ধূপগুড়িকে পূর্ণাঙ্গ মহকুমা হিসেবে কার্যকর করা, সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসানের দাবিতে শুক্রবার উত্তাল হয়ে উঠল ধূপগুড়ি। ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের ডাকে মহকুমা শাসকের দপ্তর অভিযান ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেন শত শত যুবক-যুবতী। প্রশাসনিক পরিকাঠামোর অভাব, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য পরিষেবা, বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান-সহ মোট আট দফা দাবিতে এদিন স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়।
এদিন সকাল থেকেই ধূপগুড়ি যুব দপ্তর ‘কমরেড সুধীর বসাক ভবন’ চত্বরে জমায়েত হতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। সেখান থেকে একটি বিশাল মিছিল ধূপগুড়ি শহরের চৌপথী, থানা রোড, পৌর অফিস মোড় পরিক্রমা করে মহকুমা শাসকের কার্যালয়ের উদ্দেশে রওনা দেয়। মিছিল জুড়ে ওঠে প্রশাসনিক অবহেলা, বেকারত্ব, বন্যা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান। শহরের রাজপথে এই মিছিল ঘিরে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও সমর্থন ছিল চোখে পড়ার মতো।
মিছিল মহকুমা শাসকের দপ্তরের সামনে পৌঁছালে আন্দোলনকারীরা দপ্তরের ভিতরে ঢুকে স্মারকলিপি জমা ও প্রতিবাদ জানাতে চাইলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে পথ আটকায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনের তরফে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এরপর পুলিশের ব্যারিকেডের সামনেই রাস্তায় বসে পড়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিক্ষোভে শামিল হন ডিওয়াইএফআই কর্মী-সমর্থকরা। ধূপগুড়ি মহকুমার অন্তর্গত চারটি লোকাল কমিটি থেকে আসা কয়েকশো যুবক-যুবতী এই আন্দোলনে অংশ নেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ধূপগুড়িকে মহকুমা হিসেবে ঘোষণা করা হলেও আজও পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে সাধারণ মানুষকে এখনও জলপাইগুড়ি বা অন্যত্র ছুটতে হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজের জন্য। স্বাস্থ্য পরিষেবার করুণ অবস্থাও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, সার্বক্ষণিক এক্স-রে ও জরুরি পরিষেবার অভাবের কথা তুলে ধরে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এদিনের কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্মাল্য ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘ধূপগুড়ি ও বানারহাট এলাকার মানুষ বছরের পর বছর ধরে বন্যার কারণে জর্জরিত। হাতিনালা সংস্কার না হওয়ায় প্রতি বর্ষায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়, তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি, নষ্ট হয় চাষের জমি। অবিলম্বে হাতিনালা সংস্কার করে বন্যার স্থায়ী সমাধান এবং দুর্গত মানুষের স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।’’
স্মারকলিপিতে উত্তরের প্রাণ ‘জল-জঙ্গল-জমি’ রক্ষার দাবি জোরালোভাবে তোলা হয়। চা বাগান ধ্বংসের চক্রান্ত বন্ধ করা, শ্রমিকদের কাজ ও ন্যায্য মজুরি সুনিশ্চিত করা এবং পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা দাবি করা হয়। পাশাপাশি ধূপগুড়ি শহরকে আবর্জনামুক্ত করতে আধুনিক ডাম্পিং গ্রাউন্ড নির্মাণ এবং পরিকল্পিত পৌর পরিষেবা চালুর দাবিও জানানো হয়।
ডিওয়াইএফআই রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সপ্তর্ষি দেব বলেন, ‘‘চার মাস আগে হোগলারটারি এলাকায় ভয়াবহ বন্যায় ঘরছাড়া হওয়া অন্তত ২০টি পরিবার আজও প্লাস্টিকের ত্রিপলের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। সরকারি আবাসন যোজনার ঢাকঢোল পেটানো হলেও বাস্তবে মানুষ গৃহহীন। রাজ্য জুড়ে এসআইআর’র হেয়ারিং চলছে জনগণ এবার মমতার হেয়ারিং করবে।’’ বক্তব্যের শেষে তিনি আই-প্যাক অফিসে ইডির তল্লাশির প্রসঙ্গ তুলে রাজ্য সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, দুর্নীতির তথ্য লোপাটের চেষ্টা চলছে।
এদিনের কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন ডিওয়াইএফআই জেলা সম্পাদক বেদব্রত ঘোষ, সভাপতি অর্পণ পাল, বলাই বসাক, মায়া রায়-সহ সংগঠনের একাধিক নেতৃত্ব।
মহকুমা শাসকের অনুপস্থিতিতে দপ্তরের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক স্মারকলিপি গ্রহণ করেন এবং বিষয়গুলি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর আশ্বাস দেন। তবে ডিওয়াইএফআই নেতৃত্ব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, দ্রুত দাবি পূরণ না হলে আগামী দিনে ধূপগুড়ি মহকুমা জুড়ে আরও বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এদিনের অভিযানকে কেন্দ্র করে ধূপগুড়ি শহর জুড়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ছিল তুঙ্গে।
Comments :0