USA mid term election

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধাক্কা, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান শিবিরে অস্বস্তি

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ফের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচন (Midterm Election) ঘিরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্ব, তাঁর প্রশাসনের নীতি এবং রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস) এবং সেনেটের আসনগুলির পাশাপাশি একাধিক অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী ফলও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত কোনও প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। তাই এই ভোটকে অনেক সময় প্রেসিডেন্টের কাজকর্মের উপর জনমতের পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হয়। ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার শাসনকালে এই নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনের ফল তাঁর প্রশাসনের রাজনৈতিক শক্তি এবং আগামী দু’বছরের আইন প্রণয়নের ক্ষমতার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

কংগ্রেসের দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের জয়
নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফল, মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। ডেমোক্র্যাটরা সেনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—দুই জায়গাতেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

৪ নভেম্বর পাওয়া সর্বশেষ গণনা অনুযায়ী, সেনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসন ৫৪, রিপাবলিকানদের ৪৪। সেনেটের ৩৫টি নির্বাচনী লড়াইয়ের মধ্যে ৩৩টির ফল ঘোষিত হয়েছে। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে ৩৬৭টির ফল প্রকাশিত হওয়ার সময় ডেমোক্র্যাটরা ২২৮টি এবং রিপাবলিকানরা ১৩৯টি আসনে এগিয়ে বা জয়ী। বাকি আসনগুলির গণনা তখনও সম্পূর্ণ হয়নি।

এই ফলের ফলে ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য কংগ্রেসে আইন পাস করানো, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নিয়োগ এবং বাজেট সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে উঠবে। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের তদন্ত এবং প্রেসিডেন্টের নীতির উপর নজরদারি বাড়াতে পারবেন।

 

রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও ধস
এই নির্বাচনের অন্যতম বড় তাৎপর্য, যে সব অঙ্গরাজ্যকে দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি বলে মনে করা হত, সেখানেও ডেমোক্র্যাটরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন।

টেক্সাস: রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই রাজ্যে গভর্নর নির্বাচনে গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা। সেনেট নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য এসেছে।

আইওয়া: প্রায় এক শতাব্দী পর এই রাজ্য থেকে সেনেটে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটনের জয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

ওহায়ো: রিপাবলিকানদের হাত থেকে সেনেটের আসন ছিনিয়ে নিয়েছেন ডেমোক্র্যাট শেরড ব্রাউন।

জর্জিয়া: সেনেটে নিজের আসন ধরে রেখেছেন ডেমোক্র্যাট জন অসফ। গভর্নর নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট কিশা ল্যান্স বটমস।

দক্ষিণ ক্যারোলিনা ও নর্থ ক্যারোলিনা: এই দুই রাজ্যেও সেনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় রিপাবলিকান শিবিরের জন্য বড় ধাক্কা।

এছাড়া একাধিক রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসনাল আসন ডেমোক্র্যাটদের দখলে এসেছে।


রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ফলকে শুধুমাত্র বিরোধী দলের নির্বাচনী সাফল্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। নির্বাচনে ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব বড় বিষয় হয়ে উঠেছিল।

মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার খরচ: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি এবং অন্যান্য খরচের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়েছে।

ইরান যুদ্ধ: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং তার জেরে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ।

শুল্কনীতি: ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতি এবং শুল্ক আরোপের প্রভাব নিয়েও ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল।

প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ: নির্বাচনের আগে প্রকাশিত ভোটার সমীক্ষায় প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার কংগ্রেসের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার উপর আরও নিয়ন্ত্রণ বা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।

ট্রাম্পের প্রচার ও প্রার্থী নির্বাচন: একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া রিপাবলিকান প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

 

কংগ্রেসের পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যগুলির গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটদের ফল উল্লেখযোগ্য। ৩৬টি রাজ্যে গভর্নর নির্বাচনের মধ্যে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ৩৪টির ফল প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা ২৮টি এবং রিপাবলিকানরা ২০টি গভর্নর পদে জয়ী হয়েছেন বলে প্রকাশিত নির্বাচনী হিসাবের প্রাথমিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। এই হিসাবের মধ্যে আগের আসনগুলিও রয়েছে।

টেক্সাস, আইওয়া, ওহায়োর মতো রিপাবলিকান-শাসিত রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের জয় বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।


এবারের নির্বাচনে কয়েকটি ঐতিহাসিক নজিরও তৈরি হয়েছে।

জর্জিয়ায় কিশা ল্যান্স বটমস প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

টেক্সাসে জিনা হিনোজোসা প্রথম লাতিনা মহিলা গভর্নর হয়েছেন।

মিশিগান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে।

সেনেটে আবদুল এল-সায়েদের জয়কে মার্কিন রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে ক্রিস পাপাস প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ হিসেবে মার্কিন সেনেটে নির্বাচিত হয়েছেন।


নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়াও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি দাবি করেছেন, তিনি নিজে নির্বাচনে প্রার্থী হলে রিপাবলিকানরা বিপুল ব্যবধানে জয়ী হত।

অর্থাৎ, নির্বাচনে পরাজয়ের দায় নিজের উপর নিতে চাননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথোপকথনে অবশ্য ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে ডেমোক্র্যাটদের আনা কোনও বিলের বিরুদ্ধে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।

অন্যদিকে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নির্বাচনের ফলকে সাধারণ মানুষের স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্য এবং মানুষের সমস্যার বাস্তব সমাধান চান ভোটাররা।

 

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রিপাবলিকান পার্টির অন্দরেও নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পদে পুনরায় থাকার চেষ্টা করবেন না বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর জায়গায় নেতৃত্বের দৌড়ে রয়েছেন স্টিভ স্ক্যালিস এবং জিম জর্ডান।

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট শিবিরেও নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী দিনে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত, প্রশাসনিক নিয়োগে বাধা এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা—সবই তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে।

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফল ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্সির বাকি দু’বছরের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিল। ২০২৪ সালে যে জনসমর্থন নিয়ে তিনি হোয়াইট হাউসে ফিরেছিলেন, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই সমর্থনের একটা বড় অংশে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে।

কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে তাঁর প্রশাসনকে এখন বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ডেমোক্র্যাটদের হাতেও এসেছে প্রশাসনের উপর নজরদারি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার সাংবিধানিক সুযোগ।

তবে এই জয়কে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি নিঃশর্ত জনসমর্থন বলে ব্যাখ্যা করার পক্ষপাতী নন দলেরই কয়েকজন নেতা। তাঁদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি অসন্তোষ থেকেই বহু ভোটার ডেমোক্র্যাটদের সুযোগ দিয়েছেন। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে আগামী ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও দলকে সমস্যায় পড়তে হতে পারে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসন বদলের ঘটনা নয়। এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপর একটি বড় নির্বাচনী ধাক্কা এবং মার্কিন রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

Comments :0

Login to leave a comment