গৌতম রায়
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তাদের এই রাজনৈতিক কর্মসূচিকে জনমানসে তুলে ধরেছে নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি’র মাধ্যমে। এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কার্যক্রমের মধ্যে প্রথম থেকেই আরএসএস লুকিয়ে রেখেছিল দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদী মানসিকতাকে প্রয়োগ করার ভয়ঙ্কর একটা প্রবণতা। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন তৃতীয় দফা বিজেপি পরিচালনাধীন এনডিএ সরকারের যে এক দেশ - এক ভোট— ভাবনা, সেই ভাবনার সঙ্গেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধির ফ্যাসিবাদী মানসিকতার এক অদ্ভুত সম্মিলিত প্রবণতা আছে।
ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর সেই ধ্বংসস্তূপের উপর রাম মন্দির নির্মাণ। সংবিধানের ৩৭০ ধারার অবলুপ্তি। তারপর অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চাপানো ইত্যাদি— এই যে সঙ্ঘের গোপন কর্মসূচিগুলি ছিল, তারা তাদের সমস্ত ধরনের সংগঠনকে কাজে লাগিয়ে একে একে এগুলিকে বাস্তবায়িত করবার পথে এগিয়েছে। নরেন্দ্র মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন; এসব কোনও কর্মসূচিই তাদের গোপন কর্মসূচি নয়। কেন্দ্রে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের যতখানি শক্তি অর্জিত হবে, তার ভিত্তিতে তারা একের পর এক এইসব কর্মসূচিকে বাস্তবায়িত করবেন।
বস্তুত আরএসএস’র মূল লক্ষ্য; রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপন করা। আর সেই রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু সমস্ত মানুষই হবেন, রাজনৈতিক হিন্দুদের অধীনস্ত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। সময়ের নিরিখে সেই পথেই তারা হাঁটছে।
মোদীর দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রিত্ব কালে বিজেপি’র একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। আমরা দেখেছি দ্বিতীয় দফায় মন্ত্রীসভা গঠনের পর, সংসদের প্রথম অধিবেশনে, কিভাবে একটা প্রচণ্ড গোপনীয়তা এবং রহস্যময় পরিবেশের মধ্যে দিয়ে বিজেপি সংবিধানের ৩৭০ ধারা এবং ৩৫ এর ‘ক’ ধারার অবলুপ্তি ঘটিয়েছে। এই সময়েই তারা বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের উপরে রাম মন্দিরও নির্মাণ করেছে।
তৃতীয় দফায় সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে বিজেপি’র একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। এতদিন পর্যন্ত তেলেগু দেশম ইত্যাদি যে দলগুলির সহযোগিতায় মোদী সরকার পরিচালনা করতেন, আঞ্চলিক স্তরে সেই দলগুলির যথেষ্ট জনভিত্তি আছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচন ঘটে যাওয়ার পর যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেই অপারেশন লোটাসের জেরে, তৃণমূলের টিকিটে জেতা সাংসদদের তারা নিজেদের শিবিরে আনতে পেরেছে। কালীঘাট তৃণমূলত্যাগী সাংসদদের মূল লক্ষ্য, ২০২৯ সাল পর্যন্ত তাদের সাংসদ পদ টিকিয়ে রাখা। সেই সঙ্গে ২০২৯ এর ভোটে হয় সরাসরি বিজেপি, নয়তো বিজেপি সমর্থিত প্রার্থী হয়ে আবার সাংসদ হওয়ার চেষ্টা। নিজেদের এলাকায় তাদের বিন্দুমাত্র জনভিত্তি নেই। তাই লোকসভার সদস্য পদে ইস্তফা দিয়ে আবার ভোটে দাঁড়িয়ে, নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাই করে নেওয়ার মতো রাজনৈতিক সাহস বা সততা এদের নেই। আর ঠিক এই কারণেই, আরএসএস’র রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি, সঙ্ঘের রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলিকে বাস্তবায়িত করবার লক্ষ্যে তাদের নিজেদের শিবির ভুক্ত করতে উঠে পড়ে লেগেছে।
এইরকম একটা অবস্থায়, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি রাজ্যপাটে বসে তাদের রাজনৈতিক মস্তিষ্ক আরএসএস’র কর্মসূচি, অভিন্ন দেওয়ানি বিধিকে এই রাজ্যে চালু করতে আদা জল খেয়ে নেমে পড়েছে। সঙ্ঘ পরিবার অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কথা বললেও, আসলে এর একমাত্র লক্ষ্য হলো মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। ব্যক্তিগত আইনের সুযোগ কেবলমাত্র মুসলমান সমাজই ভোগ করে, আর এই ব্যক্তি আইনের সুযোগে বহু বিবাহ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ সহ বহু বিষয়ে বিশেষ সুবিধা পায়– এটাই আরএসএস’র প্রচার। এই ক্ষেত্রে মুসলমান সমাজ ছাড়াও তাদের অন্যতম টার্গেট হলেন সংবিধান প্রণয়েতা আম্বেদকর এবং জওহরলাল নেহরু। হিন্দুত্ববাদীদের প্রচার; মূলত এই দু’জনই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে হিন্দুদের বঞ্চিত করে মুসলমানদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে তাঁদের ব্যক্তিগত আইনের সুযোগ দিয়েছেন। তাদের এই আপত্তির কারণের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে, ‘হিন্দু কোড বিল’ ঘিরে হিন্দুত্ববাদীদের, বিশেষ করে তাদের আইকন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অসংযত আচরণ।
হিন্দু কোড বিল ঘিরে শ্যামাপ্রসাদের অসংযত আচরণের অনেক লিখিত নথি রয়েছে। কলকাতার ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে হিন্দু কোড বিল ঘিরে, সরোজিনী নাইডুর সভা বানচাল করতে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকার কথাও উল্লেখিত। পরবর্তী সময়ে কিছু রাজনৈতিক হিন্দু ধর্মগুরুর কথায় যে প্রতিবেশী সমাজ সম্পর্কে হীন ঈর্ষার বিষয় উঠে আসে, তা থেকেই বুঝতে পারা যায় হিন্দু কোড বিল ঘিরে রাজনৈতিক হিন্দুদের আপত্তির আসল কারণটা।
মুসলমান সমাজ সহ ভারতের আরও অনেক ধর্মীয় এবং নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষ যে এই ব্যক্তিগত আইনের আওতায় রয়েছে, সেটা হিন্দুত্ববাদীরা প্রকাশ্যে আনতে চায় না। ব্যক্তিগত আইনের সুযোগ কেবলমাত্র মুসলমানেরাই পায়, সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা বহু বিবাহ করে, নারীকে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, এমন প্রচার করে মুসলমান সমাজকে ভুল ভাবে উপস্থাপিত করে থাকে। অথচ ভারতের প্রত্যেকটি ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীরই ব্যক্তিগত আইন আছে। ভারতের সংবিধান নির্দেশিত ধারাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও যে দেওয়ানি আইনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আইনের সুযোগ পায়, আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের ব্যক্তিগত আইনের সুযোগ পায়, এসব সত্যকে তারা একদম লুকিয়ে রেখেছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। ১৯৪৭ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের কালে ভারতের তৎকালীন নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ব্রিটিশের ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি চুক্তি হয়। সেই চুক্তিতে স্পষ্টত উল্লেখ ছিল; ভারতের সমস্ত ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং নৃতাত্ত্বিক যেসব গোষ্ঠী রয়েছে, ব্রিটিশ শাসনে তারা যেসব ব্যক্তিগত আইনের সুযোগ পেত, স্বাধীন ভারতেও তাঁরা সেইসব আইনের প্রতিটি বিষয়বস্তু ভোগ করার পরিপূর্ণ সুযোগ পাবে।
ক্ষমতা হস্তান্তরের সেই চুক্তির উপর ভিত্তি করেই কিন্তু আমাদের দেশের সংবিধান রচিত হয়েছে। যে কোনও ধরনের সংখ্যালঘুর ব্যক্তিগত আইনের সুযোগ কেড়ে নেওয়ার অর্থ কিন্তু কেবলমাত্র দেশের সংবিধানকে অস্বীকার করাই নয়। ব্রিটিশের সঙ্গে ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তরের চুক্তিকেও অস্বীকার করা। তার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্ষমতা হস্তান্তরের চুক্তিকে অস্বীকার করে সংখ্যালঘুর ব্যক্তিগত আইনের অবলুপ্তি ঘটালে, যে ক্ষমতা হস্তান্তরের চুক্তির উপর ভিত্তি করে আমাদের দেশের সংবিধান রচিত হয়েছ, যে সংবিধানের নামে শপথ নিয়ে কেন্দ্রে বা রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ট দল বিজেপি সরকার পরিচালনা করছে, সংবিধানকে অস্বীকার করবার মধ্যে দিয়ে সরকারের সাংবিধানিক অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে।
দেওয়ানি বিধিতে কি প্রচলিত হিন্দু সমাজের কোনও অভিন্নতা আছে? পশ্চিমবঙ্গের একজন ‘হিন্দু’ উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রে যে সব ‘সুযোগ’ পায়, ঠিক একই সুযোগ কি উত্তর ভারতের একজন হিন্দু পান? রাজস্থানের একজন ‘হিন্দু’, অবিভক্ত হিন্দু পরিবার আইনে’র সুযোগ নিয়ে যেভাবে পরিবারের মেয়েদের, বিশেষ করে পরিবারের বিধবা, বিবাহিত, স্বামী পরিত্যক্তা মেয়েদের পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে, তা নিয়ে কোনও সময়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির একটা কথাও বলেছে?
শ্যামাপ্রসাদ সহ গোটা হিন্দুত্ববাদী শক্তি চিরদিন চেয়েছিল; পুরুষতান্ত্রিক শাসনের অন্তর্গত থাকুক হিন্দু নারীরা। আঁতুরঘর, হেঁশেল আর ঠাকুরঘরের বাইরে হিন্দুনারীদের কোনও গতিবিধি হিন্দুত্ববাদীরা অনুমোদন করতে পারেনি বলেই তারা পণ্ডিত নেহরুর পরিকল্পিত, বামপন্থীদের সমর্থিত হিন্দু কোড বিলকে সমর্থন করতে পারেনি।
১৯৫৬ সালে পণ্ডিত নেহরুর সময়ে হিন্দু উত্তরাধিকারের সংশোধনের পরেও কি উত্তরভারতে ‘মিতাক্ষরা’ আইন অনুযায়ী হিন্দু সমাজের উত্তরাধিকার নির্ধারিত আজও হয় না? এই আইনে পুত্র জন্মানো মাত্রই সে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। ফলে আজও হিন্দি বলয়ের বহু জায়গাতে পরিবারের বৃদ্ধ, বৃদ্ধাদের ওপরে অমানবিক নির্যাতন চালায় তাদের সন্তানেরা। সামাজিক পরিবেশ ঘিরে আলোচনায় হিন্দি বলয়ে আজও বহু বিত্তশালী এবং নিম্ন আয়ের পরিবারেও সামর্থ্যবান পুরুষের পরিবারের বৃদ্ধদের উপর অবর্ণনীয় আর্থিক নির্যাতনের কাহিনি সংবাদ মাধ্যমে মাঝে মাঝে উঠে আসে।
গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলের হিন্দুদের উত্তরাধিকার আইন মৃলত ‘দায়ভাগ’ অনুসারী। জিমূতবাহন হলেন এই ‘দায়ভাগ’ এর নির্মাতা। নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতকের মানুষ এই জীমূতবাহন। দায়ভাগে পিতার জীবিতাবস্থায় সন্তান কখনো পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে না।
১৯৫৬ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, হিন্দু উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে একটা আপাত সমতা আনবার চেষ্টা করলেও আজও ভারতীয় হিন্দু সমাজে দায়ভাগ ও মিতাক্ষরার ব্যবহার অবলুপ্ত হয়ে যায়নি। যেমন অবলুপ্ত হয়নি, অবিভক্ত হিন্দু পরিবার আইন।
হিন্দু সমাজেই যখন এখনো পর্যন্ত ব্যক্তিগত আইন ঘিরে এতো বিভিন্নতা তখন ১৯৪৭-এর ক্ষমতা হস্তান্তরের চুক্তিকে অস্বীকার করে, ভারতের সংবিধানকে অস্বীকার করে, আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি’র এখনো পর্যন্ত রাজ্যওয়ারি ইউসিসি আনার একমাত্র লক্ষ্য হলো; মুসলমান সমাজকে বেনাগরিক করতে তাদের যে টার্গেট, সেই পথে আর এক ধাপ অগ্রসর হওয়া।
পশ্চিমবঙ্গে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকার ইউসিসি জারি করবার কথা বলছে। তাদের সেই প্রস্তাবিত আইনে আদিবাসী সমাজ অন্তর্ভুক্ত হবে না— একথাও প্রাথমিকভাবে তারা বলেছে। পশ্চিমবঙ্গে প্রস্তাবিত আইনে আদিবাসী সমাজকে সংযুক্ত না করবার কথার মধ্যে দিয়েই তারা স্বীকার করে নিয়েছে, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত আইন বলবৎ থাকার যৌক্তিকতাকে।
ফৌজদারী আইনের ক্ষেত্রে ধর্ম, নৃতাত্বিক পরিচয় ঘিরে যে ভারতে সার্বিক ভাবে এক আইন সকলের জন্যে বলবৎ, সেকথাটা কখনোই হিন্দুত্ববাদীরা বলে না। দেওয়ানি আইন পরিবর্তন কি সংবিধান সংশোধন ব্যাতীত সম্ভব? দেওয়ানি আইন বদলের অধিকার কি আমাদের সংবিধান আদৌ কোনও অঙ্গরাজ্যকে দিয়েছে? এককথায় উত্তর, না। দেওয়ানি আইন পরিবর্তনের একমাত্র অধিকার আছে সংসদের দুই কক্ষের। কোনও রাজ্যের বিধানসভার অধিকার এবং ক্ষমতা, কোনোটাই নেই কেবলমাত্র সংশ্লিষ্ট রাজ্যের দেওয়ানি আইন বদলের। কোনও রাজ্য সরকার যদি গায়ের জোরে, অর্থাৎ; সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেটা করে, যেমনটা করেছে বিজেপি নেতৃত্বধীন উত্তরাখণ্ড সরকার, তবে তা হবে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক। পশ্চিমবঙ্গেও সেই চেষ্টাই করছে বিজেপি।
Comments :0