Editorial

ডাবল ডাবল চাকরির পর বেকার ভাতা

সম্পাদকীয় বিভাগ

২০২১ সালে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ডাবল ডাবল চাকরি দেবার কথা ঘোষণা করেছিলেন। পাঁচ বছর পর আর একটি বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে সাড়ম্বরে ও সোচ্চারে ঘোষণা করা হলো বেকার ভাতা চালু করার প্রকল্প। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী গত পাঁচ বছর ধরে রাজ্যের ছেলে-মেয়েরা একটার বদলে দু’টো করে চাকরি পাবার কথা। তার আগে দশ বছর ধরে এত চাকরি দেওয়া হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন যে তাতে রাজ্যে কোনও বেকারই থাকার কথা নয়। বেকারই য‍‌দি না থাকে তাহলে মুখ্যমন্ত্রী বছর বছর যে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি কর্মসংস্থান তৈরি করছেন সেখানে কাজ করবে কে? সম্ভবত সেজন্যই তিনি ডাবল ডাবল চাকরির প্রকল্প ঘোষণা করেছিলেন। যারা চাকরি করছেন তাদের আরও একটি চাকরি দেওয়া হবে এমনটাই বোধ হয় মুখ্যমন্ত্রী ভেবেছিলেন। গত পাঁচ বছরে রাজ্যে কতজন ডাবল চাকরি পেয়েছে সেই তথ্য অবশ্য সরকার জানায়নি। তবে সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন তিনি নাকি আড়াই কোটি চাকরি দিয়েছেন। ১৫ বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে যত চাকরি দেবার কথা বলেছেন সেগুলি যোগ করলে রাজ্যের জনসংখ্যার দ্বিগুণ হয়ে যাবে। মুখ্যমন্ত্রী চাকরি দেবার যে দাবি করে থাকেন সে সংক্রান্ত তথ্য সম্ভবত সরকারি খাতায় থাকে না, থাকে মুখ্যমন্ত্রীর মগজে। তাই মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত বা দাবি করা চাকরিগুলি কে বা কারা কোথায় পেয়েছে তার তালিকা ১৫ বছরেও তৈরি করা সম্ভব হয়নি; কোনোদিন হবেও না। কারণ সরকার চাকরি দিলে তো তার হিসাব সরকারের কাছে থাকবে।
পাঁচ বছর ধরে ডাবল ডাবল চাকরি দেবার পর বেকার ভাতা দেবার ঘোষণা থেকে মুখ্যমন্ত্রীর চাকরি দেবার ভাঁওতাবাজি জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। এবারের রাজ্য বাজেটে (২০২৬-২৭) বেকার ভাতা প্রকল্প ঘোষিত হয়েছে। বলা হয়েছে আগামী ১৫ আগস্ট থেকে ২১ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত মাধ্যমিক উত্তীর্ণদের মধ্যে যারা বেকার তাদের মাসে ১৫০০ টাকা করে পাঁচ বছর পর্যন্ত চাকরি না পেলে ভাতা দেওয়া হবে। এর পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে ‘যুবসাথী’। এরজন্য বরাদ্দ হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। দু’দিন যেতে না যেতেই মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন আগস্ট নয় মার্চ মাস থেকেই ভাতা চালু হয়ে যাবে। ভোট বড় বালাই। ২০২১ সালে ভোটের বাজি ছিল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। যোগ্য-অযোগ্য, প্রয়োজন-অপ্রয়োজন, সামর্থ্য-অসামর্থ্য বিবেচনা না করে সব মহিলাদের ঢালাও মাসে এক হাজার টাকা দেবার ব্যবস্থা হয়। পাঁচ বছর পর সেটা বাড়িয়ে দেড় হাজার টাকা করা হয় এবার। কিন্তু তাতেও ভোটাতঙ্ক কাটার নয়। অতএব নতুন প্রকল্প বেকার ভাতা। যথারীতি মাসে দেড় হাজার টাকা করে। মজার বিষয় হচ্ছে যারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যা শ্রী, যুবশ্রীর টাকা পাচ্ছেন তারা বেকার হলেও যুব সাথীর টাকা পাবেন না। লক্ষ্য ঐ সব প্রকল্পের বাইরে যারা থেকে গেছে তাদের ভাতা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা।
চাকরির পর চাকরি, ডাবল ডাবল চাকরির পরও এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে ৪২ লক্ষ বেকার নাম লিখে বসে আছে। ধরা যাক এদের জন্যই বেকার ভাতা। কিন্তু যে টাকা বরাদ্দ হয়েছে তাতে বড় জোর ২৮ লক্ষ বেকারকে ভাতা দেওয়া যাবে। বাকিদের তাহলে কি হবে। তারা বঞ্চিত হবেন কেন? কে বেকার কে বেকার নয় সেটাও ধোঁয়া‌য় ঢাকা। আবেদনের সময় বেকারত্বের কোনও প্রমাণ দাখিল করতে হবে না। আবেদনকারী নিজের ঘোষণাই যথেষ্ট। ফলে নানা কাজে পেশায়, স্বনির্ভর কাজে যুক্তরা বেকার হিসাবে ভাতা নিতে পারে না। অসংগঠিত বা প্রথা বহির্ভূত কাজে পর্যাপ্ত রোজগার থাকলেও ভাতা পেতে বাধা নেই।

Comments :0

Login to leave a comment