ড. হামিদ দাভোলকর
কলকাতা শুধু একটি বড় মহানগরই নয়। ভারতের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে বাংলা আর কলকাতার বিশেষ জায়গা রয়েছে। সতীদাহ, জাতিভেদ এবং নানা পশ্চাৎপদ সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে রাজা রামমোহন রায়ের সংগ্রাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদী ভাবনা এবং স্বামী বিবেকানন্দের যুক্তিবোধ, আত্মবিশ্বাস ও মানবসেবার বার্তা বাংলার এক শক্তিশালী বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার। এই প্রেক্ষাপটে আজ কুসংস্কার, অলৌকিকতা এবং ধর্মের নামে রাজনৈতিক মেরুকরণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা গভীরভাবে ভাবার দাবি রাখে।
পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে। নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার এবং ধর্মগুরুদের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগানোর প্রবণতা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটেই সম্প্রতি বাংলায় বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর কর্মসূচি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা চলছে। দুর্গাপুজোর সময় তিনি বাঙালি সমাজকে মাছ-মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরে তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ দায়ের হয়েছে, পাশাপাশি তাঁর সমর্থনেও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে।
এই বিতর্ক কেবল মানুষ মাছ-মাংস খাবেন কি না, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বৃহত্তর প্রশ্ন হলো, বাংলার মানুষ কী খাবেন, কীভাবে জীবনযাপন করবেন এবং কোন ঐতিহ্য অনুসরণ করবেন, তা ঠিক করার অধিকার কার? কোনও ধর্মীয় নেতার ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে সামাজিক নীতি বা সর্বজনীন নৈতিকতার মর্যাদা দেওয়া গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে।
বাগেশ্বর ধামের সঙ্গে যুক্ত ‘দিব্য দরবার’-কে ঘিরে মানুষের মনের কথা পড়ে ফেলা, তথাকথিত ভূত-প্রেত বা অশুভ শক্তির প্রভাব দূর করা এবং অলৌকিক উপায়ে রোগ নির্ণয়ের মতো নানা দাবি সামনে এসেছে। এই ধরনের দাবির বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা হওয়া জরুরি। বিশ্বাস ব্যক্তিগত অধিকারের বিষয় হতে পারে। কিন্তু প্রকাশ্যে অলৌকিক ক্ষমতার দাবি—বিশেষত যখন তা অসুস্থতা, মানসিক যন্ত্রণা বা পারিবারিক সঙ্কটের সঙ্গে যুক্ত হয়—মানুষকে প্রতারণার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা নেওয়া থেকে বিরত করতে পারে।
এই কারণেই ২০১৩ সালে মহারাষ্ট্রে মানব বলি সহ অন্যান্য অমানবিক, ক্ষতিকর ও তন্ত্র-মন্ত্রনির্ভর কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথার বিরুদ্ধে আইন করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গেও অতীতে কালাজাদু ও ডাইনি নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে রাজ্যস্তরে আলোচনা হয়েছে।
তবে শুধু আইন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কুসংস্কার যেন রাজনৈতিক প্রশ্রয় না পায়।
তাই প্রশ্ন উঠছে—উত্তর ভারতে সাম্প্রতিক কয়েক বছর ধরে যে ধরনের রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেখা গেছে, যেখানে ধর্ম, অলৌকিকতা, ধর্মীয় সমাবেশ এবং নির্বাচনী রাজনীতিকে ক্রমশ একটি কার্যকর রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে একসঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে, বাংলাতেও কি সেই প্রবণতা আনার চেষ্টা চলছে? কোন রাজনৈতিক দল এতে যুক্ত, তা নির্বিশেষে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং কুসংস্কারের প্রকাশ্য প্রচারকে প্রতিহত করা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের দায়িত্ব।
রামমোহনের বাংলা প্রশ্ন করার ঐতিহ্য তৈরি করেছিল। রবীন্দ্রনাথ মানুষকে সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানবতার দিকে তাকাতে শিখিয়েছেন। আর বিবেকানন্দ জোর দিয়েছেন নির্ভীকতা ও মানব সেবার উপর। আজ বাংলার সামনে নতুন প্রশ্ন—সে কি যুক্তির সেই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, নাকি অলৌকিকতা ও কুসংস্কারের রাজনীতির জন্য জায়গা তৈরি করবে?
তাই বাগেশ্বর ধামের ঘটনা শুধু একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে ঘিরে বিতর্ক নয়। এটি বৃহত্তর এক সংঘাতের নতুন উদাহরণ—বিজ্ঞান বনাম কুসংস্কার, ব্যক্তি স্বাধীনতা বনাম ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদ এবং গণতন্ত্র বনাম ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সংঘাত।
বাংলা যদি রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দের উত্তরাধিকারকে ধরে রাখতে চায়, তবে তার অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে, কিন্তু কুসংস্কারকে বিজ্ঞানের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। ধর্ম ব্যক্তিগত পরিসরের বিষয়; আর রাজনীতির ভিত্তি হতে হবে যুক্তি ও সংবিধান।
ড. হামিদ দাভোলকর একজন মনোরোগ চিকিৎসক, যুক্তিবাদী আন্দোলনের কর্মী এবং মহারাষ্ট্রের বিশিষ্ট সমাজসংস্কারক ও যুক্তিবাদী নেতা ড. নরেন্দ্র দাভোলকরের পুত্র। কুসংস্কারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বিশিষ্ট মুখ নরেন্দ্র দাভোলকর ২০১৩ সালের ২০ আগস্ট মহারাষ্ট্রের পুনেতে খুন হয়েছিলেন উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে। তিনি মহারাষ্ট্রের অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি (এমএএনএস)-র প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ড. হামিদ এই সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত এবং তাঁর বাবার শুরু করা কুসংস্কারবিরোধী ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
Comments :0