Post editorial

বাঘের দেশের মানুষ আসবে ব্রিগেডে

উত্তর সম্পাদকীয়​ ব্রিগেড

নিরাপদ সরদার   


বাঘের দেশ বলতে আমরা বুঝি সুন্দর বন। সুন্দর বনের ৫২টি দ্বীপাঞ্চল। যেখানে জনবসতি গড়ে উঠেছে। রাজ্যের দক্ষিণ পূর্ব সীমান্ত বরাবর বাংলাদেশ ঘেঁষা কয়েকটি ব্লক। এখানে প্রায় ৫০ লাখের বেশি লোকের বাস। নদী নালায় ঘেরা দ্বীপগুলোতে বাস করে কৃষক, খেতমজুর ও গ্রামীণ শ্রমজীবী অংশের মানুষ। এদের মধ্যে তফসিল জাতি, তফসিল উপজাতি ও সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যায় বেশি। চাষবাস  মাছ কাঁকড়া ও সুন্দর বনের মধু আহরণ এদের জীবিকা। একটা সময় ছিটে কড়া (গরান কাঠ) , জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ জীবিকার অংশ ছিল। এই সব করতে গিয়ে অনেককেই বাঘের মুখে পড়তে হয়েছে। কেউ ফিরেছে,কেউ ফেরেনি। যে ফিরে এলো তাঁর স্ত্রী হাতে শাঁখা নোয়া পরলো। যে ফিরলো না তার স্ত্রীর শাঁখা নোয়া আর পরা হলো না। আসলে খাদ্য সংগ্রহের জন্য বাড়ির পুরুষ মানুষ যখন জঙ্গলে যায়, তখন বাড়ির মহিলারা হাতের শাঁখা নোয়া খুলে রাখে। বাঘের হাত থেকে রক্ষা পেতে বাড়ির মহিলারা বনদেবী বা  বনচণ্ডীর পূজা করে। বনদেবীর উপর আত্মবিশ্বাস সুন্দর বনের মাছ কাঁকড়া,কাঠ ও মধু সংগ্রহকারী পরিবারের কাছে পুরানো সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করছে। এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছে এই অংশের মানুষ।
১৯৭৭ সালের পর বাম আমলে বেশ কিছু পরিবর্তন এল, ওদের মুখে হাসি ফুটলো। সরকারের বেশ কিছু জনমুখী পরিকল্পনা ওদের জীবন পালটে দিলো। কিছু আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করতে শিখলো। বন বিভাগের উদ্যোগে নির্দিষ্ট সময় যথাস্থানে খাবার দেওয়া হয়, ফলে বাঘের আক্রমণ কমলো।
বন ও নদী কে অবলম্বন করে গড়ে উঠলো পর্যটন কেন্দ্র। চালু হলো যন্ত্র চালিত ভুটভুটি। পঞ্চায়েতের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ইনকামের পাকা বন্দোবস্ত হয়ে গেল কিছু মানুষের। পঞ্চায়েত ব্যবস্থা হয়ে উঠলো মানুষের প্রাণকেন্দ্র, উন্নয়নের জাদুকাঠি। পঞ্চায়েতে গ্রাম উন্নয়নের বহুমুখী কর্মসূচি,নদী বাঁধ নির্মাণ,গাছ লাগানো,বাদাবন গড়ে তুলতে উদ্যোগ,খাল খনন, পুকুর খনন, নোনা মাটিতে নানারকম চাষের এক্সপেরিমেন্ট। নদী পারাপারের জন্য জেটি ঘাট তৈরি, মাটির রাস্তা, ইটের রাস্তা, শহরের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে নদীর উপর অসংখ্য সেতু নির্মাণ। ঝড়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য দ্বীপে দ্বীপে সাইক্লোন শেল্টার। প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিদ্যালয়, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, মজুরি আন্দোলন, বর্গা পাট্টার উল্লেখযোগ্য আন্দোলন, সব কিছু যেন সুন্দর বনের মানুষকে আধুনিক করে তুললো। প্রায় ভূমিহীন মানুষগুলো বাসের জন্য এক চিলতে করে জমি পেল। ঘরের পান্তা খেয়ে ছেলে মেয়েরা লেখা পড়া শিখল, চাকরি পেলো,বাম আমলের চৌত্রিশটা বছর যেন ওদের জীবন,সমাজ,সভ্যতা বদলে দিলো। নতুন করে বাঁচতে শিখল। বারে বারে প্রকৃতির খামখেয়ালিতে আক্রান্ত হয়েছে সুন্দর বন কিন্তু বারে বারে ঘুরেও দাঁড়িয়েছে। সভ্যতাকে রক্ষা করেছে বিঞ্জান মনস্ক শ্রমজীবী মানুষের জোট। আয়লার মতো ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে,মাইল কে  মাইল বনাঞ্চল, ৭৫০ কিলোমিটার নদী বাঁধ ধ্বংস হয়ে যায়। হাজার হাজার ঘরবাড়ি ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কয়েক হাজার মানুষ,গবাদি পশুর মৃত্যু  দেশের মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক ছড়িয়ে ছিল। মানুষের মনোবল, তাদের শ্রম, ঐক্যবদ্ধতা, সুন্দর বনের দ্বীপগুলোকে হারিয়ে যেতে দেয়নি। নদী বাঁধ হয়েছে, বনাঞ্চল হয়েছে, দ্বীপগুলো ভেসে যায়নি। আবার নতুন করে জেগে উঠেছে।
মানুষ সব সময় উন্নত বিকল্পের অনুসন্ধান করে। বাম বিকল্পের অনুসন্ধান করতে গিয়ে  তৃণমূল নামক একটি একনায়কতন্ত্র অতি অহঙ্কারী প্রতিক্রিয়াশীল দলকে ক্ষমতায় নিয়ে এল।
২০১১ সালের পর পরিস্থিতি পালটে যেতে লাগলো।
জনজীবনে নেমে এল সন্ত্রাস ও অত্যাচার। কেড়ে নেওয়া হলো মানুষের আর্জিত অধিকার, ভোটাধিকার।
পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া হলো,আনা হলো দুয়ারে সরকার। ফলত গ্রাম সভা ও, সংসদ সভার গুরুত্বই রইলো না। উন্নয়নের কাজে মানুষের অংশগ্রহণ রইলো না, বিচ্ছিন্নতা বাড়লো। এভাবে মানুষের আর্জিত অধিকার ধীরে ধীরে খর্ব হতে থাকে। পাট্টা জমি বেদখল হয়ে যায়, বর্গা জমিতে চাষিরা চাষ করতে পারে না। মহিলাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য অসংখ্য মহিলা স্বনির্ভর দল ছিল। স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে নানা ধরনের ক্ষুদ্র গ্রামীণ কুটির শিল্প গড়ে উঠেছিল। এরা গ্রাম উন্নয়নের বহুমুখী কর্মসূচি রূপায়ণে সাহায্য করত। এক লহমায় সব কোথায় যেন হারিয়ে গেল। লক্ষ্মী ভাণ্ডার দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফল করতে চায় শাসক দল। মহিলাদের সৃজনশীলতা, উন্নত চিন্তার বিকাশ মান ধারাকে আটকানোর চেষ্টা। শাসক দল ডাকলেই যেতে হবে।
মিটিং মিছিলে যেতেই হবে। না গেলে অসম্মান করা হয়, অপমান করা হয়,ভয়, ভীতি, জুলুম সব কিছুর স্বীকার হতে হয়। লক্ষ্মী ভাণ্ডারের নামে এভাবে মহিলাদের ব্যবহার করা হয়।
লুট ও দুর্নীতির কারণে বন্ধ হলো ১০০ দিনের কাজ। যা ছিল কৃষিতে একমাত্র বিকল্প। কাজের সঙ্কটে বাড়লো দারিদ্রতা।
কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে, পরিযায়ী শ্রমিকের তালিকায় নাম, জীবন যুদ্ধ শুরু নতুন ঠিকানায়। নারী নির্যাতন, খুন ধর্ষণ পুরুষ শূন্য গ্রামে নারী নিরাপত্তার অভাব। এ সব যেন অভিশাপের মতো নেমে এল। বাম আমলে গায়ে গতরে খেটে গ্রামে গ্রামে শিক্ষাকে হাতিয়ার করতে গড়ে তুলেছিল স্কুল। সে স্কুল আর খোলে না, ছেলে মেয়েরা আসে না, মিড ডে মিল রান্না বন্ধ। মাস্টাররা অন্য কোথাও চলে গেছে। পাড়ার বাচ্চাদের পড়া লেখা বন্ধ। বীরেন সরদার, নকুল মুণ্ডা,শঙ্কর মুণ্ডারা বৌ বাচ্চা নিয়ে ভিন রাজ্যে নতুন ঠিকানায় জীবন শুরু করে। যেখানে  শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের সুযোগ নেই। গতর লুটের কারখানায় বন্দি কারাগারে নুতন করে বাঁচার চেষ্টা। এ এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা বাঘের দেশের মানুষের। যারা বাঘ, কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচে, তাদেরকে এখন শাসকের অত্যাচার,শাসন,শোষণ, বিচ্ছিন্নতা, সাম্প্রদায়িকতা ও বিভাজনের বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঁচতে হচ্ছে।
অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে মুখ খোলার উপায় নেই।
এত কিছুর পরেও দেখা গেল সন্দেশখালির ঘটনা দেশের মানুষের নজর কেড়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে দেখা গেছে গাঁয়ের গরিব কৃষক খেতমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষকে। মন খুলে এলাকার প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরেছেন। লুট, সন্ত্রাস, জুলুম, বর্গা জমি, পাট্টা জমি, আদিবাসীদের জমি,একশো দিনের কাজের টাকা লুট, ঘরের টাকা লুট, এমনকি বৃদ্ধ ভাতাতেও থাবা বসিয়েছে  তৃণমূলের নেতা কর্মীরা। এই সব কথা সাহসের সঙ্গে মিডিয়ার সামনে বলেছেন মা বোনেরা।
সুন্দরবনের সন্দেশ খালির ঘটনা শিক্ষা দেয়—  গরিব শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে বিপ্লবী চেতনাকে বেশি দিন আটকে রাখা যায় না।
পাড়ায় পাড়ায় আলোচনা শুরু হয়েছে। চলছে কলের ঘাটে, পুকুর ঘাটে আলাপ আলোচনা। রাস্তাঘাটে, হাটে বাজারে, দিনে রাতে খাবার সময় রান্না ঘরে আলোচনা, তর্ক বিতর্ক চলছে জোর কদমে।
বিজেপি ও তৃনণল কংগ্রেসের কাজকর্ম নিয়ে চর্চা চলছে গরিবদের মধ্যে। আর্জিত অধিকার কিভাবে মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়, এ ধারণা মানুষের ছিল না। এখন তারা বুঝতে পারছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, খাদ্য, কাজ, নারী সুরক্ষার অধিকার সব হারিয়ে গেল। এখন রাজনীতি মানে—  ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করে মানুষের মধ্যে ভাগ করা। এখন রাজনীতি মানে—  যত পারো চুরি করো, কোটি কোটি টাকা কামাও। ভয় দেখিয়ে মানুষ কে দাস করে রাখো। এই সব বিষয়ে মানুষ নিজের মতো ভাবছে, আলোচনা করছে। মূল্যায়ন করছে। দেশ ও রাজ্য জুড়ে সরকার বিরোধী গণআন্দোলনগুলো তার উদাহরণ। রাজ্যের আর জি করের ঘটনা, ছাত্রদের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা মন্ত্রীর গাড়ি ছাত্র চাপা দেওয়ার ঘটনায় মানুষের আন্দোলন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি-কে কাজ করার সুযোগ করে দেয়। ২০১৪ সালে বামপন্থীদের আটকাতে বিজেপি-কে রাজ্য রাজনীতিতে পাকা বন্দোবস্ত করে দিল মমতা ব্যানার্জি। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার নামে আরএসএস সুন্দর বনের দ্বীপগুলোতে, আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে শিক্ষা সংস্কৃতির নামে নীরবে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানোর কাজ করে চলেছে। মানুষের মধ্যে মানুষের দূরত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। জমি, মজুরি, বর্গা পাট্টা ও তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে চায়। দ্বীপে দ্বীপে তৈরি হয়েছে শিশু ও নারী পাচার চক্র। সুন্দরবনের ৫২ টি দ্বীপের মানুষ ১০০ দিনের কাজ তিন বছর থেকে বঞ্চিত। নদী বাঁধ নির্মাণ করার পরিকল্পনা নেই,বাদাবন, ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের মুখে বাজেটে বরাদ্দ নাম মাত্র। অথচ সুন্দর বনের কাঠ,মধু,মোম,মাছ কাঁকড়া থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করে দেশের সরকার। এর একটা অংশ ব্যয় করলে সুন্দর বনের মানুষের জীবন মান অনেক উন্নত হতে পারে। তা না করে তৃণমূল বিজেপি একজোটে লুট, সন্ত্রাস ও বিভাজনের লক্ষ্যে ধর্মীয় মেরুকরণ করে দু’জনেই রাজনৈতিক ফায়দা তোলার কাজ করছে। সুন্দরবনের মানুষ ধীরে ধীরে তৃণমূল বিজেপি’র গভীর ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরেছে। এদের বিরুদ্ধে পাড়ায় পাড়ায় জনমত গড়ে উঠছে। লোনা জলের সোঁদা গন্ধ,কাদা মাটির গতর, দাম চাইছে,দাম। ওরা বলছে আমার গতরের দাম আমি ঠিক করবো। আমাকে সেই দাম দিতে হবে, যে দাম বা মূল্য আমি ঠিক করবো। এই আলোচনা সর্বত্রই হচ্ছে, নদীর পাড়ে বসে হচ্ছে।  সুতরাং ২০ এপ্রিলের ব্রিগেড বাঘের দেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা ব্রিগেডে আসবে লড়াইয়ের শপথ নিতে। অধিকার আদায়ের শপথ নিতে। গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচার পথ খুঁজতে আসবে ব্রিগেডে। হয় শুধরে যাও না হলে শুধরে দেব।
২০ এপ্রিলের ব্রিগেড সেই পথ দেখাবে।

 

Comments :0

Login to leave a comment