দেবাশিস মিথিয়া
ভারতের কৃষি সঙ্কট শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কারণে—তা কিন্তু নয়; এর পেছনে রয়েছে সরকারি নীতির দুর্বলতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনার মতো একাধিক সমস্যা। এই বহুস্তরিক বঞ্চনা ও সঙ্কটের বিরুদ্ধেই বিগত কয়েক বছর ধরে দেশের কৃষকেরা বারে বারে রাজপথে নেমে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। ২০১৮ সালে সারা ভারত কৃষকসভা (এআইকেএস)-র ঐতিহাসিক ‘নাসিক-মুম্বাই পদযাত্রা’ দেশের গণআন্দোলনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের ‘ভেহিক্যাল লং মার্চ’ সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতাই বহন করছে। অহল্যানগর (সাবেক আহমেদনগর) জেলার অকোলে থেকে শুরু হওয়া ১ হাজারের বেশি ট্র্যাক্টর, জিপ ও বাসের লম্বা কনভয় এবং ২০টিরও বেশি জেলা থেকে আসা ১২হাজারের বেশি কৃষকের এই সুশৃঙ্খল ও প্রতিবাদী মিছিল দেশের সরকারের গৃহীত নীতি ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভেতরের ফাটলগুলোকে আরও একবার স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। এই লং মার্চ কৃষকদের লড়াইয়ের এক নতুন কৌশলগত দিককে তুলে ধরেছে।
২০১৮ সালের পদযাত্রাটি ছিল দীর্ঘ ও কষ্টের। এবার নীতিনির্ধারকদের ওপর দ্রুত চাপ সৃষ্টি করতে এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা হাজার হাজার কৃষকের তাড়াতাড়ি যাতায়াত নিশ্চিত করতে নেতৃত্ব তাই মোটর র্যা লির পথ বেছে নেয়। তবে এই বিশাল লং মার্চের ভিত্তি তৈরি করতে ২১ থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত অকোলেতে কৃষকরা অবস্থান বিক্ষোভে বসেন। এই অবস্থান কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য ছিল দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে আসা কৃষক প্রতিনিধিদের মধ্যে সংহতি জোরালো করা এবং সুনির্দিষ্ট দাবির ভিত্তিতে তাঁদের নিয়ে একটা সুশৃঙ্খল ফ্রন্ট গড়ে তোলা। স্থানীয় প্রশাসন ও রাজ্য পুলিশ বেআইনি সমাবেশের দোহাই দিয়ে আইনি নোটিস জারি করলেও আন্দোলনকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করে অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে যান।
অকোলে থেকে যাত্রা শুরু করে পাহাড়ি ও দুর্গম পথ পেরিয়ে মিছিলটি থানে জেলার শাহাপুরের দিকে এগোয়। এই মিছিল এতটাই শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিল যে, রাজ্য সড়কে কোনো বড় ধরনের যানজট তৈরি হয়নি। এই বিষয়টি মানুষের মনে দারুণ প্রভাব ফেলেছে।
১৫ দফা দাবি ও বঞ্চনার ছবি
আন্দোলনকারী কৃষকদের ১৫ দফা দাবি পর্যালোচনা করলে গ্রামীণ অর্থনীতির মূলত পাঁচটি প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত সঙ্কট প্রকট হয়ে ওঠে। প্রথমত, খরায় ফসল হারানোর পর পরিবারপিছু মাত্র ৫হাজার টাকার অপর্যাপ্ত সরকারি সাহায্য কৃষকরা মেনে নেননি। এর বদলে তারা প্রকৃত ক্ষতিপূরণ এবং ‘প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা’ (পিএমএফবিওয়াই)-র বকেয়া অর্থ দ্রুত পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন। বিমার অর্থ না পাওয়ার পেছনে মূলত বেসরকারি বিমা সংস্থাগুলোর মুনাফামুখী নীতি, ক্ষতি নির্ধারণে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক জটিলতাই দায়ী। দ্বিতীয়ত, কৃষকদের সার্বিক ঋণ মকুবের দাবির পাশাপাশি যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন, তাদের জন্য ৫০হাজার টাকা পর্যন্ত বিশেষ উৎসাহ বোনাস দেওয়ার দাবি তোলা হয়েছে। সুদের অতিরিক্ত চাপ, অনিশ্চিত আবহাওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাঙ্কিংয়ের বাইরে মহাজনি ঋণের দাপট এই সঙ্কটকে আরও জটিল করে তুলেছে। তৃতীয়ত, বন অধিকার আইন, ২০০৬ পুরোপুরি কার্যকর করে আদিবাসী ও গ্রামীণ কৃষকদের দীর্ঘদিন ধরে চাষ করা বনভূমি, ট্রাস্টের জমি ও চারণভূমির আইনি পাট্টা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। তবে জেলা ও মহকুমা স্তরের কমিটিগুলোতে দীর্ঘসূত্রতা এবং অযৌক্তিকভাবে দাবি খারিজ করার প্রবণতাই এই অধিকার আদায়ের প্রধান বাধা। চতুর্থত, ‘লাডকি বহিন’ যোজনা থেকে বাদ পড়া ৮১ লাখ মহিলার নাম ফের অন্তর্ভুক্ত করা এবং ‘নমো শেতকারী মহাসম্মান নিধি’-র বকেয়া কিস্তি পরিশোধের দাবি উঠেছে। আধার সংযুক্তিকরণ, পোর্টালের সমস্যা এবং বাধ্যতামূলক ই-কেওয়াইসি-র মতো প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে প্রান্তিক মানুষ প্রায়ই সরকারি সাহায্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পরিশেষে, পেসা (পিইএসএ) আইন বাস্তবায়ন এবং আশা কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও মিড-ডে মিলের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের ন্যূনতম মজুরি ও স্থায়ী সামাজিক সুরক্ষার দাবি জানানো হয়েছে।
সরকারি প্রকল্প বনাম ডিজিটাল বৈষম্য
রাজ্য সরকারের একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত মহারাষ্ট্রের এই আন্দোলনকে আরও উসকে দিয়েছে। একদিকে মুম্বাই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন, সমৃদ্ধি এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা শিল্প করিডোরের মতো মেগা-ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রকল্পের জন্য দ্রুত জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে; অথচ অন্যদিকে বংশপরম্পরায় চাষ করে আসা জমি থেকে আদিবাসী ও প্রান্তিক কৃষকদের উচ্ছেদ না করার আইনি নিশ্চয়তা দিতে চরম প্রশাসনিক অনীহা দেখা যাচ্ছে। সাব-ডিভিসনাল ও জেলা স্তরের কমিটিগুলোতে প্রশাসনিক অজুহাতে হাজার হাজার বৈধ দাবি খারিজ করে দেওয়া তারই প্রমাণ।
শুধু ভূমি অধিকারের এই বঞ্চনাই নয়, প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতায় সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারগুলোও আজ বিপন্ন। ‘ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার’-কে ‘সুশাসন’ হিসাবে প্রচার করা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তা প্রান্তিক মানুষের জন্য এক নতুন প্রশাসনিক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পোর্টাল ত্রুটি, সার্ভার ব্যাকলগ ও বাধ্যতামূলক ই-কেওয়াইসি-র মতো প্রযুক্তিগত বাধার মুখে সামাজিক সুরক্ষার অধিকারগুলো আজ প্রান্তিক মানুষের হাতের বাইরে। ফলে লাখ লাখ দরিদ্র নারী ও কৃষক শুধু ‘প্রযুক্তিগত ত্রুটি’র অজুহাতে সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে চলে যাচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক আন্দোলনের সঙ্গে মিল
মহারাষ্ট্রের ‘ভেহিক্যাল লং মার্চ’-কে শুধু স্থানীয় বা বিচ্ছিন্ন কোনও আন্দোলন হিসাবে দেখার সুযোগ নেই; এটি মূলত বিশ্বব্যাপী কৃষি সঙ্কট ও কৃষকদের প্রতিবাদেরই একটি অংশ। ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা থেকে শুরু করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কৃষকরা যেভাবে সরকারের নীতি ও বড় বড় কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন, মহারাষ্ট্রের এই আন্দোলনের কৌশল ও মূল দাবির সাথে তার গভীর মিল রয়েছে। সম্প্রতি ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম ও পোল্যান্ডে হাজার হাজার কৃষক ট্র্যাক্টর ও অন্যান্য যানবাহন নিয়ে রাজপথ অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন। ইউরোপের কৃষকরা যেভাবে ‘ট্র্যাক্টর’ নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, এআইকেএস-এর ‘ভেহিক্যাল লং মার্চ’-এ ১হাজারেরও বেশি যানবাহনের সুশৃঙ্খল মিছিল যেন তারই প্রতিফলন। নীতিগত দিক থেকেও মিল স্পষ্ট। ইউরোপের কৃষকরা যেমন জ্বালানি ভরতুকি প্রত্যাহার, সস্তা কৃষিপণ্য আমদানি ও সার-জ্বালানির চড়া দামের প্রতিবাদ করছিলেন; তেমনই মহারাষ্ট্রের কৃষকরাও সস্তা আমদানির ঝুঁকি ও প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার অভাব নিয়ে সরব হয়েছেন।
আবার, আন্তর্জাতিক কৃষক মোর্চা ‘লা ভিয়া ক্যাম্পেসিনা’-র বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের সঙ্গেও এই লড়াইয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই মোর্চার অন্যতম প্রধান শক্তি—ব্রাজিলের ভূমিহীন কৃষকদের (এমএসটি) আন্দোলন। তারা যেভাবে বড় বড় এগ্রো-কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে ভিটেমাটি ও জমির আইনি অধিকারের লড়াই চালিয়ে আসছে, ঠিক তেমনি মহারাষ্ট্রের আদিবাসীরাও ‘বন অধিকার আইন’-এর অধীনে বনাঞ্চলের জমির পাট্টা আদায়ের আন্দোলন চালাচ্ছেন। উভয় আন্দোলনেরই মূল উদ্দেশ্য হলো—পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ও জমির অধিকার রক্ষা করা।
তাছাড়া, হঠাৎ হঠাৎ জলবায়ু পরিবর্তন ও বিভিন্ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আজকে বিশ্বজুড়ে কৃষি সঙ্কটকে আরও গভীর করে তুলেছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে ইউরোপে খরা ও বন্যা কিংবা ভারতে এল নিনোর কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও খরা কৃষি উৎপাদনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। একই সঙ্গে, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে তৈরি হয়েছে নতুন আশঙ্কা। ইউরোপের কৃষকরা যেমন দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে অবাধ বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতা করছেন, তেমনই ভারতের কৃষকদের মধ্যেও ভয় রয়েছে যে—এসব চুক্তির মাধ্যমে বহুজাতিক কোম্পানির সস্তা পণ্য বাজারে ঢুকে পড়লে দেশিয় কৃষিব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং, এটি পরিষ্কার যে মহারাষ্ট্রের এই আন্দোলন মূলত বিশ্বব্যাপী কৃষি সঙ্কট, কর্পোরেট আগ্রাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো আন্তর্জাতিক বাস্তবতারই এক প্রতিবাদী রূপ।
আন্দোলনের আঞ্চলিক ভিন্নতা
বিশ্বজুড়ে কৃষকদের প্রতিবাদের সঙ্গে মহারাষ্ট্রের এই আন্দোলনের মিল থাকলেও দেশের ভিতরে কৃষকদের যে লড়াই তাতে একটা বড় ফারাক চোখে পড়ে। ভারতের সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলনগুলো মূলত দুই জায়গায় জোরদার হতে দেখা গেছে—একদিকে উত্তর পশ্চিম ভারতের পাঞ্জাব-হরিয়ানা, অন্যদিকে মহারাষ্ট্র। কিন্তু এই দুই অঞ্চলের দাবিদাওয়া আর আন্দোলন করার পদ্ধতিতে আকাশ-পাতাল তফাত।
উত্তর পশ্চিম ভারতে (যেমন পাঞ্জাব, হরিয়ানা বা পশ্চিম উত্তর প্রদেশে) আন্দোলন গড়ে উঠেছে মূলত সেচনির্ভর উর্বর জমি আর সবুজ বিপ্লবের এলাকায়। সেখানে মাঝারি ও বড় ধনী চাষিদের প্রাধান্য বেশি। ফলে তাদের দাবিগুলোও মূলত সরকারি মান্ডি (এপিএমসি) টিকিয়ে রাখা, সস্তায় বিদ্যুৎ পাওয়া কিংবা ফসলের এমএসপি-র আইনি স্বীকৃতি আদায় করা নিয়ে। আন্দোলনের কায়দাকানুনও বেশ শক্তপোক্ত; নিজেদের ট্র্যাক্টর-ট্রলি নিয়ে রাস্তায় লম্বা সময় ধরে বসে থেকে তারা অবরোধ চালিয়ে যান। আর সামাজিকভাবে এই আন্দোলনগুলোর পেছনে কাজ করে নির্দিষ্ট কিছু কৃষক জাতি ও খাপ পঞ্চায়েতের পুরানো সামাজিক সম্পর্ক।
অন্যদিকে, মহারাষ্ট্রের ছবিটা একদম আলাদা। সেখানকার আন্দোলন গড়ে উঠেছে মূলত খরাপ্রবণ, পাহাড়ি এলাকার গরিব চাষি, আদিবাসী আর ভূমিহীন মজুরদের নিয়ে। তাই তাদের দাবিদাওয়ায় ফসলের দামের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় বন অধিকার আইনের পাট্টা, খরায় ত্রাণ, ঋণ মকুব, পেসা আইন মানা কিংবা ঠিকমতো মজুরি পাওয়া। বড় কোনো গাড়ি বা লজিস্টিক সাপোর্ট হয়তো তাদের থাকে না, কিন্তু সুসংগঠিত কর্মী বাহিনী, দীর্ঘ পদযাত্রা আর নিজেদের মধ্যে দারুণ এক ঐক্য নিয়ে তারা এগোয়। এই আন্দোলনের জোরের জায়গা হল শ্রেণি-চেতনা, বামপন্থী রাজনীতি আর আদিবাসী অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস।
তবে মহারাষ্ট্র বা উত্তর ভারতের বাইরে এমন জোরদার কৃষক আন্দোলন দেখা যায় না কেন—এই প্রশ্নটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। এর পেছনে রয়েছে কিছু বাস্তব কারণ। প্রথমত, তীব্র জাতপাত ও রাজনৈতিক বিভাজন কৃষকদের এক ছাতার নিচে আসতে দেয় না। দ্বিতীয়ত, ধারাবাহিক কাজ করার মতো মজবুত সংগঠনের অভাব। সবচেয়ে বড় কথা, চরম দারিদ্র ও জমির স্বল্পতার কারণে এখানকার কৃষকদের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন চালানোর ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব হয় না; পেটের দায়ে তাঁদের বাধ্য হয়েই অন্য রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ খুঁজতে হয়।
কৃষক আন্দোলনের চাপে নত সরকার
কাসারা ঘাট পেরিয়ে ১০,০০০-এরও বেশি আন্দোলনকারী কৃষক শাহাপুরে পৌঁছে মুম্বাইয়ের আজাদ ময়দান ও প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নিলে রাজ্য সরকার জরুরি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতির রাজনৈতিক গুরুত্ব বিচার করে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশ মুম্বাইয়ে ‘অল ইন্ডিয়া কিষান সভা’-র শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আলোচনায় বসেন। উক্ত বৈঠকে দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী, পাঁচজন বিভাগীয় মন্ত্রী এবং একাধিক প্রধান সচিবরা (অর্থ, কৃষি, রাজস্ব ও বন দপ্তর) উপস্থিত ছিলেন। প্রায় ছয় ঘণ্টার টানা আলোচনার পর রাজ্য সরকার আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলোর অধিকাংশই মেনে নেয় এবং লিখিত আশ্বাস দেয়। লিখিত প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যতম হলো—ই-কেওয়াইসি ত্রুটির কারণে বাদ পড়া মহিলাদের পুনরায় ‘লাডকি বহিন’ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা। পাশাপাশি, বনাঞ্চল, দেবস্থান ও চারণভূমির জমি-জট কাটাতে সুনির্দিষ্ট সরকারি প্রস্তাব জারি এবং প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের আশ্বাসও দেওয়া হয়। এছাড়াও খরার ত্রাণ পুনর্মূল্যায়ন, ব্যাঙ্ক ঋণের জোরজবরদস্তি আদায় বন্ধ রাখা, নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী কৃষকদের আর্থিক সুবিধা পুনর্বিবেচনা করা, মিড-ডে মিল কর্মীদের অনুমোদিত ১,০০০ টাকা ভাতা বৃদ্ধির দ্রুত বাস্তবায়ন এবং নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য ‘স্বাস্থ্য বিমা’ চালু করার বিষয়েও রাজ্য সরকার সম্মতি দেয়।
সরকারের কাছ থেকে ইতিবাচক ও লিখিত প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পর, এআইকেএস নেতৃত্ব তাঁদের পূর্বঘোষিত মুম্বাই যাত্রা কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে কৃষক নেতৃত্ব স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে এটি আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাহার নয়। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোনও অনীহা দেখা গেলে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর আন্দোলনে নামা হবে -সেই হুঁশিয়ারিও দিয়ে রাখা হয়েছে। প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিগুলো মাঠপর্যায়ে কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করতে আগামী দিনে সরকার ও কৃষক প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
মহারাষ্ট্রের এই ভেহিক্যাল লং মার্চ প্রমাণ করে দিয়েছে, বড় ধরনের কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য ধনী কৃষক হতে হয় না; গরিব ও প্রান্তিক কৃষকেরাও সফল আন্দোলন করতে পারে। সঠিক রাজনৈতিক চেতনা, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং বন অধিকার ও শ্রম সুরক্ষার মতো জীবন-জীবিকার মৌলিক দাবিগুলোকে একসঙ্গে মেলাতে পারলে অত্যন্ত দরিদ্র, আদিবাসী ও প্রান্তিক চাষিরাও রাষ্ট্রশক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের দাবি আদায় করতে পারে। নীতিগত দিক থেকে এই আন্দোলন কেবল তাৎক্ষণিক কোনও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং তা প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র, ডিজিটাল বৈষম্য এবং চুক্তিভিত্তিক শ্রম শোষণের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর সঙ্কটগুলোকে সরাসরি চিহ্নিত করেছে।
Comments :0