জয়ন্ত সাহা: মাথাভাঙা
জেসিআই কোচবিহার জেলায় পাট কিনতে হাটে নামেনি।চাষের খরচ বাড়ছে হু হু করে। মিলছে না আশানুরুপ পাটের দাম। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে প্রশ্ন একটাই, ‘‘আদৌ ফিরবে কি সোনালী তন্তুর স্বর্ণযুগ! ’’ জেলার বিপন্ন দু লক্ষ পাটচাষীদের পাশে দাঁড়ালো সারা ভারত কৃষকসভা। দাবি উঠলো পাটের ন্যুনতম দাম ১৫ হাজার টাকা কুইন্টাল ঘোষণা করুক জেসিআই।
সোনার মত রং ছড়ায় পাটের আঁশ। তাই পাটের আরেক নাম সোনালী তন্তু। কিন্তু দামের অনিশ্চয়তায় সেই সোনালী তন্তুর চাষ যারা করেন তাদের জীবনে নেই কোন উজ্জ্বলতাই। বরং পাটচাষীদের জীবনকে গ্রাস করছে হতাশা। বাজারে এক কুইন্টাল উচ্চমানের পাটের দাম মিলছে ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা। হাড়ভাঙা খাটুনি পাটচাষে। মাথায় হাত পাটচাষীদের।
বিস্তর কষ্ট সহ্য করে পাট চাষ করতেন কোচবিহারের অশ্বীনি রায়কায়েত, পরিমল রায়ের মত অনেকেই। যথাযথ দাম মেলে না। তাই ওদের মত অনেকেই মুখ ফিরিয়েছেন পাটচাষ থেকে। পাট চাষে উৎসাহ দিতে কৃষি দপ্তর মাঠে নামলেও সরকারি তথ্য বলছে, এক সময়ে কোচবিহারে ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হত।এখন সেটা নেমে এসেছে ৩৫-৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে! পাটের জায়গার দখল নিচ্ছে ভুট্টা। অবশ্য সেখানেও ফসলের দামের গ্যারান্টি নেই, সেটা মানছেন পাট থেকে ভুট্টায় যাওয়া সনাতন দাসের মত কৃষকও।
কৃষকসভার জেলা সম্পাদক আকিক হাসান বুধবার বলেন, এক সময়ে জেসিআই জেলার বিভিন্ন প্রান্তে শিবির করে পাট কিনতো। সিতাই, শিতলখুচি, তুফানগঞ্জ, ভেটাগুড়িতে জেসিআইয়ের পাট কেনা বন্ধ হয়ে গেছে আগেই। মাথাভাঙার শিকারপুর, দিনহাটার চওড়াহাট, মেখলিগঞ্জের চ্যাংরাবান্ধায় পাট কেনা হয়েছে গত মরসুমে। রাজ্যে ডাবল ইঞ্জিন সরকার আসার পরে জেলার কোন শিবির থেকেই এক কুইন্টাল পাটও কেনে নি! ফলে চলতি মরশুমে পাট বাজারে আসার সময় যতটা দাম মিলছিল চলতি সপ্তাহে দাম এক লাফে অনেকটাই কমে গেছে। পাটচাষীদের বাঁচাতে পাটের বিক্রয় মূল্য বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন ছাড়া বিকল্প পথ খোলা নেই।
কেন্দ্রীয় সরকার যে পাটচাষিদের নিয়ে ভাবছেই না তার বড় প্রমান তাদের প্রকাশিত মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইজ বা এমআরপি! মোটামুটি ৫ রকম গুনমানের পাট বাজারে আসে। জেসিআই সর্বোচ্চ গুনমানের পাটের এমআরপি ঘোষণা করেছে ৬ হাজার ৫২৫ টাকা কুইন্টাল আর সর্বোনিম্ন গুনমানের পাটের এমআরপি ৫ হাজার ৩২৫ টাকা কুইন্টাল। কৃষকসভার দাবি পাটের দাম ১৫ হাজার টাকা কুইন্টাল ঘোষণা করুক সরকার। তবেই বাঁচবে লক্ষ লক্ষ পাটচাষী।
কৃষকসভার দাবির সাথে একমত দিনহাটা ১ব্লকের হরিশ রায়ের মত পাটচাষীও। তাঁর বক্তব্য এক বিঘা জমি থেকে বড়জোর দুই থেকে আড়াই কুইন্টাল পাট উৎপন্ন হয়। এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতেই দশ হাজার টাকা বেড়িয়ে যায়। এবারে ফলন কম হয়েছে। অনেকেই পাট চাষ করে নি। আমার দু বিঘা জমিতে পাট চাষ করে ৪ কুইন্টাল পাট পেয়েছি। প্রায় ৬ মাস গোটা পরিবার পাটের জমিতে কাজ করে খরচ বাদ দিয়ে ২০ হাজার টাকা ঘরে তুলেছি। এই টাকায় সংসার চলবে কি করে! ভাবছি আগামী মরশুমে আর পাট চাষ করবো না।
সাতমাইলের পাটচাষী গনেশ বর্মন দু বছর আগেও ৫ বিঘা জমিতে পাট চাষ করতেন। এবারে মাত্র দেড়বিঘা জমিতে পাটচাষ করেছেন। তিনিও এবারেই পাটচাষে ইতি টানতে চাইছেন!
জেলার কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে মার্চ মাসের শুরু থেকেই পাটের চাষ শুরু হয়। আগষ্ট- সেপ্টেম্বরের মধ্যে কৃষকের ঘরে ওঠে পাট। জেলার প্রায় দু লক্ষ কৃষক পাট চাষের সাথে যুক্ত। এছাড়াও পাটজাত দ্রব্য উৎপাদন এবং পাটের ব্যবসায় জড়িয়ে আছে অনেক পরিবার।
কৃষকসভার জেলা সভাপতি বিপীন শীল বলেন, কোচবিহারের কৃষি বলয়ের অর্থনীতিকে চাঙা করতে সরকার চাইলেই পাটকেন্দ্রিক শিল্প গড়তে পারতো।সেকাজ গত ১৫ বছরে হয় নি। উলটে চকচকায় পাটজাত শিল্পের জন্য যে জমি বামফ্রন্ট সরকার চিহ্নিত করে রেখেছিল সে জমি অন্য শিল্পোদ্যোগীদের বিলি করে দিয়েছে। সেখানে অন্য শিল্পও গড়ে ওঠে নি। অথচ প্লাস্টিকের বিকল্প হতে পারতো পাট। পাট থেকে শুধু দড়ি, ব্যাগ বা বস্তা নয়। বাহারি কার্পেট, কুশন কভার,পর্দার কাপড়, উলের সঙ্গে মিশিয়ে গরম কাপড়ে তৈরি হয়।বিশ্বের বাজারে যার প্রচুর চাহিদা। আমাদের দাবি পাটজাত শিল্প গড়া হোক জেলার দু লক্ষ পাটচাষীর স্বার্থে।
Comments :0