Kolkata Road Name change

লেনিন-মার্কস-হো চি মিনের নামে রাস্তা বদলের উদ্যোগ

রাজ্য কলকাতা

কলকাতার ইতিহাস ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত একাধিক রাস্তা, সেতু ও জনস্থানের নাম বদলের উদ্যোগ ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাজ্য সরকারের গঠিত ১০ সদস্যের একটি কমিটি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব খতিয়ে দেখছে। এই তালিকায় রয়েছে কলকাতার তিন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা—লেনিন সরণি, কার্ল মার্কস সরণি এবং হো চি মিন সরণি।
ভারত সেবাশ্রম সংঘের স্বামী প্রদীপ্তানন্দ, যিনি ‘কার্তিক মহারাজ’ নামে পরিচিত, তার নেতৃত্বে এই কমিটি গঠিত হয়েছে। কলকাতা পৌরসভার এক আধিকারিক জানিয়েছেন, দুর্গাপুজোর পর কমিটির প্রথম বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই বৈঠকে কলকাতার রাস্তার নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবগুলি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
তবে এখনও কোনও রাস্তার নাম সরকারি ভাবে পরিবর্তন করা হয়নি। কমিটির সুপারিশের পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে পৌরসভা সূত্রে জানানো হয়েছে।
কমিটির অন্যতম সদস্য তথা মেঘালয়ের প্রাক্তন রাজ্যপাল এবং বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথাগত রায় ইতিমধ্যেই একাধিক নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, লেনিন সরণির নাম করা যেতে পারে প্রাক্তন ভারতীয় জনসংঘ সভাপতি ও গণিতজ্ঞ দেবপ্রসাদ ঘোষের নামে। খিদিরপুরের কার্ল মার্কস সরণির নাম পরিবর্তন করে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত অথবা রঙ্গলাল ব্যানার্জির নামে করার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি। তার যুক্তি, ওই এলাকার সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক যোগ রয়েছে।
হো চি মিন স্মরণির নাম পরিবর্তন করে মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নামে করার প্রস্তাব দিয়েছেন তথাগত রায়। একই সঙ্গে জওহরলাল নেহরু রোড ও সিধু কানু ডহরের সংযোগস্থলে থাকা লেনিনের মূর্তি সরিয়ে দেওয়ার কথাও তিনি বলেছেন। কলকাতার কোনও গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নাম সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নামে করার প্রস্তাবও তার রয়েছে।
কমিটির চেয়ারম্যান কার্তিক মহারাজ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, যে সমস্ত ব্যক্তিত্বের নামে রাস্তা বা জনস্থানের নাম রয়েছে, তাদের ভারতীয় ও বাঙালি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পরম্পরার পরিপ্রেক্ষিতে ‘প্রাসঙ্গিকতা’ খতিয়ে দেখা হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, হো চি মিন স্মরণি, লেনিন স্মরণি ও কার্ল মার্কস স্মরণির নাম বদলের প্রস্তাব এসেছে। অন্যান্য রাস্তার নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবও কমিটির কাছে জমা পড়েছে।
কমিটির সুপারিশ পরবর্তী সময়ে রাজ্য বিধানসভায় পাঠানো হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, মুসলিম ব্যক্তিত্বদের নামে থাকা কয়েকটি স্থানের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবও দিয়েছেন তথাগত রায়। তার প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে কলকাতার কাছে বারাসতের তিতুমিরের নামাঙ্কিত বাসস্ট্যান্ডের নাম বদলে লেখক কাজী আবদুল ওদুদ, শিক্ষাবিদ বেগম রোকেয়া অথবা লেখক এস ওয়াজেদ আলির নামে করার প্রস্তাব।
লেনিন সরণির নাম বদলের ইতিহাসও কলকাতার রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। একসময় এই রাস্তার নাম ছিল ধর্মতলা স্ট্রিট। ১৯৭০ সালে লেনিনের জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষে রাস্তার নাম পরিবর্তন করে ‘লেনিন স্মরণি’ রাখা হয়। পরের বছর, ১৯৭১ সালে সার্কুলার গার্ডেন রিচ রোডের নাম বদলে ‘কার্ল মার্কস স্মরণি’ করা হয়।
অর্থাৎ এই নামগুলি শুধুমাত্র রাস্তার পরিচয় নয়, কলকাতার রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ের দলিলও। রুশ বিপ্লবের নেতা ভ্লাদিমির লেনিন, সমাজতান্ত্রিক চিন্তার অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক কার্ল মার্কস এবং ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রামের নেতা হো চি মিন তাদের নাম কলকাতার নগরজীবনে কীভাবে জায়গা করে নিয়েছিল, তারও সাক্ষ্য বহন করে এই রাস্তার নামগুলি।
ফলে দীর্ঘদিনের এই নামগুলি পরিবর্তনের উদ্যোগ ঘিরে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। একটি শহরের রাস্তা ও জনস্থানের নাম তার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। সেই নাম বদলে দিলে শহরের অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
বিশেষত লেনিন, মার্কস ও হো চি মিনের নাম মুছে ফেলার প্রস্তাবকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। বামপন্থী মহলের বক্তব্য, রাস্তার নাম পরিবর্তনের প্রশ্নকে কেবল কোনও ব্যক্তিত্বের ‘প্রাসঙ্গিকতা’ দিয়ে বিচার করা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, গণআন্দোলন, শ্রমিক-কৃষকের সংগ্রাম এবং আন্তর্জাতিকতাবাদী রাজনৈতিক ঐতিহ্য।
তবে এখনও পর্যন্ত কোনও নাম পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কমিটি প্রস্তাবগুলি খতিয়ে দেখছে। তাদের সুপারিশ রাজ্য সরকারের কাছে যাওয়ার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

Comments :0

Login to leave a comment