প্রভাত পট্টনায়েক
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর উদারবাদী বুর্জোয়া লেখকেরা বলেছিলেন, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার বিজয় পর্বের শুভারম্ভ হলো। তাদের কাছে সমাজতন্ত্রের প্রত্যাহ্বান অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর মনে হয়েছিল। তারা বিশ্বাস করতেন, যে পুঁজিবাদ ইতিমধ্যেই উপনিবেশগুলিকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রদান করেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ভোটাধিকার এবং কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ধারণাকে মূলনীতিতে স্থান দিয়েছে, তারা সমাজতান্ত্রিক প্রত্যাহ্বানের অবর্তমানে মানবজাতির জন্যে শান্তি, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং নাগরিক স্বাধীনতা এনে দেবে। অন্যদিকে অসংখ্য বামপন্থী লেখক উপনিবেশমুক্তি, প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রের কল্যাণকামী উদ্যোগকে ব্যাখ্যা করেছিলেন সমাজতান্ত্রিক প্রত্যাহ্বানের যুগে নিজেদের অস্তিত্ব সঙ্কট থেকে জাত পুঁজিবাদের ছাড় হিসাবে। তারা অনুমান করেছিলেন, ওই প্রত্যাহ্বান দুর্বল হলেই পুঁজিবাদ আবার পাশবিক চেহারা ধারণ করে সমস্ত ছাড় প্রত্যাহার করে নেবে। তাঁরাই সঠিক প্রমাণিত হয়েছেন এবং একমাত্র যাকে নিয়েই আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত, সেই সাম্রাজ্যবাদ নিজেদের নির্লজ্জ রকমের আগ্রাসী চরিত্রটি প্রকাশ্যে এনে ফেলেছে। এই সময়কে আমরা বলতে পারি একটি ‘গুন্ডাবাজির পর্ব’।
ন্যায়সঙ্গতভাবে নির্বাচিত অন্য একটি দেশের রাষ্ট্রপতি, নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে যেভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সামরিক অভিযান চালিয়ে অপহরণ করার পর এখন হাতকড়া পরিয়ে মার্কিন দেশের মাটিতে বিশ্বাসযোগ্যতাহীন মনগড়া অভিযোগে প্রমাণ ব্যতিরেকে বিচারের জন্যে হাজির করেছে এবং অনুগত পুতুল সরকার অধিষ্ঠিত না-করা অবধি সরাসরি মার্কিন উপনিবেশ হিসাবে সেই দেশ পরিচালনা করার কথা বলছে সেটা একটা অবিশ্বাস্য ধরনের ঔদ্ধত্য যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আচরণের সমস্ত আইনি ও নৈতিক নিয়মকানুনকে লঙ্ঘন করছে যাই আসলে ‘গুন্ডাবাজির পর্বের’ সাম্রাজ্যবাদের ধরন।
এটাই গুন্ডাগিরির পর্বের সাম্রাজ্যবাদের সাম্প্রতিকতম আচরণ। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের বলপূর্বক অপসারণ এবং তাঁর প্রাণদণ্ড, সেটাও মিথ্যা অভিযোগেই, লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির নৃশংস হত্যা, সিরিয়ার দখলদারি, নিজেদের ভুমি থেকে সাম্রাজ্যবাদ সমর্থিত ঔপনিবেশিক দখলদারদের দ্বারা উৎখাত হতে অস্বীকৃতি জানানো যাদের একমাত্র ‘দোষ’ সেই প্যালেস্তাইনের জনগণের নির্বিচার গণহত্যা, গাজা দখলে নিয়ে উপনিবেশ হিসাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প মনোনীত ‘বড়লাট’-এর মাধ্যমে শাসন করা এবং ওই ভূখণ্ডকে একটি মুখ্য ভূসম্পত্তি বা রিয়েল এস্টেটে পরিণত করা— এগুলো সবই সাম্রাজ্যবাদের গুন্ডাবাজি পর্বের বিভিন্ন দৃশ্যের নানা চেহারা।
উদারবাদীরা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই সাম্প্রতিক পাশবিক ভূমিকার জন্যে এককভাবে দায়ী করছে। কিন্তু উপরে যে বিভিন্ন পর্বের উল্লেখ করা হলো সেগুলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার আগেকার ঘটনা। ট্রাম্প এবং তার পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে একমাত্র তফাৎটা হচ্ছে এটাই। অন্যরা কতগুলো বাগাড়ম্বরের আস্তরণে নিজেদের গুন্ডামিকে আবৃত রেখেছিল। অন্যদিকে, ট্রাম্প নিজের প্রশাসনের অভীষ্ট নিয়ে কোনও লুকোছাপা করছে না। নিজেদের ‘উদারবাদে’-র প্রচারণায় সদা ব্যস্ত অন্য সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোও উপরে উল্লিখিত প্রতিটি পর্বে, এমনকী প্যালেস্তিনীয় জনগণের গণহত্যার ঘটনায়ও, সম্পূর্ণ সমর্থন করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। এমনকী মাদুরোর অপহরণ, দক্ষিণ বিশ্বের মুষ্টিমেয় কিছু অনুগ্রহপ্রার্থী চাটুকার দেশ বাদ দিয়ে, অধিকাংশ দেশের দ্বারা নিন্দিত হলেও, জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সক্রিয় এবং পূর্ণ সমর্থন লাভ করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় সঙ্গীদের তরফে একটি যুক্তিতে বলার চেষ্টা হচ্ছে যে, যেহেতু নিকোলাস মাদুরো একজন স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন, সুতরাং তাঁর অপসারণ নিয়ে অশ্রুবর্ষণের কোনও কারণ নেই। এই দাবির চরম অসারতা বোঝা কঠিন নয়। আন্তর্জাতিক কোনও আইনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য যে কোনও দেশকে এই অধিকার দেয় না, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অজুহাতে অপর একটি দেশে সামরিক অভিযান চালানোর। কে তার শাসক হবে সেটা ঠিক করবে সেই নির্দিষ্ট দেশের জনগণ। মাদুরো স্বৈরাচারী ছিলেন কিনা এই প্রশ্ন মার্কিনী আগ্রাসনের পরিপ্রেক্ষিতে কোনও বিচার্য বিষয় হতে পারে না।
তাছাড়া ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন যে মাদুরোর গ্রেপ্তারির পর সে দেশের প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়ার মত জনসমর্থন মাদুরোর প্রধান বিরোধী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর নেই। একটি দেশের দু’টি প্রধান প্রতিপক্ষ মঞ্চের একটির পেছনে জনসমর্থন না থাকা প্রমাণ করে যে অপর মঞ্চের স্বপক্ষেই রয়েছে বৃহত্তর অংশের সমর্থন। ফলত, মাদুরোর রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে তোলা ট্রাম্প বা তার শরিকদের দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এটা প্রমাণিত হয়ে যায়। তর্কের খাতিরে যদি ধরা যায় মাচাদো এবং মাদুরো দু’জনেরই রাজনৈতিক বৈধতা নেই, তবে ভেনিজুয়েলায় কার রাজনৈতিক বৈধতা রয়েছে সেটা জানানোর দায় বর্তায় ট্রাম্পের উপরই।
মাদুরোর অপসারণের আসল কারণটি কী সেটা ট্রাম্পের স্বভাবসুলভ স্থূলতায় তখনই খোলসা হয়ে গিয়েছে যখন তিনি ৩ জানুয়ারি শনিবার সাংবাদিক সম্মেলনে বলে ফেলেন, ‘আমরা ওই দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ তুলে নিয়ে আসতে চলেছি’। যে টাকা তৈরি হবে তা শুধুমাত্র ভেনিজুয়েলার জনগণ পাবে না, পাবে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলি এবং ‘ক্ষতিপূরণ হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও’। ‘ক্ষতি’ বলতে ইঙ্গিত করা হয়েছে ভেনিজুয়েলা সরকারের তরফে তেল সম্পদের জাতীয়করণের সিদ্ধান্তকে। বিশ্বে ভেনিজুয়েলা সর্ববৃহৎ তেলভাণ্ডারের অধিকারী যা বিশ্বের মোট তেল ভাণ্ডারের ১৭ শতাংশ। ভেনিজুয়েলার তেল লুট সম্পর্কে ট্রাম্পের প্রস্তাব তার দখলদারি এবং ‘দেশ চালানো’-র অন্তরালে থাকা আসল কারণের নির্লজ্জ স্বীকৃতি। এটা গুন্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। তোমাদের তেল আছে, আমি সেটা তোমাদের কাছ থেকে নিয়ে নেবো। যদি তোমাদের রাষ্ট্রপতি বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাকে আমরা অপহরণ করব। হয় তোমাদের দেশকে উপনিবেশে পরিণত করে সরাসরি প্রশাসন চালাবো, নয়তো একটি পুতুল সরকার বসাবো যে তোমাদের সম্পদ লুট করতে আমাদের সহায়তা করবে।
জমি-জিরেত,ফসল সহ অন্য দেশের সম্পদ লুণ্ঠন, এটাই চিরকাল সাম্রাজ্যবাদ করে এসেছে। এটা সাম্রাজ্যবাদের মজ্জাগত। উপনিবেশ-মুক্তির পরবর্তী সময়পর্বে, যখনই কোনও সরকারকে তাদের বাধা মনে হয়েছে, তাকে উৎখাত করে আজ্ঞাবহ সরকার বসিয়ে এই কাজ অব্যাহত রাখার চেষ্টা তারা। গুয়াতেমালায় আরবেনজ, ইরানে মোসাদ্দেক, কঙ্গোয় (তখন সে নামেই পরিচিত ছিল) লুবুম্বা এবং চিলিতে আলেন্দের বিরুদ্ধে সিআইএ-পরিকল্পিত সামরিক অভ্যুত্থানের কথা এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে পূর্ব ইউরোপ ও ভূতপূর্ব সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলির রঙিন বিপ্লব বা কালার রিভোলিউশন কিংবা পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিনি হানা একই গোত্রে বিরাজ করে। পূর্ব দৃষ্টান্তগুলির সাথে ভেনিজুয়েলায় ঘটে যাওয়া ঘটনার তফাৎ হলো এটাই আগেকার সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভান করত যে তারা ওই দেশগুলির অভ্যন্তরের বিবদমান পক্ষগুলির কোনও একটির সমর্থনে হস্তক্ষেপ করছে। যদিও অন্তরাল থেকে যেটা ঘটতো সেটা নির্ভেজাল সামরিক অভ্যুত্থানই। কিন্তু ভেনিজুয়েলায় যেটা হলো সেটা একেবারে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ। অভ্যন্তরীণ কোনও পক্ষকে সমর্থন প্রদান মার্কা অজুহাতের কোনও নামগন্ধই এতে নেই।
নিশ্চিতভাবেই, এই হস্তক্ষেপের মাধ্যমে, খনিজ সম্পদ থাকা না-থাকা নির্বিশেষে ,সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সমস্ত সরকারগুলিকেই নিশানা করা হলো। কুখ্যাত মনরো নীতিমালার পুনরুজ্জীবনের তার পরিকল্পনার অঙ্গ হিসাবে কিউবা, মেক্সিকো এবং কলম্বিয়াকে নিশানা করার কথা ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ঘোষণা করে দিয়েছেন। তবে লাতিন আমেরিকা বা ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জগুলিতেই তার অভীষ্ট সাম্রাজ্য সীমাবদ্ধ থাকবে না। আজকের সময়ে বিশ্বের কোনও দেশই মার্কিন হস্তক্ষেপের বিপদ থেকে মুক্ত নয়।
তথাকথিত কিউবান মিসাইল সঙ্কটের সময়ে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছিল তখন পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি মাথায় নিয়েও কিউবার সুরক্ষায় পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এর আগেও রাষ্ট্রপতি নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করার পর ইঙ্গ-ফরাসী জোট সামরিক আক্রমণ করতে উদ্যত হলে একইভাবে মিশরের পাশে দাঁড়িয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। দু’টি ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদকে পিছু হটতে হয়। আজকের সময়ে বিশ্বের যে যে দেশগুলি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হুমকির মুখে রয়েছে তারা সকলেই সোভিয়েত ইউনিয়নের অভাব অনুভব করবে।
সাম্রাজ্যবাদের এই গুন্ডাবাজির পর্ব যা সাম্রাজ্যবাদের উচ্চতম স্তর, সেটা স্বভাবতই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। বিশ্বের জনগণ, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের জনসাধারণ যারা বারবার সাম্রাজ্যবাদের হাতে বলি হয়েছে, তারা আরেকবার সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের ক্রীতদাসত্ব মেনে নেবে না। এমনকী আগের পর্বে আরব দুনিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী গুন্ডাবাজির ফলাফলও তাদের অভীপ্সা অনুযায়ী হয়নি।
এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে, ট্রাম্প যেমনটা ধরেই নিয়েছিলেন যে মাদুরোর অপসারণের পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত উপরাষ্ট্রপতি ডেলসি রডরিগেজ মার্কিনি হুকুমদারি মেনে চলবেন সেই দুরাশা গুড়ে বালি প্রমাণিত হওয়া। তিনি কঠোর ভাষায় মার্কিনি হামলার নিন্দা করে মাদুরোর সত্ত্বর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন যার প্রতিক্রিয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাম্প তাঁকে ‘মাদুরোর চেয়েও করুণ পরিণতির’ হুমকি দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে সমগ্র দেশই মার্কিনি গুন্ডাবাজির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুপস্থিতি সাম্রাজ্যবাদের দুনিয়া দখল অভিযানে বল জোগাচ্ছে, কিন্তু এই অভীপ্সা দিবা স্বপ্নই থেকে যাবে।
Imperialism
দস্যুবৃত্তির যুগে সাম্রাজ্যবাদ
×
Comments :0