post editorial

স্মার্ট মিটার: কার লাভ, কার ক্ষতি

সম্পাদকীয় বিভাগ

শান্ত রক্ষিত
 

আমাদের আধার কার্ড, প্যান কার্ড বা ভোটার কার্ড আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারে না। অর্থাৎ এদের সঙ্গে  কোনও তথ্য আদানপ্রদান করা যায় না। কিন্তু টাকা তোলার জন্য ব্যাঙ্কের ডেবিট কার্ড যখন এটিএম মেশিনে ঢোকাই, সে পাসওয়ার্ড চায়। আমরা দিই। তখন সে নানা অপশন দিতে থাকে। আমরা সেইমত বোতাম টিপতে টিপতে এগোই। তারপর টাকার অঙ্ক জানাই। তখন এটিএম থেকে টাকা বেরিয়ে আসে। এই পরস্পরের সঙ্গে তথ্য আদান প্রদান করতে পারে বলেই একে স্মার্ট কার্ড বলা হয়। সেইভাবেই যে মোবাইল ফোনগুলো পাসওয়ার্ড চায়, বিভিন্ন অপশন চায়, আমরা দিই এবং কাঙ্ক্ষিত কাজটা করি, তাকে স্মার্ট ফোন বলে।
আমাদের ঘরে ঘরে যে ইলেকট্রিকের মিটার লাগানো আছে, সে চাকা-ঘোরা অ্যানালগ মিটারই হোক বা ডিজিটাল ডিসপ্লেওয়ালা মিটারই হোক, তা সময়ে সময়ে বিদ্যুৎ সংস্থার কাছে বিদ্যুৎ খরচের হিসাব পাঠাতে পারে না। কেউ এসে দেখলে, সে আগের দেখার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট কত বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে তা জানাতে পারে মাত্র। প্রত্যেক মুহূর্তের কারেন্ট, ভোল্টেজ আর পাওয়ার ফ্যাক্টর গুণ করে করে সে কত ওয়াট খরচ হলো তার হিসাব করে করে জমিয়ে রাখে নিজের কাছে। বিদ্যুৎ সংস্থাকে ক্ষণে ক্ষণে পাঠাতে পারে না। এক কিলোওয়াট এক ঘণ্টা ধরে খরচ হলে তখন সেটা হয় এক ইউনিট। সেই ইউনিট অনুযায়ী মোট খরচের বিল বেরিয়ে আসে এই সব চালু মিটার থেকে।
কিন্তু, স্মার্ট মিটারে, আমাদের কখন কত ইউনিট খরচা হচ্ছে, তা পনেরো মিনিট বা আধঘণ্টা অন্তর অন্তর মিটার থেকে তথ্য যাবে বিদ্যুৎ সংস্থার কম্পিউটারে। সেই কম্পিউটারের সফটওয়ারের মাধ্যমে সংস্থা এই মিটারকে তদারকিও করবে। এই দ্বিমুখী তথ্য আদানপ্রদান করতে পারে বলেই একে স্মার্ট মিটার বলে।
সেখানে যদি বিদ্যুৎ সংস্থার কম্পিউটারের সফটওয়্যারে প্রোগ্রাম করা থাকে সকাল বেলা কী দর হবে, সন্ধেবেলা কী দর হবে, গরমকালে কত করে ইউনিটের দাম নেওয়া হবে আর শীতকালে কত করে, সেইভাবেই প্রতিদিনের বিল জমা হতে থাকবে আমাদের নামে। তারপর মাস গেলে বিল আসবে মোবাইলে। সে বিল মেটাবার সময়সীমা পার হয়ে গেলে, বিদ্যুৎসংস্থার কম্পিউটার থেকেই এই স্মার্টমিটারের সাহায্যে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এটা হলো বর্তমান পোস্ট-পেড ব্যবস্থা। মানে আগে খরচ করো, শেষে টাকা দাও। যেমন আমরা প্রত্যেকেই সারা মাস কাজ করার পর, মাস শেষ হলে বেতন পাই। শ্রমিক ঐ মাসটা ঘরের খেয়ে মালিকের জন্য খাটে। তাই আমরাও আগে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি, মাসের শেষে বিল পাই। বিল মেটাই।
কিন্তু যদি বিদ্যুৎসংস্থা বলে মোবাইলের মতো আগে টাকা দাও তারপর বিদ্যুৎ খরচ করো, তবে সেটাকে বলে প্রি-পেড ব্যবস্থা। এই স্মার্টমিটারগুলোকে দূরে বসেই, বিদ্যুৎ সংস্থার কম্পিউটারের একটা ক্লিকেই পোস্ট-পেড থেকে প্রি-পেড করে দেওয়া যায়। তখন আগে টাকা জমা করতে হবে বিদ্যুৎ দপ্তরে। তবে আমরা আলো-পাখা চালাতে পারব। তারপর সেই টাকা ফুরিয়ে গেলেই, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। একদম মোবাইল ফোনের রিচার্জের মতো। তখন, আবার টাকা না জমা দেওয়া পর্যন্ত আপনার বাড়ির বা দোকানের আলো পাখা চলবে না। এইবার, টাকা জমা দেবার কতক্ষণ পরে বিদ্যুৎ সংযোগ আবার চালু হবে, সেটা নির্ভর করছে বিদ্যুৎ দপ্তরের পরিকাঠামোর সক্রিয়তার ওপর। 
প্রশ্ন উঠতে পারে, আমাদের ঘরে ঘরে চালু ইলেকট্রিক মিটারে তো ভালোই চলে যাচ্ছে। হঠাৎ করে কী হলো যে সরকারের তরফ থেকে এই মিটার পালটে স্মার্টমিটার বসাবার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ বিল ২০২৫, যা জন অসন্তোষের কারণে এখনও আইনে পরিণত করতে পারেনি, সেটা দেখতে হবে। সংক্ষেপে, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার পুনর্গঠনই এই বিলের মূল কেন্দ্রবিন্দু। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে সরকারি দায়বদ্ধতার আওতা থেকে সরিয়ে কর্পোরেটের হাতে তুলে দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যার বাস্তবায়নের জন্য প্রি-পেড স্মার্টমিটার অপরিহার্য।
এই বিদ্যুৎ বিলে কী কী আছে আর তাতে কোথায় কোথায় স্মার্টমিটারের প্রয়োজন, তার সবটা ব্যাখ্যা করা এই স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। তবে প্রধান দুটি বিষয়ে আলোচনা করব। প্রথমটি হলো ক্রস-সাবসিডি তুলে দেওয়া আর দ্বিতীয়টি হলো প্রতিযোগিতার নামে, জনগণের টাকায় তৈরি বর্তমান বিদ্যুৎ বিতরণ পরিকাঠামোকে একই সঙ্গে সরকারি সংস্থা ও বহু বেসরকারি সংস্থাকে ব্যবহার করার লাইসেন্স দেওয়া।
বড় শিল্প, কারখানা বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যারা সরকারের কাছ থেকে কর ছাড় সমেত বিভিন্ন সুযোগ সুবিধাই শুধু পায় না, তাদের জন্য হাই-ভোল্টেজ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাও করতে হয়, তাদের কাছে একটু বেশি দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করে সেই মুনাফার অংশ দিয়ে কৃষিকাজে বা সাধারণ গ্রাহকদের একটু কম দামে বিদ্যুৎ সরবরাহের নীতিকেই ক্রস-সাবসিডি বা আড়াআড়ি ভরতুকি বলা হয়। দেশের কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখতে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা টিকিয়ে রেখে শিল্পের বাজার বজায় রাখতে, এই ভরতুকি সরকারের কোষাগার থেকে আসে না, আসে বড় পুঁজিপতির পকেট থেকে।
এই ব্যবস্থা যে কোনও দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই বিদ্যুৎ বিল-২০২৫ অনুযায়ী, সেই ক্রস-সবসিডিকে ধীরে ধীরে পাঁচ বছরের মধ্যে তুলে দেওয়া হবে। তাই দিনের বিভিন্ন সময়ে বা বছরের বিভিন্ন ঋতুতে একটু একটু করে কৃষক তথা সাধারণ গ্রাহকদের ইউনিটের দাম বাড়াতে হবে আর বড় পুঁজিপতিদের ইউনিটের দাম কমাতে হবে। সে কাজ করতে গেলে স্মার্টমিটার ছাড়া চলবে না।
বিদ্যুৎ আইন-২০০৩-এর ১৪ এবং ৪২ নং ধারায় সংশোধনী এনে, এই বিল একই এলাকায় একই পরিকাঠামো ব্যবহার করে একাধিক বেসরকারি বিদ্যুৎ বিতরণ লাইসেন্সধারীকে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ বেচার ব্যবস্থা করেছে। এই পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে দশকের পর দশকের সরকারি বিনিয়োগে। তাহলে সেই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে বেসরকারি সংস্থাকে তার মুনাফার অংশ সরকারি সংস্থাকে দেওয়া উচিত। সেই মুনাফার অংশ পেলে, একটু কমদামে সরকারি সংস্থা সাধারণ গ্রাহককে বিদ্যুৎ দিতে পারতো। তা কিন্তু হবে না। বিলে এমনি লেখা আছে। স্মার্টমিটার চালুর এই যে মরিয়া প্রচেষ্টা, তা মূলত একই নেটওয়ার্ককে একাধিক পরিষেবা দাতার ব্যবহারের উপযোগী করার জন্য। স্মাটমিটারের মধ্যে থাকা মাইক্রোকন্ট্রোলার এই পরিষেবা দাতা নির্বাচন করতে পারে।
এই পরিষেবাদাতারা কিন্তু যে চাইবে তাকেই পরিষেবা দিতে বাধ্য নয়। তাদের টার্গেট, এলাকার বড় শিল্প বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। তাদের সামান্য সস্তায় বিদ্যুৎ দেবার অঙ্গীকার করে, বড় রকম বিদ্যুৎ বেচার পরিকল্পনা ছেড়ে এরা সাধারণ নিম্ন আয়ের গ্রাহকের কাছে বা প্রত্যন্ত গ্রামে যাবে কেন? তাদের জন্য পড়ে থাকবে সরকারি সংস্থার পরিষেবা। যার বড় গ্রাহক চলে যাওয়ায় লাভ যাবে কমে। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের ইউনিটের দাম বাড়বে। তাই স্মার্ট মিটার, একদিকে যেমন সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বেসরকারিকরণে সাহায্য করবে, তেমনই অন্যদিকে সাধারণ গ্রাহককে বিদ্যুতের বিল মেটাতে নাজেহাল করবে। সবটাই হবে সুকৌশলে, ধীরে ধীরে, কেনা মিডিয়ার ভালো ভালো কথার জালের আড়ালে। মনে রাখবেন, স্মার্ট মিটার লাগানোর বরাত যে চারটি বেসরকারি সংস্থাকে সরকার দিয়েছে, আদানি এনার্জি সলিউশন্স তাদের অন্যতম।

 

স্মার্ট মিটার, একদিকে যেমন সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বেসরকারিকরণে সাহায্য করবে,  অন্যদিকে সাধারণ গ্রাহককে বিদ্যুতের বিল মেটাতে নাজেহাল করবে। সবটাই হবে সুকৌশলে, ধীরে ধীরে, কেনা মিডিয়ার ভালো ভালো কথার জালের আড়ালে। মনে রাখবেন, স্মার্ট মিটার লাগানোর বরাত যে চারটি বেসরকারি সংস্থাকে সরকার দিয়েছে, আদানি এনার্জি সলিউশন্স তাদের অন্যতম।

Comments :0

Login to leave a comment