১০ গুণ ঋণ মকুব হয়েছে বড় বড় কর্পোরেটদের।
মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে কর্পোরেট এবং কৃষি ক্ষেত্রে ঋণ মকুব করা হয়েছে তা নিয়ে লিখিত প্রশ্ন ছিল সংসদে। অর্থ দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরি লিখিত জবাবে ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ সাল— এই ১০ বছরের ঋণ মকুবের তথ্য তুলে ধরেন। দেশের বড় বড় শিল্প, বিশাল তথ্য প্রযুক্তির পরিষেবা শিল্প এবং কৃষি ও সহায়ক ক্ষেত্রে কত পরিমাণ ঋণ মকুব হয়েছে ১০ বছরে তার তথ্য পেশ করেন। তাতে দেখা গিয়েছে, ঋণ মকুবের সিংহভাগ হয়েছে বড় শিল্প এবং বড় প্রযুক্তি পরিষেবা শিল্পে। কৃষি ও সহায়ক ক্ষেত্রে ঋণ মকুবের হার কম।
দেশে কর্পোরেট মুনাফা গত ১০ বছরে বিপুল হারে বেড়েছে। কেন্দ্রীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ১৭ বছরের তুলনায় সর্বাধিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে কর্পোরেট মুনাফা। বর্তমানে কর্পোরেট মুনাফার পরিমাণ বেড়ে হয়েছে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪.৮ শতাংশ। এই মুনাফা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ঋণ মকুবের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। ১০ বছরে বড় বড় কর্পোরেট ঋণ মকুব হয়েছে যথাক্রমে, ১৭,৮৯৭ কোটি টাকা, ৩০,১৮৬ কোটি টাকা, ৫৫,৪৬৮ কোটি টাকা, ৮০,২২৪ কোটি টাকা, ১,২৫,২৩০ কোটি টাকা, ১,২২,৯৪১ কোটি টাকা, ৯৭ ,৩০৪ কোটি টাকা, ৪১,৫৬৬ কোটি টাকা, ৭৩ হাজার ২৭২ কোটি টাকা, ৪২ হাজার ২১০ কোটি টাকা এবং ২৭ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। একই সময়ে বড় প্রযুক্তি পরিষেবা শিল্পে ঋণ মকুব হয়েছে যথাক্রমে ১৩,৮৩৬ কোটি টাকা, ১০,২২৯ কোটি টাকা, ১২,৮৪০ কোটি টাকা, ১৮,৯০৮ কোটি টাকা, ২৩ ৪৩৩ কোটি টাকা, ৩৬,১৯৯ কোটি টাকা, ২৯,৭৪৬ কোটি টাকা, ২৭, ৯৬৬কোটি টাকা, ৪১,২৫৫ কোটি টাকা, ২৬,১৫৭ কোটি টাকা এবং ২০,৩৮৪ কোটি টাকা। বড় কর্পোরেট শিল্প ও কর্পোরেট পরিষেবা শিল্পে মোট ঋণ মকুবের পরিমাণ ১০ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে।
এদিকে, মুনাফায় ফুলে ফেঁপে ওঠা কর্পোরেটের বিপরীত চিত্র কৃষি ক্ষেত্রে। কৃষকের ফসলের দাম মেলে না। ঋণে জর্জরিত কৃষকরা। অনেক কৃষক ঋণে মেটাতে না পেরে আত্মঘাতী হচ্ছেন। আবার কৃষকদের ব্যাঙ্কের প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ মেলে কম। তবে যেটুকু ঋণ মেলে তাতে ব্যাঙ্কের ঋণ মকুবের হার অনেক কম। একই সময়ে কৃষি ও সহায়ক ক্ষেত্রে ঋণ মকুব হয়েছে যথাক্রমে ৩,৪৩০ কোটি টাকা, ৬,৮৪৫ কোটি টাকা, ৬,৪৮৮ কোটি টাকা, ১০, ৪৭৭ কোটি টাকা, ১২, ৯৬৯ কোটি টাকা, ১৪,৪৬৪ কোটি টাকা, ১৫, ২২২ কোটি টাকা, ২৩,৮৫৩ কোটি টাকা, ২৪,৪২৬ কোটি টাকা এবং ২২, ৮৮২ কোটি টাকা। কৃষি ঋণমকুবের পরিমাণ ১০ বছরে ১.৬০ লক্ষ কোটি টাকার উপরে। এতে দেখা গিয়েছে, কর্পোরেটের কৃষি ঋণ মকুবের থেকে প্রায় ১০ গুণ বেশি পরিমাণ ঋণ মকুব হয়েছে।
এদিকে, কর্পোরেটের যেমন ঋণ মকুব হয়েছে বেশি, অন্যদিকে কর্পোরেটে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সংখ্যাও বেশি। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, ২৫ লক্ষ টাকার উপর যাদের অনাদায়ী ঋণ এবং সেই ঋণ শোধের যথেষ্ট আর্থিক ক্ষমতা আছে তারা সময় মতো ঋণ শোধ না করলে তাদের ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি বলে ঘোষণা করা হয়। এই ঋণখেলাপির বেশিরভাগ হলো বড় কর্পোরেট। তাদের একটা বড় অংশ ঋণ লোপাট করে বিদেশে সরে পড়েছে। এই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিদেশে সরে পড়ার সংখ্যা মোদী জমানায় বেড়ে গিয়েছে। অর্থ মন্ত্রক সুত্রে জানা গিয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৬ এই ৬ বছরে ৫২ হাজার ৫৯২ জন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিদেশে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণে তাঁদের পাসপোর্ট আটক করা হয়েছে।
এদিকে কর্পোরেটে যথেষ্ট আর্থিক ক্ষমতা থাকলেও তাদের মধ্যে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়ে চলেছে। অর্থ মন্ত্রী তার পেশ করা তথ্য জানাচ্ছে, ২০২১ সালে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৩০০-র উপর। তা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ১৫ হাজারের বেশি। ২০২৬ সালে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির টাকার অঙ্কের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লক্ষ কোটি টাকার উপর। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সূত্রে জানা গিয়েছে, ১০ বড় কর্পোরেট ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির ঋণের পরিমাণ হলো ৪০ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা। ৫০টি বড় কর্পোরেটের ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির টাকার অঙ্কের ৮৭ হাজার ২০৫ কোটি টাকা।
দেশে অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে পাঁচ রাজ্য। তার মধ্যে রয়েছে মহারাষ্ট্র,পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট, তামিলনাড়ু এবং দিল্লি। মোট ইচ্ছাকৃত অনাদায়ী ঋণের ৭০ শতাংশ রয়েছে পাঁচ রাজ্যে।
Farmers
কৃষি ঋণ মকুব সামান্যই, দেদার ছাড় কর্পোরেটদের বাড়ছে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি
×
Comments :0