STORY | GENER ALO | SAYAN SARKAR | NATUNPATA | 4th YEAR | 23 MAY 2026 | RAJA RAMMOHUN ROY 254

গল্প | জ্ঞানের আলো | সায়ন সরকার | নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ২৩ মে ২০২৬ | রাজা রামমোহন রায় ২৫৪

নতুনপাতা/মুক্তধারা

STORY  GENER ALO  SAYAN SARKAR  NATUNPATA  4th YEAR  23 MAY 2026  RAJA RAMMOHUN ROY 254

গল্প | জ্ঞানের আলো

         সায়ন সরকার 

নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ২৩ মে ২০২৬ | রাজা রামমোহন রায় ২৫৪

 

১৮২৩ সালের এক চৈত্র মাসের বিকেল। কলকাতার এক সংকীর্ণ গলির ভেতরে একটা ছোট ঘরে প্রদীপের আলোয় বসে আছেন রাজা রামমোহন রায়। বাইরে তখন বসন্তের হাওয়া, কিন্তু তাঁর মনে বইছে ঝোড়ো হাওয়া। কয়েকদিন আগেই সরকারের তরফ থেকে প্রস্তাব এসেছে—কলকাতায় একটি নতুন সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে, যেখানে শুধু পুরনো প্রথা আর ব্যাকরণ শেখানো হবে।
রামমোহন এই খবর পাওয়ার পর থেকেই অস্থির হয়ে আছেন। তিনি টেবিলে রাখা লর্ড আমহার্স্টকে লেখা তাঁর চিঠির খসড়াটার দিকে তাকালেন। চিঠিতে তিনি লিখেছেন,
“ভারতবর্ষের যুবসমাজকে যদি শুধু হাজার বছরের পুরনো নিয়ম আর ব্যাকরণ শেখানো হয়, তবে তারা পৃথিবীর দৌড়ে পিছিয়ে পড়বে। আমাদের চাই আধুনিক বিজ্ঞান, গণিত, রসায়ন আর ইংরেজি শিক্ষা।”
এমন সময় ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল রামমোহনের এক স্নেহভাজন তরুণ ছাত্র—সায়ন। তার চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“রামমোহন বাবু! আপনি নাকি সরকারকে চিঠি লিখছেন যাতে এখানে ইংরেজি আর বিজ্ঞান শিক্ষা চালু হয়? চারদিকে সমাজপতিরা আপনার বিরুদ্ধে ফিসফিস করছে। তারা বলছে আপনি নাকি আমাদের যুবসমাজকে ম্লেচ্ছ বানাতে চান! এবার সাধারণ মানুষও আপনার ওপর খেপে যাবে।”
রামমোহন চিঠি থেকে চোখ তুলে সায়নের দিকে তাকালেন। তাঁর সেই চেনা শান্ত অথচ গভীর চোখ দুটোয় কোনো ভয় ছিল না। তিনি সায়নকে বসতে বলে মৃদু হেসে বললেন,
“সায়ন, অন্ধকারের নিজস্ব একটা আরাম আছে। মানুষ যখন দীর্ঘদিন ধরে খাঁচায় বন্দি থাকে, তখন সে ওটাকেই নিজের প্রাসাদ ভেবে ভুল করে। কিন্তু খাঁচাটা ভাঙার দায়িত্ব কাউকে না কাউকে নিতেই হয়।”
সায়ন মাথা নিচু করে বলল,
“কিন্তু একা আপনি কতজনের সঙ্গে লড়বেন? সমাজ বলছে, আধুনিক বিজ্ঞান শিখলে নাকি আমাদের সংস্কৃতি নষ্ট হয়ে যাবে।”
রামমোহন উঠে গিয়ে জানালার ধারে দাঁড়ালেন। বাইরে গোধূলির আলো তখন মিলিয়ে যাচ্ছে। তিনি গম্ভীর স্বরে বললেন,
“সংস্কৃতি এত দুর্বল নয় সায়ন, যে সামান্য বিজ্ঞানের আলোয় তা ধুয়ে যাবে। প্রাচীন জ্ঞান যদি আমাদের শিকড় হয়, তবে আধুনিক বিজ্ঞান হলো আমাদের ডানা। শিকড় আঁকড়ে বেঁচে থাকা যায়, কিন্তু আকাশ ছোঁয়া যায় না। আমি চাই এই দেশের প্রতিটি ছেলে-মেয়ে, ধনী হোক বা দরিদ্র, জাত-পাতের তোয়াক্কা না করে এমন শিক্ষা পাক যা তাদের প্রশ্ন করতে শেখাবে। যুক্তি ছাড়া কোনো সমাজ এগোতে পারে না।”
সায়ন অবাক হয়ে দেখছিল এই মানুষটিকে। যাঁর নিজের মাতৃভাষার প্রতি অগাধ পাণ্ডিত্য, যিনি নিজে সংস্কৃত, আরবি, ফারসি ভাষায় পারদর্শী—তিনিই আবার দেশের ভবিষ্যতের জন্য পাশ্চাত্য বিজ্ঞান শিক্ষার দাবি করছেন। কোনো অন্ধ মোহ নেই, শুধু আছে এক দূরদর্শী দৃষ্টি।
রামমোহন সায়নের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“আজ যারা আমার বিরোধিতা করছে, তারা একদিন বুঝবে। আমি ইংরেজি ভাষার ভক্ত নই, আমি সেই ভাষার মাধ্যমে যে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান আমাদের দেশে আসবে, তার ভক্ত। আমাদের দেশের মানুষ যেদিন নিজের অধিকারের কথা নিজের ভাষায় বলতে পারবে, সেদিনই আসবে আসল স্বাধীনতা। আর তার চাবিকাঠি হলো আধুনিক শিক্ষা।”
রামমোহন আর দেরি করলেন না। সায়নের আশঙ্কার মেঘ উড়িয়ে দিয়ে তিনি সেই ঐতিহাসিক চিঠিতে শেষ সইটা করলেন। তিনি জানতেন, এই চিঠির পর তাঁর দিকে আরও অনেক কুৎসা আর লাঞ্ছনা ধেয়ে আসবে। কিন্তু তাঁর মন আজ সম্পূর্ণ শান্ত।
ভোরের আলো যখন ফুটল, রামমোহন দেখলেন সায়ন টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। ছেলেটার মুখে তখনও ভবিষ্যতের স্বপ্নের সরলতা লেগে আছে। রামমোহন মৃদু হাসলেন। তিনি জানতেন, আজ তিনি যে বীজটি বুনে যাচ্ছেন, একদিন তা থেকেই জন্ম নেবে নতুন যুগের চিন্তা, নতুন শিক্ষার আলো, আর অগণিত জাগ্রত মন।
রাজা তো তিনিই, যিনি তলোয়ার বা মুকুট ছাড়াই একটি গোটা জাতির মনের অন্ধকার দূর করে তাদের চিন্তাভাবনাকে আলোর দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। রামমোহন রায় জানালা দিয়ে ভোরের উদীয়মান সূর্যের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি—কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জ্ঞানের যে প্রদীপ আজ জ্বলেছে, তার আলো একদিন সায়নের মতো হাজারো তরুণের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়বে সমগ্র ভারতবর্ষে।

 


দ্বাদশ শ্রেণী কল্যাণ নগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগনা পাতুলিয়া

Comments :0

Login to leave a comment