ক্যালেন্ডারের পাতা চারবার উল্টে গেলেও সুরাহা হয়নি ধূপগুড়ি ব্লকের গধেয়ারকুঠি গ্রাম পঞ্চায়েতের হোগলারটারি এলাকার বানভাসি মানুষদের। গত ৫ অক্টোবর ভয়াবহ বন্যায় জলঢাকা নদীর ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া অসংখ্য পরিবার আজও দুর্ভোগের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন। শীতের হাড়কাঁপানো উত্তুরে হাওয়ার মধ্যে বালির চরে ছেঁড়া প্লাস্টিকের তাঁবুর নিচেই তাঁদের অনিশ্চিত জীবন। মাথার উপর স্থায়ী ছাদ, নিরাপদ পানীয় জল বা ন্যূনতম মানবিক সুবিধা, কিছুই জোটেনি চার মাসেও। বানভাসি পরিবারগুলির অভিযোগ, নবান্ন থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন, সর্বত্রই পুনর্বাসন প্রশ্নে চরম উদাসীনতা ও অবহেলা চোখে পড়ছে। বন্যার পর মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, গৃহহীন প্রতিটি পরিবারকে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অধিকাংশ পরিবার পেয়েছেন মাত্র ৬০ হাজার টাকা। বর্তমান বাজারদরে এই অর্থে ঘরের ভিত তোলা তো দূরের কথা, নদীভাঙনে সৃষ্টি হওয়া গভীর গর্ত ভরাট করাও কার্যত অসম্ভব।
জলঢাকা নদীর গ্রাসে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া এলাকাগুলিতে এখন শুধুই বালির স্তূপ আর বড় বড় খাদ। নতুন করে বসবাসের জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ মাটি ভরাট, যার খরচ বহন করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন মিনতি রায়, মেনকা রায়, কলিকা সরকার, চম্পক নাগ, বিমল নাগ, মধুমিতা মণ্ডলদের মতো বহু পরিবার। তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসনের উদ্যোগ সম্পূর্ণ লোকদেখানো। দু’একবার জেসিবি পাঠিয়ে বালি সরালেও স্থায়ী পুনর্বাসনের কোনও রূপরেখা নেই। এখনও বহু পরিবার ন্যূনতম ত্রাণ সামগ্রী থেকেও বঞ্চিত।
নদীবাঁধ সংস্কারের দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও রাজ্য সরকার ও রেল দপ্তরের টানাপোড়েনে দীর্ঘদিন কাজ কার্যত থমকে ছিল। প্রবল আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত রেল দপ্তর প্রায় ১৮ কোটি টাকার টেন্ডার ডাকতে বাধ্য হলেও কাজের গতি অত্যন্ত মন্থর। বর্ষার আগেই বাঁধ সংস্কার সম্পূর্ণ না হলে ফের ভয়াবহ প্লাবনের আশঙ্কায় আতঙ্কে দিন কাটছে হোগলারটারি এলাকার মানুষের।
এই গোটা পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘প্রশাসনিক বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটির জলপাইগুড়ি জেলা শাখার সম্পাদক মনোজিৎ দাস। তিনি বলেন, ‘‘একদিকে উৎসবের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে, অন্যদিকে বানভাসি মানুষ বালির চরে দাঁড়িয়ে দিন গুনছে। এটাই তৃণমূল সরকারের দেউলিয়া রাজনীতির নগ্ন রূপ।’’ তিনি অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ, সরকারি খরচে জমি ভরাট ও স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবি জানান।
শাসকদলের তথাকথিত উন্নয়ন যখন ফ্লেক্স, হোর্ডিং আর বিজ্ঞাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তখন মানুষের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে মাঠে নেমেছে রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটি। প্রশাসনের মুখাপেক্ষী না থেকে হোগলারটারি এলাকার চরম ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য প্রথম পর্যায়ে ৬টি গৃহ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে কমিটির জলপাইগুড়ি জেলা শাখা। শুধু আবাসন নয়, যেখানে সরকার পানের অযোগ্য জল সরবরাহ করে দায় সেরেছে, সেখানে কো-অর্ডিনেশন কমিটির উদ্যোগে স্থায়ী পানীয় জলের জন্য একটি ওয়াটার ফিল্টার প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজও শুরু হয়েছে। আগামী ২৯ জানুয়ারি এই দুটি প্রকল্প সম্পূর্ণ করে দুর্গত পরিবারগুলির হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
ধূপগুড়ি ও নাগরাকাটার দুর্গত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে সংগঠনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের কাছেও সাহায্যের আবেদন জানানো হয়েছে। এলাকার মানুষের স্পষ্ট বার্তা, আর নয় মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। অধিকার আদায়ের লড়াই ও সংহতির পথেই মিলবে মুক্তি।
Dhupguri
প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ফের প্লাবনের আশঙ্কায় ধূপগুড়ির বানভাসিরা
×
Comments :0