অন্যকথা
মুক্তধারা
----------------------------
ভ্যালেটাইন ডে
----------------------------
অমল কর
রোমানদের দেবদেবীর মধ্যে রানি জুনো ছিলেন প্রেম-প্রণয়- বিয়ের দেবী। ১৪ ই ফেব্রুয়ারি ছিল দেবী জুনো-র বিয়ের তারিখ।ওই দিনটিকে স্মরণ করে রোমান তরুণ-তরুণীরা প্রায় একপক্ষকাল ধরে "লিউপারকেলিয়া" নামে জাঁকজমক
ও বৈচত্র্যপূর্ণ প্রেমের এক নান্দনিক উৎসব পালন করত। অবিবাহিত তরুণ-তরুণীরা নিজেদের নাম-পরিচিতি লিখে একটি বিশেষ কাচের পাত্রে জমা দিত চিরকুট।এটা একটা চিত্তাকর্ষক ও মজার লটারি।লটারিতে যার হাতে যে নাম ওঠত , তার সান্নিধ্যে উৎসবের দিনগুলোতে মেতে ওঠত। পরস্পরের আকর্ষণ দীর্ঘমেয়াদি হলে,মন দেওয়া-নেওয়া গাঢ় হলে পরের বছর উভয়ে বৈবাহিক সম্বন্ধে আবদ্ধ হত। সম্পর্ক গড়ে তুলতে না-পসন্দ বা গররাজি হলে পরের বছর লিউপারকেলিয়া উৎসবে আবার প্রেমের লটারি চলত।
তৃতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, ২৬৯ খ্রিস্টাব্দে রোমের সাম্রাজ্যে অধিষ্ঠিত হলেন সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস । রাজ্য শাসন, যুদ্ধ ছাড়া মানবিক কোমল প্রবৃত্তির মানুষ তিনি নন। পরস্পর কয়েকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সমূহ পরাজয় ও নাস্তানাবুদ হয়ে তিনি খুব উদবিগ্ন ও চিন্তাকুল হয়ে পড়েন । তাঁর সৈন্যবাহিনীতে পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত কুশলী সেনার খুব অভাব । তাঁর মনে হল, দেশের যুব সমাজ যতটা নারীর প্রতি আসক্ত ও গদগদ , ততটা দেশের প্রতি মাতৃভূমির প্রতি অনুরক্ত নয় বা দেশপ্রেমিক নয়। মাতৃভূমি রক্ষায় তাদের যেন কোনো দায় নেই।তারা খুবই নির্বিকার উদাসীন ।
কোথায় ওড়ে বাজ, কোথায় মরে পায়রা__সেসব খোঁজে তারা নির্লিপ্ত । কিন্তু তারা খুব ফূর্তিবাজ।এদিকে দেশ বিপন্ন। তাই তিনি তরুণদের উপর রাগে কাঁই। তাঁর সব অভিযোগ গিয়ে পড়ল ওই লিউপারকেলিয়া উৎসবের উপর।
এতদিনের ধর্মীয় আচারের প্রতি তাঁর যাবতীয় মূল্যবোধ স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলোকে প্রতিহিংসায় অবদমিত করে বাহুবলে গা-জোয়ারিতে দেশে প্রেম-প্রণয়-মহব্বত কেড়ে নিয়ে সেই উৎসব নিষিদ্ধ করে দিলেন ।
যুদ্ধবিমুখ যুব সমাজকে সংস্কারবিমুখ করতে দেশে বিয়েও নিষিদ্ধ করলেন যুদ্ধবাজ সম্রাট।একলষেঁড়ে একবগ্গা সম্রাট বিয়ের শাস্তি ঘোষণা করলেন 'শিরশ্ছেদ'।
কিন্তু সূর্যের সাতরং মাখা প্রজাপতির পতপত ওড়া থামানো সম্রাটের সাধ্য কি? গোপন রেখে গোপনে গোপনে দিব্যি চলল মানুষের প্রেম-পীরিতি-বিয়ে।
সে সময়,কথিত আছে, ভ্যালেনটাইন নামে অন্তত ৫০ জন মানুষ রোমে ছিলেন। তারমধ্যে,অত্যন্ত আবেগপ্রবণ, সংবেদনশীল, তরুণ -তরুণীর খুব কাছের মানুষ, আগাগোড়ো এক হৃদয়বেত্তা প্রেমিক, এক চার্চের বিশপ ছিলেন ভ্যালেনটাইন।যুবক-যুবতির মানবিক ও শারীরিক আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক যে প্রেম-প্রণয়-বিয়ে এ-বোধ আর উপলব্ধি তাঁর প্রকট ছিল। সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস-এর ঘোষিত নীতির বিরুদ্ধে তিনি ফুঁসে ওঠলেন।
তাঁর কাছে "ভালোবাসা" ছাড়া পৃথিবীতে আর এমন কোনো মহৎ কাজ হতে পারে না।তাঁর গির্জায় সংগোপনে যুবক-যুবতি প্রেমিক-প্রেমিকাদের দরাজ হাতে বিয়ে দিতে শুরু করলেন।
তিনি বিবাহিত দম্পতিদের আশীর্বাদ করতেন লং লিভ লাভ বলে। কথায় বলে দেওয়ালেরও কান আছে।
রাজার চর চারদিকে।চরদের জোড়া জোড়া চোখ । বিদেশের সাথে যুদ্ধে বারবার হেরে গেলে কী হবে,প্রজা শাসনে দোর্দণ্ডপ্রতাপ সম্রাটের সঙ্গে চুনোপুঁটি বিশপের ক্যাটক্যাটানি চলে নাকি!
রাজপেয়াদা ছদ্মবেশে এসে হাতেনাতে ধরে ফেলে বিশপের জারিজুরি। গোপন পথে পালিয়ে বাঁচল বটে বিয়ের পাত্রপাত্রী। কিন্তু সম্রাটের প্রবল রোষের প্রকোপে ভ্যালেনটাইনের হল কারাবাস।
কারাগারের নিঃসীম অন্ধকারের নিঃসঙ্গ জীবনে, কারাগারের অধ্যক্ষের এক অন্ধ মেয়ে ভ্যালেনটাইনের সংস্পর্শে আসে।
সম্রাটের দানবিক আইনজারির কথা এবং ভ্যালেনটাইনের মানবিক ব্যক্তিসত্তার কথা সেই অন্ধ মেয়ের কানে আসে। মেয়েটি অকপটে শতবাহু তুলে বিশপকে সাধুবাদ জানায় এবং প্রচণ্ড সম্রাট-বিরোধী হয়ে ওঠে। ভ্যালেন্টাইনের সুমধুর ব্যবহার,তাঁর আত্মত্যাগ-স্বার্থত্যাগ ও ব্যক্তিত্ব মেয়েটিকে মোহিত ও অভিভূত করে। আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে জীবনে প্রথম প্রেমের পদধ্বনি শুনতে পায় মেয়েটি আর ক্রমেক্রমশ অত্যন্ত আকর্ষণ বোধ করে ।
লিউপারকেলিয়া উৎসব বন্ধ, বিয়ে বন্ধ আর ভ্যালেনটাইনের কারাবাস দেশজুড়ে জনরোষের পদধ্বনি শুনতে পেলেন সম্রাট। প্রবল ঝিকিয়ে ওঠে প্রতিবাদ বেশি জোড়ালো হয়ে আছড়ে পড়ার আগেই তড়িঘড়ি সম্রাট তাই ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনের শিরশ্ছেদের নির্মম নির্দেশ দিলেন। শিরশ্ছেদের আগে ভ্যালেনটাইন তাঁর প্রেমিকের জন্য একটি অসাধারণ প্রেমপত্র লিখে গেছেন__ (এ বিষয়ে ভিন্ন একটি মতানুসারে বলা হয় যে
ভ্যালেনটাইন শুধু একজন প্রেমিক বা বিশপই ছিলেন না __তিনি একজন চিকিৎসকও ছিলেন । অসীম মায়ায় সযত্নে তিনি অন্ধ মেয়েটিকে সুচিকিৎসায় চক্ষুষ্মান করে তোলেন ।)
"ক্লডিয়াসরা কোনোদিনই মানুষের অমল প্রেমের গতিরোধ করতে পারবে না ।
প্রেম পবিত্র, শাশ্বত,অবিনশ্বর এবং প্রেমিকদের সাফল্য অনিবার্য ।কোনো শক্তিই প্রেমকে রুখতে পারবে না। "
স্বাক্ষর করেছেন: 'তোমার ভালোবাসার ভ্যালেনটাইন' বলে।
আগামী সপ্তাহে সমাপ্ত
Comments :0