বইকথা
নতুনপাতা
---------------------------------------------
আমার দৃষ্টিতে "বাদশাহ নামদার"
---------------------------------------------
ঋষিরাজ দাস
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বর্ষ ৩
বইটি বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখা। অনেকেরই হয়তো ইতিহাস পড়তে গেলে মাথা গুলিয়ে যায়, ভালো লাগেনা, কিন্তু এই বইটিতে একটি অংশের ইতিহাস এত সুন্দর গল্পের মতো করে লেখা আছে, একবার এই বইটি ধরলে আর তাকে ফেলে রাখা যায় না। ইতিহাসের একজন রোমাঞ্চকর জনপ্রিয় চরিত্রকে নিয়ে এই বই। হ্যাঁ ঠিকই এটি দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের জীবনকে নিয়ে লেখা।
আমরা অনেকেই মুঘল সম্রাট হুমায়ুন বলতে কী বুঝি? হ্যাঁ এটা বুঝি যে তিনি হলেন প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর এর ছেলে। আবার অনেকে এইভাবেও মনে রাখেন যে " বাবার হইল আবার জ্বর সারিল ঔষধে" এর "হইল" এর 'হ' মানে হুমায়ুন দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট। কিন্তু যখন আমরা এই বইটা পড়তে আরম্ভ করব তখন কিন্তু আমরা বুঝতে পারবো না আমরা ওই মুখস্থ করবার জন্য মুঘলদের ইতিহাস পড়ছি নাকি ইতিহাসের একজন অন্যতম চর্চিত ব্যক্তির জীবনের কিছু মুহূর্ত জানছি। হ্যাঁ এটা ঠিক যে আওরঙ্গজেবের পর অনেকেই মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা করে থাকেন। হয়তো এই বইটি তারই সহজকথ্য নিদর্শন।
হুমায়ূনের জীবন খুবই বর্ণময় এবং রোমাঞ্চকর। দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির সেই বহুমূল্য কোহিনুর হীরে যখন পিতা বাবর এর হাতে হুমায়ুন তুলে দেন তখন বাবর খুশি হয়ে হুমায়ুনের হাতে ইব্রাহিম লোদীর রাজকোষের সম্পূর্ণ অর্থ তুলে দেন। সত্যিই তো, প্রিয় বড় ছেলে যখন পিতার হাতে তামাম হিন্দুস্তানের সব থেকে বহু মূল্য রত্নটি তুলে দিচ্ছে তখন কোন পিতাই না অখুশি থাকতে পারে? কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না যে এই ঘটনার ২৪ ঘন্টার মধ্যে মুঘল সেনাবাহিনী নিয়ে পুত্র হুমায়ুন দিল্লির কোষাগার দখল করে রাজ কোষের সব অর্থ নিয়ে মুঘলদের কে ফতুর বানিয়ে পালিয়ে গেলেন আফগানিস্তানের বাদাখ্শানের দিকে। বাবর বিচলিত হলেও এক সময় হুমায়ুনকে ক্ষমা করে দেন এবং হুমায়ুন নিজের ভুল স্বীকার করেন। এর কিছু বছর পর হুমায়ুন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে আল্লাহর কাছে দোয়া করে বাবর হুমায়ুনের সমস্ত অসুখ নিজের শরীরে গ্রহণ করেন ও হুমায়ুন সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং এর কিছুদিন পর বাবর দেহত্যাগ করলে হুমায়ুন বসেন মুঘল সিংহাসনে।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রাজা হতে হলে যেরকম মানুষ হতে হয় সেরকম কিন্তু হুমায়ুন ছিলেন না। বইটি পড়লে আমরা অনেকাশেই দেখতে পাবো হুমায়ূন অনেক সময় অনেক অপরাধীকে ক্ষমা করে দিয়েছেন । এমনকি তার দুর্দিনে তার যে সকল আপন ভাইরা তার পাশে দাঁড়ায়নি তাদেরকে কঠোর শাস্তি দিলেও তিনি মৃত্যুদণ্ড দেননি। শের শাহ সুরির মত চালাক আফগান নেতার এতগুলো ফাঁদে পড়ে মুঘল সিংহাসন প্রায় ১৫ বছরের জন্য হুমায়ুন হারিয়ে ফেলেছিলেন ঠিকই যদিও তিনি কিন্তু শের শাহ কে কখনোই প্রথম থেকে শত্রু মনে করেননি। আবার এক ভিস্তিওয়ালা তাঁকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল বলে, তাকে একদিনের জন্য মুঘল সম্রাট হিসেবে মনোনীত করেছিলেন হুমায়ুন।
হুমায়ুনের দুই সন্তানের মধ্যে একজন প্রিয় সন্তান ছিলেন তার কন্যা আকিকা বেগম। এছাড়াও পরবর্তীতে হুমায়ুন তৎকালীন বাংলাতে সতীদাহ প্রথার হাত থেকে একজন হিন্দু বালিকাকে বাঁচিয়ে আনেন ও আকিকার সাথে রেখে দিয়েছিলেন। সেই বালিকাকে তিনি আকিকার মতো খুবই ভালোবাসতেন। আকিকার একজন প্রিয় বান্ধবী হয়ে উঠেছিল সে। কিন্তু শেরশাহের প্রথমবার অতর্কিত আক্রমণে, যখন মুঘল বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে তখন হুমায়ুনের একজন বিশ্বাসভাজন হিন্দু পন্ডিত হরিশংকর আকিকা এবং সেই হিন্দু বালিকা অম্বা কে নিয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু হুমায়ুন হরিশংকরকে এত বিশ্বাস করলেও হুমায়ুন কখনোই জানতেন না যে এই হরিশংকর তার প্রিয় কন্যা আকিকাকে এবং অম্বাকে অম্বার গ্রামের হাতে তুলে দিয়েছিলেন এবং গ্রামের মানুষ ও হরিশংকর আকিকা এবং অম্বাকে সতীদাহ প্রথার মত নির্মম প্রথার মাধ্যমে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছিলেন। যদিও হরিশংকর এর সাজা পেয়েছিলেন আগুনে পোড়ার মধ্য দিয়ে। না, হুমায়ুন তাকে শাস্তি দেন নি, তাকে শাস্তি দিয়েছিল আকিকা আর অম্বা।
হুমায়ুন আর কখনোই জানলেন না তার এই দুই কন্যার কী হলো। যদিও হুমায়ুন একজনকে তার সুখ দুঃখের সময় এবং সব সময় পাশে পেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বৈরাম খাঁ। বৈরাম খাঁ হুমায়ুনের শেষ জীবন পর্যন্ত মুঘল সেনাবাহিনীর সেনাপতিত্ব করেছেন এবং পরবর্তীতে তিনি হুমায়ুনের পুত্র আকবরের অভিভাবক হিসেবেও নিযুক্ত হয়েছিলেন। অনেক সময় হুমায়ুনকে তিনি প্রচুর পরামর্শ দিয়েছেন। হুমায়ুন তাকে ভারতে ফিরে সর্বোচ্চ খান-ই-খানান উপাধি দেন।যদিও এই বইটির পরিশিষ্ট ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাবো হুমায়ুনপুত্র আকবরের বৈরাম খাঁকে মক্কায় যাবার নির্দেশ দিয়ে পথে গুপ্ত ঘাতকের মাধ্যমে তাঁকে হত্যা করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে আকবরের পরিচয় আকবর দ্যা গ্রেট কিন্তু তার কাছ থেকে এরকম আশা করা কিন্তু কখনোই যায় না। এক্ষেত্রে লেখক বলেছেন, "তবে প্রদীপের নিচেই থাকে অন্ধকার।"
যাইহোক, এই বইটি পড়লে অন্তত অনেকের হয়তো ভালো লাগতে পারে। কতটা ভালো লাগবে তা জানি না কিন্তু হয়তো ভালো লাগতেও পারে। কারণ এখানে তো ইতিহাস মুখস্ত করার ব্যাপার নেই, ইতিহাসকে গল্পের মত করে জানার ব্যাপার। তাই সবশেষে লেখক এর ভাষা ধার করে বলতে পারি যে,
"রাজা যায় রাজা আসে। প্রজাও যায়, নতুন প্রজা আসে । কিছুই টিকে থাকে না। ক্ষুধার্ত সময় সবকিছু গিলে ফেলে, তবে 'গল্প' লিখতে পারে না। গল্প থেকে যায়।"
বাদশাহ নামদার
হুমায়ূন আহমেদ
পত্রভারতী
নবম শ্রেণী। কল্যাণনগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগনা, মজুমদার ভিলা, কল্যাণনগর, খড়দহ।
---------------
Comments :0