ওয়াকফ সংশোধনী বিল নিয়ে খুব একটা স্বস্তিতে নেই নরেন্দ্র মোদী সরকার। বুধবার অনুমোদনের জন্য বুধবার লোকসভায় পেশ করা হবে ওয়াকফ সংশোধনী বিল। বৃহস্পতিবার পেশ হবে রাজ্যসভায়। বিলটি নিয়ে ভোটাভুটির সম্ভবনাও প্রবল। বিলটির অনুমোদন নিয়ে সরকারপক্ষের শঙ্কার মূল কারণ, শরিকদের মতিগতি এখনও ঠাওর করে উঠতে পারছে না বিজেপি। বিশেষ করে সরকারের দুই ‘প্রাণভোমরা’ নীতীশ কুমারের জনতা দল (ইউ) এবং চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলুগু দেশম শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেয়, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে বিলের ভবিষ্যৎ। এই বিল নিয়ে আরেক শরিক চিরাগ পাশোয়ানের দল লোকজনশক্তি পার্টি ইতিমধ্যে বেসুরো গেয়ে রেখেছে। এমনিতেই প্রস্তাবিত বিল নিয়ে ঘোরতর আপত্তি আছে বিরোধীদের। এদিন সন্ধ্যায় ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চ বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, লোকসভায় সমস্ত বিরোধী দল একযোগে ওয়াকফ সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে ভোট দেবে। সম্ভবত একারণেই মঙ্গলবার বিজেপি সংসদীয় দল দলের সমস্ত সাংসদকে বুধবার লোকসভায় হাজির থাকার জন্য হুইপ জারি করেছে। শুধু তাই নয়, হুইপে দলের সমস্ত সাংসদকে সারা দিন লোকসভায় হাজির থাকতে বলা হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে, যে ভাবেই হোক ওয়াকফ সংশোধনী বিল পাশ করিয়ে নিতে মরিয়া মোদী সরকার।
জানা গিয়েছে, বুধবার সংসদে আট ঘণ্টা আলোচনার পর সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরণ রিজিজু এই বিলের জবাবী ভাষণ দেবেন। লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লার নেতৃত্বাধীন কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এদিন। গত বছর বিলটি পেশের সময় সরকার এটিকে সংসদের উভয় কক্ষের যৌথ কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা মূল বিলে কিছু পরিবর্তন অনুমোদন করেছে। এদিকে, কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে বিরোধীরা বিলটি নিয়ে আলোচনার জন্য ১২ঘণ্টা বরাদ্দের দাবি জানায়। তবে সরকারের তরফে সময় কম রাখার উপর জোর দেওয়া হয়। এ নিয়ে ওই বৈঠকে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে তুমুল বাদানুবাদ হয়। শেষে বিরোধী দলের নেতারা সভা থেকে ওয়াকআউট করেন।
পরে রিজিজু সংসদ চত্বরে সংবাদমাধ্যমের কাছে দাবি করেন, ‘‘কয়েকটি দল চার থেকে ছয় ঘণ্টা আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। আর বিরোধীরা ১২ঘণ্টা আলোচনায় অনড় ছিল। অধ্যক্ষ অবশ্য আলোচনার জন্য ৮ ঘণ্টা বরাদ্দ করেছেন এবং পরে সেই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।’’ রিজিজু জানিয়েছেন, ‘‘বুধবার দুপুর ১২টায় লোকসভায় প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলেই তিনি বিলটি আলোচনার জন্য উত্থাপন করবেন।’’ বিরোধীদের কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘‘কয়েকটি দল আলোচনা এড়াতেই নানা ধরনের অজুহাত দেখাচ্ছে।’’ তবে কংগ্রেসের লোকসভার উপদলনেতা গৌরব গগৈ জানান যে, ‘‘তাঁরা বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন কারণ সরকার বিভিন্ন এজেন্ডা বুলডোজার চালিয়ে পাশ করিয়ে নিতে চাইছে। আমরা ভোটার কার্ড-আধার নিয়ে আলোচনার দাবি জানালেও অধ্যক্ষ মানতে চাননি।’’ গগৈয়ের অভিযোগ, ‘‘মোদী সরকারের আমলে বিরোধীদের আলোচনার কোনও পরিসর নেই।’’
তবে শুধু ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চই নয়, মঞ্চের বাইরে থাকা বিরোধী কয়েকটি দলও ওয়াকফ সংশোধনী বিলের বিরোধিতা করবে বলে মনে করা হচ্ছে। তাদেরও অভিযোগ, বিলটি অসাংবিধানিক এবং মুসলিম স্বার্থবিরোধী। বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনও এই বিলের বিরোধিতায় সরব হয়েছে। জানা গিয়েছে, বুধবার ওয়াকফ সংশোধনী বিলের ওপর আলোচনায় অংশ নেবেন ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের সদস্যরা। তাঁরা প্রথমেই বিরোধিতা করে ওয়াকআউট, বিক্ষোভ কিংবা বিশৃঙ্খলা করবেন না। উলটে, বিশদে বিলটির ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরবেন। এমনকি মঞ্চের বাইরে থাকা সমমনস্ক বিরোধী দলগুলিকেও বিলের বিরোধিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে এদিনের সন্ধ্যায় ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠক থেকে। এডিএম’কে ইতিমধ্যেই বলেছে যে, তারা বিলটির বিরুদ্ধে ভোট দেবে। নবীন পট্টনায়েকের বিজেডি এবং চন্দ্রশেখর রাওয়ের ভারত রাষ্ট্র সমিতি এখনও অবস্থান স্পষ্ট না করলেও ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের নেতৃবৃন্দ আশা করছেন যে, ওই দু’টি দল শেষ পর্যন্ত বিলের বিরোধিতার রাস্তাই নেবে। কারণ বিজেডি নেতা সুস্মিত পাত্র এবং ভারত রাষ্ট্র সমিতির নেত্রী কে কবিতা আগেই বিলটি নিয়ে নিজেদের আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন। এরই পাশাপাশি কংগ্রেস এবং আরজেডি আগামী তিন দিন দলের সাংসদদের সভায় উপস্থিত থাকার জন্য হুইপ জারি করেছে।
বিরোধীদের থেকেও বিজেপি’র অস্বস্তির কারণ অবশ্যই শরিকরা। তেলুগু দেশম এবং জনতা দল (ইউ) বিলের বিষয়ে কী অবস্থান নেবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তেলুগু দেশম প্রধান তথা অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু মুসলিমদের পাশে দাঁড়িয়ে ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষার ডাক দিয়েছেন গত সপ্তাহেই। অন্য দিকে, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী তথা জনতা দল (ইউ) সভাপতি নীতীশ কুমারের ঘনিষ্ঠ নেতা তথা সে রাজ্যের বিধান পরিষদের সদস্য গুলাম ঘাউস মঙ্গলবার সরাসরি নতুন ওয়াকফ বিলকে ‘মুসলিম বিরোধী’ বলে চিহ্নিত করে তা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন। এমনকি ওই দলেরই লালন সিং বলেছিলেন যে, আমরা লোকসভাতেই আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করব। যার জেরে কী হবে, তা নিয়েও সংশয় বেড়েছে। সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরণ রিজিজুর দাবি, জোটসঙ্গীদের পাশাপাশি বিরোধী দলের কিছু সাংসদেরও সমর্থন পাবেন তাঁরা।
WAQF BILL
কাঁটা শরিকরাই, ওয়াকফ বিল নিয়ে স্বস্তিতে নেই মোদী-শাহরা

×
Comments :0