ভোটার তালিকা থেকে বেমালুম উবে যাওয়া সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যন্ত্রণার প্রতিফলনে মোথাবাড়ির ঘটনাকে বিজেপি যে ভাষায় আক্রমণ করছে কার্যত তার থেকে এক ধাপ এগিয়ে শুক্রবার মমতা ব্যানার্জি মোথাবাড়ির বিক্ষোভকে বেমালুম ‘দাঙ্গার’ সঙ্গে তুলনা করে দিয়েছেন। মোথাবাড়ির ঘটনা নিয়ে উত্তরবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, ‘‘মালদহে দাঙ্গার ঘটনায় মুম্বাই থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল, বিজেপি’র দালাল, ভোট কাটুয়াকে...’’।
মুখ্যমন্ত্রী যাকে ‘মুম্বাই থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল, বিজেপি’র দালাল’ বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সেই আইনজীবী, মোথাবাড়ি কাণ্ডে ধৃত মোফাক্কেরুল ইসলাম বর্তমানে মিম’র নেতা। বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে এদিন ধৃত এই আইনজীবী মোফাক্কেরুল ইসলামকেই দেখা গিয়েছিল বুধবার রাতে কালিয়াচক-২নম্বর বিডিও অফিসের সামনে বিক্ষোভ অবরোধে গাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে ঝাঁঝালো বক্তৃতা দিতে, উত্তেজনাও বাড়ে তারপরে।
কিন্তু কে এই ব্যক্তি? উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারের পোরসা হাটখোলার বাসিন্দা। এক সময়ে রায়গঞ্জ জেলা আদালতে আইনজীবী হিসাবে মামলা লড়তেন, বর্তমানে কলকাতা হাইকোর্ট। হাইকোর্ট পাড়ায় তাঁর নিজের চেম্বারও আছে।
কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী যেটা বলতে ভুলে গেছেন যে, শাসক তৃণমূলের সঙ্গেও বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল এই ব্যক্তির। ২০১৭ সালের ২৩ মে রায়গঞ্জ পৌরসভা ভোটে তৃণমূল প্রার্থীদের জয়ী করার জন্যে পোস্টার পড়েছিল শহরের বিভিন্ন জায়গায়। সেই পোস্টারের ছবিও রায়গঞ্জের মানুষ ভোলেননি। তাতে মমতা ব্যানার্জির মুখের ছবি দিয়ে দিকে দিকে তৃণমূল প্রার্থীদের জয়ী করার আবেদন জানানো হয়েছিল। এবং ব্যানারের নিচে বড় করেই মোফাক্কেরুল ইসলামের ছবি দিয়ে লেখা ছিল- ‘প্রচারে মোফাক্কেরুল ইসলাম, আইনজীবী (কলকাতা হাইকোর্ট)। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে। ধৃতের ফেসবুক দেওয়ালেও সেই পোস্ট রয়েছে। ২০১৭ সালের ২৩ এপ্রিল। রায়গঞ্জ পৌরসভার পাশে মসজিদ পাড়ায় কার বাড়িতে আশ্রয়ে ছিলেন এত তাড়াতাড়ি রায়গঞ্জের মানুষ ভুলে যাননি।
তখন একই ব্যানারে ছবি ছিল মোফাক্কেরুল ইসলাম ও মমতা ব্যানার্জির। এখন মোফাক্কেরুল ইসলাম হয়ে গেছেন ‘মহারাষ্ট্রের লোক’! বর্তমানে এই ব্যক্তির সঙ্গে মিম’র যোগাযোগ রয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল এআইএমআইএম (মিম)’এ যোগ দেন তিনি। সেই নির্বাচনে ইটাহার কেন্দ্র থেকে দলের প্রার্থীও হন। মাত্র সাড়ে আটশোর মতো ভোট পেয়েছিলেন।
মোফাক্কেরুলের পাশাপাশি এই ঘটনায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে তার সঙ্গী এক্রামুল বাগনিকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের এডিজি কে জয়রামন জানিয়েছেন, ‘‘জনগণকে প্ররোচিত করার অভিযোগে আমরা বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে মোফাক্কেরুল ইসলামকে আটক করেছি। আমরা এই ধরনের কোনও কার্যকলাপ বরদাস্ত করব না। এই ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, তা আমরা নিশ্চিতভাবে তদন্ত করে দেখবো। মালদহের এই ঘটনার পর আমরা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের সিএপিএফ নিরাপত্তা দিয়েছি।’’ এডিজি উত্তরবঙ্গ জানান, ১ এপ্রিল মোথাবাড়ির ঘটনায় সব মিলিয়ে ১৯টি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে ৩৩ জন।
ওয়াকফ আন্দোলনের সময় যেভাবে আন্দোলনকারীদের হুমকি দিয়েছিলেন, রাজ্যে আন্দোলন করা যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন সেই সুরেই বিবেচনাধীন ভোটারদের হুঁশিয়ারি দিয়ে গতকালই মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন, ‘‘এটা আমাদের দলের পরিকল্পনা নয়। জাজেদের আটকে রাখার কি দরকার ছিল? যারা এই কাজ করেছে, তাদের একটাকেও যেন ছাড়া না হয়।’’ আতঙ্কিত নাগরিকদের মুখ্যমন্ত্রীর এমন হুঁশিয়ারির পরেই পুলিশ বাড়তি তৎপর হয়। সুজাপুর, মোথাবাড়ির বিস্তীর্ণ প্রান্তে বৃহস্পতিবার রাতভর বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালায় পুলিশ। নির্বিচারে গ্রামের সাধারণ যুবকদের তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জেরার নামে। একাধিক তল্লাট এখন রাতে যুবক-শূন্য হয়ে পড়েছে। এলাকায় পুলিশি তাণ্ডবে ছড়াচ্ছে আতঙ্ক।
অথচ আন্দোলনের নামে, জাতীয় সড়কে অবরোধে শামিল হওয়া বাহরুদ্দিন মোল্লা নামে প্রৌঢ়ার বক্তব্য, ‘‘আমরা কত পুরুষ ধরে এখানে আছি। নাম নেই ভোটার তালিকায়। তাহলে কি ভারতে থাকতে পারবো না আমরা? আশঙ্কিত সবাই। তাই সবাই আন্দোলনে যাতে ভোটার তালিকায় নাম ঢোকে। আর মুখ্যমন্ত্রী বলছে, আমরা দাঙ্গাবাজ! দাঙ্গা হচ্ছে এখানে? তাহলে ওঁর দলের লোকেরা কেন ছিল আমাদের সঙ্গে?’’
বুধবার সকাল থেকে কালিয়াচক-২ বিডিও অফিসের সামনে ১২ নম্বর জাতীয় সড়কে অবস্থান বিক্ষোভে শামিল হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। কালিয়াচক কলেজের অধ্যাপক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষজন, ছাত্ররাও শামিল হয়েছিলেন তাতে। ভর দুপুরে পিচ-গলা রাস্তাতেই খিচুড়ি রান্না করে রাস্তায় বসেই খেয়েছিলেন মানুষ। কোনোরকম উত্তেজনা ছিল না। সন্ধ্যার পরে উত্তেজনা বাড়ে। শাসক তৃণমূলের মদতপুষ্ট বাহিনীকেও তৎপর হতে দেখা যায়। বিডিও অফিসে প্রায় সাত ঘণ্টা আটকে থাকেন সাতজন জুডিশিয়াল অফিসার। পুলিশের লাঠিচার্জ থেকে বিডিও দপ্তরে গাড়িতে মানুষজনের আক্রান্ত হওয়া সব মিলিয়ে সেই উত্তেজনা বাড়ে রাতভর। সেই ঘটনাকেই বেমালুম মমতা ব্যানার্জি মালদহের ‘দাঙ্গা’ বলে দেগে দিয়েছেন। গোটা জেলায় বিবেচনাধীনের সংখ্যা ৮ লক্ষ ২৮ হাজার! মোথাবাড়ি কেন্দ্রে সেই সংখ্যা ৮৮হাজার! রতুয়ায় সেই সংখ্যা ১ লক্ষ ৮ হাজার। ফলে আতঙ্কিত মানুষের স্বাভাবিক ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটছে। এদিনও সুজাপুর, মোথাবাড়ি, ইংরেজবাজারের একাধিক জায়গায় প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে একটাই দাবিতে, ‘আগে ভোটার, তারপর ভোট!’ আর ভোটবাক্সে ফয়দা তুলতে যাকে সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক কৌশলে ব্যবহার করতে চাইছে বিজেপি ও তৃণমূল।
protest of deleted peoples
বাদ-পড়া মানুষের বিক্ষোভকে ‘দাঙ্গা’ বললেন মুখ্যমন্ত্রী
×
Comments :0