Yuva Sathi

মায়ের শ্রম চুরি হয়ে যায় প্রতিদিন ভাতার লাইনে এমএ পাশ ছেলে

রাজ্য জেলা

ফাইল ছবি

জয়ন্ত সাহা : মাথাভাঙা 
যুবসাথী ভাতার টাকা পেতে গোসাইয়ের হাটের সরকারি ক্যাম্পে তৃতীয় দিনের লাইনে দাঁড়িয়েছেন ভাবেরহাটের বাসিন্দা স্নাতকোত্তর অনাথ দাস। অদূরেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন তাঁর অসুস্থ মা যূথিকা দাস। ছেলে মা’কে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাবে বলে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু লম্বা লাইনের অনেক পেছনে দাঁড়িয়ে অনাথ। ফরম জমা হয়নি তাঁর, মায়েরও আর হাসপাতালে যাওয়া হয়নি। 
বাড়ি ফিরে যাবার আগে জিজ্ঞেস করতেই হতাশার সুরে বললেন, ‘‘সারাদিনে ১ হাজার বিড়ি বেঁধে পাই ১৩০ টাকা। ইউনিয়ন বলেছিল, আমাদের পাওয়ার কথা ২০০ টাকা। কিন্তু এজেন্ট ১৩০ টাকার বেশি দেয় না। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের দেড় হাজার টাকা মাসে পাই। সে টাকায় সংসার চলে নাকি! বাজারে তেল, নুন, ডালের দাম কত বেড়েছে। ছেলেটা চাকরির ফরম ফিলআপ করতে গেলে প্রায় হাজার টাকা লাগে। টিউশনি করে ও সেসব কোনমতে সামলায়। কিন্তু আমাদের শ্রম চুরি যায় প্রতিদিন। কেউ আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না।’’
ভাবেরহাটের যূথিকা দাসকে চেনেন না মাথাভাঙার নেতাজী পাড়ার সরস্বতী দাস কিংবা ছাট-খাটেরবাড়ির প্রতিমা বর্মণ। কিন্তু বিড়ির লাল সুতোর ফাঁসে ওঁদের শ্রমও চুরি যায় মালিক আর এজেন্টদের কারসাজিতে। তবুও নির্বিকার সরকারের শ্রম দপ্তর। আসলে যূথিকা দাস, সরস্বতী দাস, প্রতিমা বর্মণেরা তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতায় বুঝেছেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কিংবা ছেলে মেয়েদের জন্য যুবসাথীর ভাতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে শ্রম দিয়ে শ্রমের পারিশ্রমিক না পাওয়ার ক্ষোভ।
বিড়ি শ্রমিকদের মতোই লক্ষ্মীর ভাণ্ডর প্রাপক খেতমজুর মিনতি বর্মণ, সুনীতি বর্মণ, আরতি রায়েরাও ক্ষোভে ফুঁসছেন শ্রমের ন্যায্য মজুরি না পেয়ে। কোচবিহারের পুরুষ শ্রমিকেরা জমিতে কাজ করে পান ৪৫০-৫০০ টাকা। অথচ মহিলা শ্রমিকদের সারা দিন অন্যের জমিতে কাজ করে মেলে মাত্র ২৫০-৩০০ টাকা। শ্রম দপ্তরের আধিকারিকেরা নাকি জানেনই না জেলার মহিলা শ্রমিকদের শ্রমের বিনিময়ে পুরুষদের অর্ধেক টাকা দেওয়া হয়!  
ক্ষোভ শুধু বিড়ি শ্রমিক কিংবা মহিলা খেতমজুরদের নয়, প্রতিদিন শ্রম চুরি যাচ্ছে জেলার তুফানগঞ্জ, দিনহাটার অতসী পাল, সুভদ্রা পাল, সন্ধ্যা রায়দের মতো মহিলা তাঁত শ্রমিকদেরও। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রসঙ্গ তুলতেই অতসী পাল, সুভদ্রা পালদের গলায় যেন রাগ ক্ষোভ ঠিকরে বের হলো। ওঁদের কথায়, ‘‘অটো, টোটো, বাস ভাড়া সবই তো বেড়েছে। খাবারের দাম গ্যাসের দাম ডাবল হয়েছে। অথচ সারাদিন তাঁতের কাজ করে হাতে মেলে মাত্র ২৫০-৩০০ টাকা! তাও সব দিন কাজ মেলার গ্যারান্টি নেই।"
অতসী পাল আরও এক কদম এগিয়ে বলেন, কি হবে ভাণ্ডারের টাকা পেয়ে! মজুরি বাড়িয়ে দিক। আমাদের দরকারের জিনিসের দাম কমিয়ে দিক সরকার। ভাতার টাকায় কখনো সংসারের উন্নতি হয় নাকি! আসলে একদিকে বাজারে জিনিসের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে শ্রম দপ্তরের আইনি শিথিলতায় অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের মজুরি চুরি যাচ্ছে। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলার শ্রম দপ্তরের এক আধিকারিকের বক্তব্য, সরকার তো প্রতি ছ’মাস অন্তর অন্তত ৮০ টি পেশার ন্যূনতম মজুরির তালিকা প্রকাশ করে। অথচ শুধু কোচবিহার জেলা নয়, রাজ্যের সব জেলাতে কোন পেশাতে কতজন কাজ করেন, তাঁরা কে কত মজুরি পান, তার কোনও তথ্যই তো নেই শ্রম দপ্তরের কাছে।
ওই আধিকারিকের কথাতেই স্পষ্ট, শ্রম চুরি যায় প্রতিদিন। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো ভাতা দিয়ে সংসারের হেঁসেল খুলে রাখাই দায় হয়ে পড়েছে গ্রামে গ্রামে। বিড়ি শ্রমিক থেকে খেতমজুর কিংবা তাঁত চালানো মহিলারা সবটা বুঝে গেছেন। তাই দক্ষ হাতে তাঁত চালানো গৃহবধূ সন্ধ্যা রায় অনায়াসে বলেন, ‘‘দু’বছর আগে প্রথম যখন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভাতা পেলাম তখন খুশিই হয়েছিলাম। এখন বুঝছি ওটা ভিক্ষে ছাড়া কিছু নয়। আমাদের ন্যায্য মজুরি দিলে ওই ভাতার দরকার নেই। শ্রম দপ্তরের অফিসারদের সাথে মজুরি নিয়ে কথা বলতে গেলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। ভাতা পাই ভাতা নিই- সরকারের দেওয়া হকের জিনিস ছাড়বো কেন? তবে চাই সরকার শ্রমের দাম দিক। নইলে এই সরকারকে নিজের সরকার বলে ভাবতে পারছি না।

 

Comments :0

Login to leave a comment