editorial

অবশেষে চুক্তি

সম্পাদকীয় বিভাগ

দীর্ঘ ১১১ দিনের মাথায় পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসানের আশার আলো দেখা গেছে। অস্ত্র সম্বরণ করে স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে আমেরিকা ও ইরান সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ফ্রান্সের যে ভার্সাই প্যা‍‌লেসে ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটেছিল সেই প্যালেসেই স্বাক্ষরিত হলো এই চুক্তি। তবে সেখানে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প উপস্থিত থেকে স্বাক্ষর করলেও ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুম পেজেসকিয়ান ডিজিটাল ফরম্যাটে স্বাক্ষর করেছেন তেহরান থেকে। চুক্তি স্বাক্ষরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের দাম অনেকটাই কমেছে। শেয়ার বাজারও চড়েছে অনেকটা। অর্থাৎ ইতিহাবাচক প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। কিন্তু সমস্যা হলো আমেরিকা চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও যাদের কারণে পশ্চিম এশিয়ার এই সঙ্কট আমেরিকার দোসর ইজরায়েল কিন্তু তাদের সম্মতি দেয়নি। চুক্তি স্বাক্ষরের দিনেও তারা যথারীতি লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে এবং তাতে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি দক্ষিণ লেবাননের যে বিস্তীর্ণ অংশ ইজরায়েলি সেনারা দখল করেছে সেটা স্থায়ীভাবে দখলে রাখার কথা ঘোষণা করেছেন রীতিমতো মানচিত্র প্রকাশ করে। অথচ চুক্তির অন্যতম শর্ত আছে প্যালেস্তাইন, লেবানন সহ কোনও অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা চালানো যাবে না। ইজরায়েলের মনোভাব চুক্তির ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে রাখতে হবে। মনে রাখা দরকার পশ্চিম এশিয়ায় ইজরায়েলের প্রধানতম শত্রু ইরান। কারণ ইজরায়েলের এলাকা দখল করে সম্প্রসারণবাদী নীতির ঘোরতর বিরোধী ইরান। গাজা, লেবানন ও ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলি ইজরায়েলের দখলদারি যে মেনে নেবে না তা নিশ্চিত। ফলে সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। বস্তুত ইজরায়েলের পক্ষ নিয়ে আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে। ইরানে ইজরায়েলও সমান আক্রমণকারী। তাই চুক্তিতে ইজরায়েলেরও স্বাক্ষর করা জরুরি। ইজরায়েলও সে পথে না গিয়ে ভবিষ্যতে দখলদারি অভিযান চালানোর রাস্তা খোলা রাখতে চাইছে। যদি আমেরিকা চুক্তিশর্ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে ইজরায়েলকে বাধ্য না করে তাহলে এই চুক্তি অর্থহীন হয়ে যাবে। বস্তুত সারা বিশ্বে একঘরে হয়ে গেলেও একমাত্র মার্কিন গ্যারান্টির জোরেই ইজরায়েল এতটা ঔদ্ধত্য দেখাতে পারছে।
চুক্তিতে কার বেশি লাভ বা কার বেশি জয় সেটা ভবিষ্যৎ বলবে। আপাতত সারা দুনিয়ার সামনে এটাই স্বস্তি যে পশ্চিম এশিয়ার তেল ও অন্যান্য পণ্য বিনা বাধায় বিশ্ববাজারে ঢুকবে। বিশ্ব অর্থনীতি যে সঙ্কটের মধ্যে পড়ে খাবি খাচ্ছিল তার থেকে রেহাই মিলবে। হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে আমেরিকার অর্থনীতি এবং অবশ্যই ভারতের অর্থনীতি। বস্তুত জ্বালানির জন্য পশ্চিম এশিয়ার উপর নির্ভরশীল ভারত ইরান যুদ্ধের কারণে সবদিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। দেশে তেল-গ্যাসের গভীর জোগান সঙ্কট তৈরি হয়। দাম বাড়তে থাকে উচ্চ হারে। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় কমতে থাকে। টাকার মূল্য পতন ঘটে অস্বাভাবিকভাবে। এমন অবস্থায় ভারত দিশাহীন হয়ে পড়লেও যুদ্ধ বন্ধে কোনও চেষ্টা করেনি। আগাগোড়া নীরবতা পালন করে গেছে। পাছে আমেরিকা চটে যায় তাই নিন্দা, বিরোধিতা, সমালোচনার ধারে কাছেও যায়নি। উলটে ইজরায়েলকে পরোক্ষে সমর্থন করে গেছে। একবারের জন্যও ইজরায়েলের গণহত্যার নিন্দা করেনি। অথচ পাকিস্তান যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্ততাকারী হিসাবে দুনিয়ার কাছে দারুণভাবে সুনাম অর্জন করেছে। ইজরায়েলের অন্ধ ভক্ত আর আমেরিকার অধস্তন শরিক হতে গিয়ে বিশ্ব কূটনীতিতে মর্যাদা হারিয়েছে মোদীর ভারত। অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন বিশেষ মিলবে বলে মনে হয় না।

Comments :0

Login to leave a comment