চিন্ময় কর
'ভোটটা কেড়ে নিলো। দেশে থাকতে দেবে তো?' এমন প্রশ্নে আতঙ্কে মানুষ। ট্রাইব্যুনালে কাগজ জমা দিতে এসেও হেনস্তা, লম্বা লাইনে মানুষের ক্ষোভ। এর হিসাব মেটানোর সুযোগ এলেই বুঝিয়ে দেবেন এমনও ক্ষোভ উগরে দিলেন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মানুষ। জেলা শাসকের দপ্তর সহ জেলার ঘাটাল ও খড়্গপুর দুই মহাকুমা শাসকের দপ্তরের সামনে মানুষের ভীড় সকাল থেকেই।
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে ৫২ হাজার অধিক। ১ লক্ষ ৩ হাজার ৪৩২ জনের বিচারাধীন তালিকা থেকে দুই দফায় ১৯ হাজার জনের নাম বাতিল বলে প্রকাশিত হয়। শেষ দফায় গিয়ে সেটি দাঁড়ালো ৫২ হাজার অধিক। এই নাম বাতিল হওয়া মানুষদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছেন যাদের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় রয়েছে। আবার অনেকের বাবা মার নামও রয়েছে ওই তালিকায়, তাদের ও নাম বাতিল করা হয়েছে।
কমিশনের প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় যাঁদের নাম 'ডিলিটেড' তাঁরা আজ সকাল থেকেই মহকুমাশাসক ও জেলাশাসকের দপ্তরে হাজির হন। হাতে গোছা গোছা নথি আর মনে এক রাশ দুশ্চিন্তা, এভাবেই ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানাতে ছুটছেন ভোটার তালিকায় বাদ পড়া মানুষ। পাশাপাশি বিচারাধীন ভোটারদের নিষ্পত্তি হওয়ার পর ডিলিট ভোটারদের আবেদন প্রক্রিয়া ঘিরে অনলাইন ও অফলাইন পদ্ধতি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
খড়্গপুর শহরের সংখ্যালঘু মানুষের বাস ৪ নম্বর ওয়ার্ড পাঁচবেড়িয়াতে, সেখানে ২৬৫৩ জনকে বিচারাধীন তালিকায় রাখা হয়।তারমধ্যে ৯০৬ জনের নাম ভোটার তালিকায় স্থান পেলেও বাকিদের বাতিল করা হয়েছে। আর খড়্গপুর বিধানসভা কেন্দ্রে ১৬৬৫৮ জন কে বিচারাধীন তালিকা ভুক্ত করা হয়। সেখানে প্রাথমিকভাবে ৬০ভাগ বিচারাধীন মানুষের নাম বাতিল করা হয়েছে। আর সারা জেলায় বিচারাধীনদের ৫০ ভাগ বাতিল করা হয়েছে।
পা়চবেড়িয়াতে সিপিআই(এম)-এর আইনি সহায়তা ক্যাম্পে ৭৩ বছরের হাসিনা বেগম সহ বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী বললেন, তাদের নাম ২০০২ সালের তালিকায় ছিল তা সত্বেও বাতিল করা হয়েছে কেনো তার উত্তর তারা পায়নি।
খড়াপুর-২ ব্লকের উত্তরসিমলা গ্রামের বাসিন্দা রমজান খাঁ ও আলি আসগর খাঁ-র পরিবারেও সেই একই উদ্বেগ। রমজানের স্ত্রী আসমা বিবি ও আলি আসগরের স্ত্রী লাইলা বিবির নাম আগের তালিকায় ছিল। তাঁরা এনিউমারেশন ফর্ম জমা দিয়ে শুনানিতেও হাজির হয়েছিলেন সমস্ত নথি নিয়ে। তবুও তাঁদের নাম প্রথমে 'আন্ডার অ্যাজুডিকেশন' তালিকায় গিয়ে শেষ পর্যন্ত ডিলিটেড হয়ে যায়। আসগরের প্রশ্ন, ' আমার ছেলে-মেয়ের নাম তালিকায় আছে। অথচ আমাদের নেই। এটা কী ভাবে সম্ভব?' রমজান বলেন, 'চার ভাইয়ের মধ্যে দু'জনের নাম রয়েছে, দু'জনের নেই। তাই ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছি।' মেদিনীপুর শহরের তোড়াপাড়া এলাকার প্রায় নব্বই বছরের পুষ্পরানি সরকারের অবস্থাও একই রকম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, তবু ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানাতে এসেছেন। বহু দশক আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে আসা মেদিনীপুরের উদ্বাস্তুর কলোনীর এই প্রবীণার কন্ঠে আতঙ্ক- 'ভোট দিতে দেবে না তাতে কষ্ট আছে কিন্তু দেশে থাকতে পারব তো?' একই উদ্বেগ ৯৭ বছরের স্বর্ণলতা দাসেরও।
অপর দিকে খড়্গপুরে সিপিআই(এম)-এর আইনি সহায়তা কেন্দ্রে হাজার অধিক বাতিল হওয়া ভোটার হাজির হয়ে কাগজ পত্র রেডি করলেন। আগামীকাল মহকুমা দপ্তরে জমা দেবেন। অনলাইনে আবেদন জমা নিলেও তার প্রামান্যর কাগজ পত্র গ্রহন করছে না। ফলে দপ্তরে জমা দেওয়ার জন্য লাইন পড়ছে। অপর দিকে ঘাটাল মহকুমা দপ্তরেও ট্রাইব্যুনালে আবেদনের জন্য লাইনে নথি হাতে দাঁড়িয়ে হাজার অধিক মানুষ।
ক্ষোভ উগরে দেন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সৈয়দ রিজাউল পতি, শেখ রবিয়াল হোসেনরা।
তাঁরা বলেন, 'আমরা জেনুইন ভোটার। ২০০২-এর তালিকায় নাম ছিল। কিন্তু তার পরেও কেন বাদ দিল জানি না। সকাল থেকে কাজকর্ম ছেড়ে বসে আছি। এই হয়রানি কি আমাদের প্রাপ্য। ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেও কিছু হবে কিনা তারও নিশ্চয়তা নেই। নির্বাচন কমিশনের জন্য আমাদের আজ হায়রানি। এর পিছনে রাজনীতি যারা করলো তাদের মনে থাকবে আমাদের।'
Comments :0