বিজেপি’র সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গড়ার পর এবার উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের অনুশাসনের গেঁড়োতেই পড়লেন নীতীশ কুমার। বিহারে প্রকাশ্যে মাংস, মাছ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। এই নিয়ম চালু হয়ে গেলে একমাত্র লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকানিরাই মাছ, মাংস বিক্রি করতে পারবেন। মঙ্গলবার রাজ্যের উপ মুখ্যমন্ত্রী বিজয় কুমার সিনহা একথা ঘোষণা করেছেন। অনেকেই মনে করছেন, বিহারের মতো রাজ্যে এই নিয়ম কার্যকর করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে নীতীশ কুমার সরকারের কাছে। কারণ বিহারে জনসংখ্যার বড় অংশই মাংস ও মাছ খায়। আবার অনেকেই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাঁরা বছরভর রাস্তার ধারে, হাটে, গ্রামের বাজারে মাংস ও মাছ বিক্রি করে আসছেন।
এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সুদূরপ্রসারী আন্দাজ করেই নিষেধাজ্ঞার কথা ঘোষণার সময় এদিন উপ মুখ্যমন্ত্রী সিনহা জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করেন যে, এই নিয়ম কোনও বিশেষ সম্প্রদায় বা খাদ্যাভ্যাসের বিরুদ্ধে নয়। তিনি দাবি করেন, ‘সরকার মাছ, মাংস খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে না। শুধুমাত্র অস্বচ্ছতা এবং খোলা জায়গায় বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চাইছে।’ নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে সওয়াল করতে গিয়ে সিনহা এও বলেন, ‘খোলা জায়গায় বিক্রির কারণে যত্রতত্র ময়লা পড়ে থাকে, দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং এর ফলে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এজন্যই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই কারণেই একমাত্র যাঁদের লাইসেন্স আছে তাঁরাই বাজার বা সরকার নির্দিষ্ট জায়গায় মাছ, মাংস বিক্রি করতে পারবেন। যাঁদের লাইসেন্স নেই তাঁদের এখন থেকে বিক্রি করতে হলে লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হবে।’ অবশ্য এই ব্যবস্থা শীঘ্রই চালু করা হবে বলে জানালেও নির্দিষ্টভাবে দিনক্ষণ জানাতে পারেননি উপ মুখ্যমন্ত্রী।
উল্লেখ করা যেতে পারে, আগে বিহারে মদ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল নীতীশ কুমার সরকার। এবার মাছ, মাংস বিক্রিতেও শেকল পরাতে চলেছে সরকার।
এই নিয়মের বেড়াজালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ছোট দোকানদার এবং যাঁরা ঠেলায় করে মাছ-মাংস বিক্রি করেন, তাঁরা। অনেক বিক্রেতা মনে করছেন, তাঁদের দৈনিক জীবিকা নির্ভর করে মাছ কিংবা মাংস বিক্রির ওপর। হঠাৎ করে নিষেধাজ্ঞা এবং কঠোর নিয়ম চালু হয়ে গেলে তাঁদের সমস্যা হতে পারে। এমনকি সরকারি লাল সুতোর খপ্পরে পড়ে এই লাইসেন্স প্রক্রিয়া যে সহজ হবে না, সেই আশঙ্কাও করছেন দোকানদাররা। তাই তাঁরা লাইসেন্সের প্রক্রিয়া সহজ হওয়া উচিত বলে দাবি করেছেন। সেই সঙ্গে নিয়ম মানার জন্য তাঁদের সময় দেওয়া উচিত বলেও জানিয়েছেন।
জনমানসেও এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। শহরবাসীর একাংশ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছে। এর কারণ, তাঁরা মনে করছেন এর ফলে শহর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকবে, দুর্গন্ধ ছড়াবে কম। আবার রাজনৈতিক মহলে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়ে গিয়েছে। কোনোরকম আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা অনচিত হয়েছে বলে তাঁদের অভিমত। বিরোধী নেতারা বলছেন, আগে বিকল্প বাজার বা দোকান তৈরি করেই নিয়ম চালু করা যুক্তিযুক্ত হতো। তাঁরা অভিযোগ করেছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে গরিব এবং ছোট দোকানদারদের জীবিকার ওপর গুরুতর প্রভাব পড়বে।
বিরোধী নেতারা এর সঙ্গে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বিষয়কে জুড়ে দিয়ে অভিযোগ করেছেন, মানুষের খাদ্যাভ্যাাসের ওপর হস্তক্ষেপ করা হলো। বিজেপি শাসিত অন্যান্য রাজ্যে যেমন উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা নিরামিষ খাবার চালু জন্য উঠে পড়ে লেগেছে, তেমন বিহারও সেই পথে হাঁটতে চলেছে। বিহারে বিশাল সংখ্যক মানুষ মাছ-মাংস খান। তাঁরা খোলা বাজার থেকেই কিনে থাকেন। হঠাৎ করে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিলে সমস্যায় পড়বেন তাঁরা। একারণেই বিরোধীরা এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলে দাবি করেছেন। এমনকি লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করার কথাও বলেছেন বিরোধী নেতারা।
প্রসঙ্গত, গত মার্চ মাসে উত্তর প্রদেশে ধর্মীয় স্থানের ৫০০ মিটারের মধ্যে মাংস বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই ব্যাপারে সমস্ত জেলাশাসককে কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় যোগী আদিত্যনাথ সরকার।
Bihar
বিহারে এবার বন্ধ প্রকাশ্যে মাছ-মাংস বিক্রি
ফাইল ছবি
×
Comments :0