প্রশান্ত সিকদার ও কৌশিক দাম: মালবাজার
সময় বদলায়, সরকারও বদলায়। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চায়ের বাগান থেকে ভিনরাজ্যে ছুটে যায়। কিন্তু পেটের তাগিদে ভিনরাজ্যে কাজ করতে গিয়ে লাশ হয়ে ঘরে ফেরার করুণ চিত্র বদলায় না। সিকিমে নির্মীয়মাণ টানেল ধসের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ডুয়ার্সের চা বাগান এলাকার ৯ জন শ্রমিকের মধ্যে বুধবার গভীর রাতে ৬ জনের নিথর দেহ বাড়িতে পৌঁছতেই নেমে এল গভীর শোকের ছায়া। মাটিয়ালি ব্লকের ৪ টি এবং নাগরাকাটা ব্লকের ২ টি দেহ নিয়ে আসা হলে মৃত শ্রমিকদের বাড়িতে কান্নার রোল ওঠে। প্রিয়জনদের শেষবারের মতো দেখতে প্রতিবেশীরা ভিড় জমান।
সোমবার সিকিমের নামচি জেলায় একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল নির্মাণের কাজ চলার সময় আচমকাই ধস নামে। ভেতরে কর্মরত শ্রমিকরা আটকে পড়েন। গ্যাস লিক হওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হলেও পরবর্তীতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একের পর এক শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সুড়ঙ্গ ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৫। মর্মান্তিক এই ঘটনায় তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে সিকিম সরকার। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মৃত শ্রমিকদের অধিকাংশই জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার মহকুমার বাসিন্দা। এরমধ্যে মেটেলি ব্লকের ৬ জন এবং নাগরাকাটা ব্লকের ৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ডুয়ার্সের চা বলয়ের চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ। স্থানীয়রা যুবকরা ভোট বা অন্যান্য সময় পেরিয়ে গেলেও বিকল্প কাজের অভাবে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ছেন। চামুর্চির রেতি থেকে ওদলাবাড়ির লিস-ঘিসের মতো নদীগুলিতে বর্ষার মরশুমে বালি-পাথর তোলার কাজ বন্ধ। অন্যদিকে চা বাগানের অবস্থাও করুণ। ১০০ দিনের কাজ দীর্ঘদিন ধরে থমকে থাকায় এবং স্থানীয় স্তরে পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ ও উপযুক্ত মজুরি না পেয়ে ডুয়ার্সের কৃষি ও চা বলয় খালি করে দলে দলে শ্রমিকরা ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন।
নিহতদের দেহ ফিরতেই শ্রমিক মহল্লার মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন। কিলকোট চাবাগানের ১১ নম্বর লাইন শ্রমিক মহল্লার গাব্রিয়েল টিজ্ঞা, শিবা মুন্ডা, বিকেশ্বর ওরাও শ্রমিকের কাজ করতে সিকিমে গিয়েছিল। ট্যানেল দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়। এছাড়াও ইনডং চাবাগানের শ্যাম ওরাও এবং নাগেশ্বরী চাবাগানের অমিত লাল গোরে সহ আরও একজন এই দুর্ঘটনায় মারা গেছে। সবাই মাটিয়ালি ব্লকের বাসিন্দা। কান্নায় ভেঙে পড়া শ্রমিক পরিবারের লোকজন দের সান্ত্বনা দেন প্রতিবেশীরা। বুধবার যে ৪টি মৃত দেহ ফিরে আসে তারমধ্যে মাটিয়ালি ব্লকের ৩ জন এবং নাগরাকাটা ব্লকের ১ জন ছিল।
জীবন ও জীবিকার টানে কেউ চার দিন আগে, আবার কেউ মাত্র দু'সপ্তাহ আগে সিকিমের নির্মাণকাজে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। অদক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সুযোগই তাঁদের প্রাণ কেড়ে নিল। গ্রাসমোড় চা বাগানের আনন্দ টপ্পো, সুলকাপাড়ার বলো ওঁরাও বা মেটেলির শিবা ওঁরাওদের মতো শ্রমিকরা বারবার এভাবেই লাশ হয়ে ফিরছেন। নির্মাণ সামগ্রীর স্থানীয় ব্যবসায়ী গুলজার রহমানের কথায়, ‘কাজ না পেয়ে বাধ্য হয়ে বালি-পাথরের কাজ করলে জোটে ‘মাফিয়া’ বা ‘ক্রিমিনাল’ তকমা, আর বাইরে গেলে ‘পরিযায়ী’।’’
তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সিপিআই(এম) জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদক পীযুষ মিশ্র বলেন, ‘‘ ডুয়ার্সের চা বলয়ের চিত্রটি অত্যন্ত ভয়ংকর এবং এর সম্পূর্ণ দায় রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের ভুল নীতির। স্থানীয় স্তরে বিকল্প কাজের কোনো সুযোগ নেই। ১০০ দিনের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। চা বাগানের বেহাল দশা এবং পর্যাপ্ত কাজের অভাব ও উপযুক্ত মজুরি না থাকায় ডুয়ার্সের কৃষি ও চা বলয় খালি করে দলে দলে শ্রমিকরা ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ শাসকদল শুধু মুখের বুলি আউড়ে চলেছে। ভিনরাজ্যে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবন ও সুরক্ষার কোনো গ্যারান্টি নেই।’’
জলপাইগুড়ি জেলায় পরিযায়ী শ্রমিকের সঠিক কোনও সরকারি পরিসংখ্যান না থাকলেও, ‘দুয়ারে সরকার’ ও শ্রম দপ্তরের মাধ্যমে হাজার হাজার শ্রমিক নাম নথিভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্পের ভাতা অনিয়মিত বলে অভিযোগ। কেরালায় কর্মরত বানারহাটের অজয় লোহারের মতো শ্রমিকরা জানান, তাঁরা ভাতা চান না, স্থায়ী কাজের সুযোগ চাই। ডুয়ার্স উজাড় করে ভিনরাজ্যে যাওয়া শ্রমিকদের মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিজনহারা পরিবার গুলির পাশে দাঁড়ানো এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের জোরালো দাবি তুলেছে এলাকাবাসী।
Comments :0