যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক শিক্ষাকর্মীদের প্রতিহিংসামূলক বদলি করতে কিছুদিন আগেই বিধানসভায় একটি বিল পাশ করাতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্রি প্যালেস্তাইন স্লোগান চলবে না। কড়া ওষুধ দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু কয়েকটা দিন পার হতে না হতেই মাদ্রাজ হাইকোর্ট অন্য একটি মামলায় স্পষ্ট জানিয়ে দিল প্যালেস্তাইনের মানুষের স্বাধীনতার সমর্থনে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দেওয়াকে অপরাধ হিসাবে গণ্য করা যায় না। রায়ে এমনই জানিয়ে একবছর আগে ১৪ জনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি ফৌজদারি মামলা খারিজ করে দিয়েছে মাদ্রাজ হাইকোর্ট। বিচারপতি জি কে ইলানথিরাইয়ান বলেছেন, অভিযুক্তরা কোনও অপরাধমূলক শক্তি প্রয়োগ করেননি, দুষ্কর্মে যুক্ত হননি, সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করেননি কিংবা কাউকে অন্যায়ভাবে বাধা দেননি। ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৮৯(২) এবং ১২৬(২) ধারার অভিযোগের প্রয়োজনীয় উপাদানও নেই।
স্পষ্টভাবেই বিচারবিভাগ বুঝিয়ে দিয়েছে, ভারতীয় আইনে ফ্রি প্যালেস্তাইন স্লোগান দেওয়া, দেওয়াল লেখা বা অনুরূপ কোনোভাবে প্যালেস্তাইনের পক্ষে সরব হওয়াকে কখনোই অপরাধ বলা যায় না। তাহলে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় যে মন্তব্য করেছেন, যাকে হুমকি বললেও অত্যুক্তি হয় না, তার আইনি ভিত্তি কী? নেই। এতটুকুও নেই। অর্থাৎ স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী সম্পূর্ণ বেআইনি হুমকি দিয়েছেন। রাজ্যে একের পর এক নানা ধরনের অপরাধ হচ্ছে, সেগুলি ঠেকাতে পুলিশ প্রশাসনকে কার্যকর ও তৎপর করতে সরকারের কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে ফ্রি প্যালেস্তাইন, আজাদি ইত্যাদি স্লোগান দেওয়া প্রতিবাদী তরুণ সমাজকে দিমাগি নকশাল বলে হেনস্তার চেষ্টা চলছে। স্বয়ং সরকারের এই কাজের যে কোনও আইনি ভিত্তি নেই তা আগেও বহুবার প্রমাণিত হয়েছে, মাদ্রাজ হাইকোর্টে আবারও প্রমাণিত হলো। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূরণে মরিয়া আরএসএস বিজেপি এর থেকে কোনও শিক্ষা নেবে এমন প্রত্যাশা করা কঠিন। শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে নয়, বৃহৎ সংবাদমাধ্যমের মতো প্রতিষ্ঠানগুলিকেও দখলদারির আওতায় এনে তারা রাষ্ট্রদ্রোহী, জেহাদি, সন্ত্রাসবাদী ইত্যাদি প্রচার চালাচ্ছে সরকারের সমালোচনাকারীদের। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের খবর সম্প্রচারের সময় প্যালেস্তাইনের পক্ষে এবং গাজা গণহত্যার বিরুদ্ধে তাদের দেওয়া স্লোগানকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন এবং উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করেছিল জি নিউজ। ছাত্রদের অভিযোগের তদন্ত করে এরজন্য জি নিউজকে ২ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছে ‘নিউজ ব্রডকাস্টিং অ্যান্ড ডিজিটাল স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি’ (এনবিডিএসএ)।
স্লোগান হোক বা দেওয়াল লিখন, তার আইনি অধিকার ছাড়াও একটি নৈতিক ভিত্তি থাকা উচিত। অর্থাৎ ফৌজদারি শাস্তি না হলেও কিছু কাজ নিন্দনীয় হতেই পারে। ফ্রি প্যালেস্তাইনের কথা বলা কি তেমন কোনও অনৈতিক কাজ? রবিবারই ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের সম্মেলনের আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্যালেস্তাইনের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে ভারতের ঐতিহ্যগত অবস্থান বজায় থাকছে। অর্থাৎ প্যালেস্তাইনের স্বাধীনতার পক্ষে, ইজরায়েলের দখলদারি মুক্ত ভূমির পক্ষে, গাজায় সংঘর্ষ বন্ধের দাবিতে ১৯৬৭ সাল থেকে ভারতের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী যে অবস্থান অন্তত পক্ষে প্রকাশ্যে মোদী সরকার এখনও তাই বজায় রাখছে। এটা শুধু ভারত নয়, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেরই অবস্থান এরকমই। সাম্রাজ্যবাদী দখলদারির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম করে মুক্ত হওয়া ভারতবাসী যদি এর পরেও ফ্রি প্যালেস্তাইন স্লোগান দেয় তাহলে তা কি নিন্দনীয় হতে পারে? বরং যারা ফ্রি প্যালেস্তাইন স্লোগানের বিরোধিতা করছে, নিন্দনীয় কাজ তারাই করছে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিপরীত পথে তারাই হাঁটছে।
Comments :0