বর্ণাঢ্য মিছিল, প্রকাশ্য সমাবেশ ও সাংগঠনিক আলোচনার মধ্য দিয়ে বুধবার শুরু হওয়া এসএফআই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির দু’দিনের বর্ধিত অধিবেশন জলপাইগুড়িতে শেষ হল বৃহস্পতিবার। ‘স্কুল বাঁচাও, মূল বাঁচাও’, সরকারি শিক্ষা রক্ষা এবং ক্যাম্পাসে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবির পাশাপাশি এবিভিপির ক্যাম্পাস দখলের অভিযোগের বিরুদ্ধে সংগঠনকে নিচুতলা থেকে শক্তিশালী করার আহ্বান উঠে আসে অধিবেশনে।
বুধবার শোক প্রস্তাব গ্রহণ ও উদ্বোধনী বক্তব্যের পর সাংগঠনিক প্রতিবেদন পেশ করেন এসএফআই রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে। বুধবার এসএফআই সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য তাঁর বক্তব্যে অভিযোগ করেন, বিজেপি ও আরএসএসের রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে ধর্ম, জাতপাত ও ইতিহাসকে ঘিরে বিভাজনের রাজনীতি ছড়ানো হচ্ছে। তাঁর দাবি, পৌরাণিক কাহিনিকে ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রবণতার বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে হবে। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, চৈতন্যদেব ও রামকৃষ্ণের ভাবনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, বহুত্ববাদী সমাজের ঐতিহ্যকে সামনে রেখেই বিভাজনের রাজনীতির মোকাবিলা করা জরুরি। স্বাধীনতা আন্দোলন, দীল্লি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন এবং বামপন্থীদের বিরুদ্ধে প্রচার নিয়েও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন তিনি। শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিহাস ও বিজ্ঞানচর্চার পরিসর সংকুচিত করার যে কোনও প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজকে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার অধিবেশনের শুরুতে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ সদর শাখার উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনের কাজ শুরু হয়। বুধবার মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত চলা প্রবল বৃষ্টি, বৃহস্পতিবার দুপুরে হালকা বৃষ্টির জেরে বৃহস্পতিবার করলা নদীর পাড়ে স্থিত জলপাইগুড়ি রবীন্দ্রভবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত মনোরম বৃষ্টির চিরে হালকা শীতের আমেজে অধিবেশন চলে প্রায় সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত।
রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা তিন শতাধিক প্রতিনিধির মধ্য থেকে ৩৯ জন প্রতিনিধি প্রতিবেদনের উপর আলোচনায় অংশ নেন। জেলা ও স্থানীয় স্তরে আন্দোলন, পুলিশি নির্যাতন ও শাসক দলের ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের বিরুদ্ধে লড়াই, সংগঠনের সম্প্রসারণ এবং ছাত্রদের আন্দোলনে যুক্ত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। প্রতিনিধিরা জানান, শিক্ষাক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, ফি বৃদ্ধি, সরকারি বাসে ছাত্র-ছাত্রীদের সম্পূর্ণ ভরা মকুব এবং বেসরকারি বাসে ছাত্র-ছাত্রীদের অর্ধেক ভাড়া নেওয়ার দাবি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বিভাগের পরিকাঠামোর অভাব এবং ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তাহীনতার মতো বিষয়গুলি নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। প্রত্যন্ত এলাকার ছাত্রছাত্রীদের সমস্যাকে সংগঠনের কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার উপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নেতৃত্বের আলোচনায় প্রতিনিধিদের আলোচনায় আরো উঠে আসে, ক্যাম্পাসে এবিভিপির প্রতিনিয়ত দখলদারির অভিযোগের মোকাবিলায় ইউনিট থেকে লোকাল, জেলা ও রাজ্য—প্রতিটি স্তরে নিয়মিত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক চর্চা বাড়াতে হবে। শুধু সভা বা বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না থেকে সংগঠনের নিচুতলার বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা, নতুন ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং কাজের চেকআপের উপর জোর দেওয়া হয়। অধ্যাপক, শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক ও শিক্ষানুরাগীদের যুক্ত করে ক্যাম্পাস রক্ষার পরিকল্পনা গ্রহণের কথাও বলা হয়। পাশাপাশি, ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত করা, ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং ভিন্নমতাবলম্বী ছাত্রছাত্রীদের উপর চাপ সৃষ্টি বন্ধ করার দাবিও আলোচনায় উঠে আসে।
রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে ও সভাপতি প্রণয় কার্জী সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদের উপর হামলা ও দখলদারির অভিযোগ তুলে তার বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে, ক্যাম্পাসে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে ছাত্রদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হলে তার বিরুদ্ধে আইনসম্মত ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সংগঠনের সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের দৈনন্দিন সমস্যা—স্কলারশিপ, হস্টেল, পরিবহণ, পরীক্ষার ফি ও ফল প্রকাশে অনিয়ম—নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
শিক্ষার কেন্দ্রীয়করণ, গৈরিকীকরণ ও বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন, নতুন স্কুল-কলেজের দাবিতে বৃহত্তর ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাসের দাবিকে সামনে রেখে সাংগঠনিকভাবে আরও সক্রিয় হওয়ার শপথের মধ্য দিয়ে শেষ হয় অধিবেশন। আগামী দিনে জেলা ও কলেজভিত্তিক প্রচার, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে গণসংযোগ এবং শিক্ষার অধিকার রক্ষায় ধারাবাহিক কর্মসূচি গ্রহণের কথাও জানানো হয়।
এসএফআই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির বর্ধিত অধিবেশন ঘিরে রবীন্দ্রভবন প্রাঙ্গণ প্রাক্তন ছাত্র ও বর্তমান ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছিল। অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাক্তার পান্থ দাশগুপ্ত ছাত্র আন্দোলনের তথকালীন অন্যতম নেতৃত্ব বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাক্তার সুদীপন মিত্র, প্রাক্তন সংসদ জিতেন দাস, প্রাক্তন ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব শিক্ষক নেতা রিতা রায় সেনগুপ্ত, বিপ্লব ঝা, প্রাক্তন ছাত্রনেতা পিযুষ মিশ্র শমিক লাহিড়ী, জিয়াউল আলম এর উপস্থিতি দেখাশোনা খোঁজখবর নেওয়া সহ অসংখ্য ছাত্র-যুব-মহিলা ও অভ্যর্থনা কমিটির সকল সদস্যদের দিনরাত ব্যাপী পরিশ্রম ও এসএফআইয়ের অসংখ্য শুভানুধ্যায়ের আর্থিক সাহায্যে সুন্দরভাবে অধিবেশন শেষ করা সম্ভব হয়।
Comments :0