Attack on Church in Bengal

খ্রিস্টানরাও কি বাংলায় নিরাপদ নয়?

সম্পাদকীয় বিভাগ

গৌতম রায়
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের মে মাস একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, সামাজিক হয়রানি এবং আক্রমণের অভিযোগের পাশাপাশি এবার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপর ধারাবাহিক আক্রমণের যে চিত্র সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থা সামনে এনেছে, তা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন কয়েকটি আইনশৃঙ্খলার ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এখানে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ধর্মান্তরের অভিযোগকে হাতিয়ার করে ব্যক্তিগত বাড়িতে প্রার্থনাসভা, গির্জা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, এমনকি মৃত মানুষের শেষকৃত্য পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত করার ঘটনা সামনে এসেছে। কোনও নাগরিকের ধর্মীয় বিশ্বাসের অধিকার কি সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমতি নির্ভর? ভারতের সংবিধান কি সেই অধিকার দেয়? 
২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘স্ক্রল’-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অল্ট নিউজের সাংবাদিক অঙ্কিতা মহলানবিশ পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণের ধারাবাহিক বিবরণ দিয়েছেন। ১জুলাই থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অল্ট নিউজ প্রায় ৩৫টি ঘটনার তথ্য নথিবদ্ধ করেছে। গির্জায় হামলা, বাড়িতে প্রার্থনাসভা ভেঙে দেওয়া, যাজকদের হেনস্তা, উপাসকদের মারধর এবং ধর্মীয় বই নষ্ট করার মতো ঘটনা এই তালিকায় রয়েছে। 
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’ ১৩ মে থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টানদের নিশানা করে ৬০টি ঘটনার কথা নথিবদ্ধ করেছে। তাদের হিসাবে ৫২টি ঘটনা ছিল গির্জা, বাড়ি, প্রার্থনাসভা কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় জমায়েতে হানা দেওয়ার। আটটি ঘটনার মধ্যে ছিল শারীরিক আক্রমণ, গণহিংসা এবং সম্পত্তি ভাঙচুর। ঘটনাগুলি ১৩টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এই হিসাবটি সংস্থার নিজস্ব পর্যবেক্ষণভিত্তিক নথি; প্রতিটি অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে, এমন দাবি সংস্থাটি করেনি। ফলে দুটি প্রতিবেদনের সংখ্যা যোগ করে মোট ঘটনা নির্ধারণ করা যাবে না। কিন্তু উভয় অনুসন্ধানেই যে ধারাবাহিকতার ছবি উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। 
ঘটনাগুলির কয়েকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেমন, সুভাষগ্রাম, ৫ জুলাই। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুভাষগ্রামে নির্মীয়মাণ একটি গির্জায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলে দেওয়া হয়।
পরের ঘটনা ন্যাজাটে, ৩১ জুলাই। উত্তর ২৪পরগনার ন্যাজাটে ক্ল্যারেট প্রেমালয় নামে একটি খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কয়েকজন ব্যক্তি ঢুকে যাজকদের হুমকি দেন বলে অভিযোগ। সাত দিনের মধ্যে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
সন্দেশখালি, ৩১ জুলাই। সেখানে গ্রেস কমিউনিটি চার্চে ঢুকে যাজক সন্তোষ টুডুকে খ্রিস্টধর্ম পরিত্যাগ করার জন্য চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। তাঁকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। খ্রিস্টান হওয়ার কারণে দেশদ্রোহী এবং বিশ্বাসঘাতক বলে অপমান করার অভিযোগও রয়েছে।
হাওড়ার উলুবেড়িয়া, ২৩ আগস্ট। প্রায় ৬০জন মানুষ একটি বাড়িতে রবিবারের প্রার্থনায় অংশ নিয়েছিলেন। সেই সময় একদল লোক জোর করে সেখানে ঢুকে পড়ে। ধর্মান্তরের অভিযোগ তুলে প্রার্থনাকারীদের মারধর করা হয় এবং বাড়ির আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী ভাঙচুর করা হয়। যাজক মিঠুন হাজরা সংবাদমাধ্যমকে জানান, পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে তাঁরা অভিযোগ দায়ের করেন। হাওড়া গ্রামীণ জেলার পুলিশ সুপার জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর হয়েছে, তদন্ত চলছে; কিন্তু ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখনও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। 
পূর্ব বর্ধমানের সাহানগর, ১৪ আগস্ট। এই ঘটনাটি সভ্য সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। সেন্ট ক্ল্যারেট চার্চে এক মহিলার শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ। কবরস্থানের জমির কাগজ দেখতে চেয়ে একদল লোক আপত্তি জানায়। অভিযোগ, মৃতদেহ কবর দেওয়ার পরেও সেটি কবর থেকে তুলে অন্যত্র নিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। শেষ পর্যন্ত বর্ধমান শহরের অন্য একটি কবরস্থানে মৃতদেহ সমাহিত করতে হয়। যাজক স্যামুয়েল হেমব্রম অভিযোগ করেছিলেন, প্রশাসনের কাছে জানিয়েও তাঁরা যথাযথ সহযোগিতা পাননি। যদিও পুলিশ সুপার জমির মালিকানা নিয়ে স্থানীয় আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন এবং মারধরের অভিযোগ যাচাই করার কথা বলেছিলেন। 
এখানেই শেষ নয়। ১১ অক্টোবর টেলিগ্রাফে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কৃষ্ণনগরের উপকণ্ঠে জালালখালির একটি ক্যাথলিক গির্জায় হামলার খবর প্রকাশিত হয়। সাঁওতালি ভাষায় বাইবেল বিষয়ক একটি সম্মেলন চলাকালীন হামলায় অন্তত ছয়জন আহত হন বলে প্রতিবেদনটি জানায়। গির্জার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরের অভিযোগ তুলেছিল হামলাকারীরা। ঘটনায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরঙ দলের সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। রোমান ক্যাথলিক ডায়োসিসের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে অভিযোগও জানানো হয়। 
এই ঘটনাগুলির মধ্যে একটি স্পষ্ট মিল রয়েছে। প্রথমে ধর্মান্তরের অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তারপর কোনও সংগঠিত দল নিজেরাই তদন্তকারী, বিচারক এবং শাস্তিদাতার ভূমিকা গ্রহণ করছে। কোথাও প্রার্থনাসভা বন্ধ করা হচ্ছে, কোথাও গির্জায় ঢুকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, কোথাও যাজককে এলাকা ছাড়তে বলা হচ্ছে। এই প্রবণতা ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত।
ভারতীয় সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে বিবেকের স্বাধীনতা এবং নিজের ধর্ম পালন, প্রচার ও অনুশীলনের অধিকার দিয়েছে। ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নির্দিষ্ট সাংবিধানিক সীমার মধ্যে নিজেদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকার দেয়। 
অথচ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, ধর্মান্তরের অভিযোগ তুলে একদল মানুষ নিজেদের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে। প্রার্থনার সময় হানা দিচ্ছে, ধর্মীয় বই তছনছ করছে, যাজকদের পরিচয় ও অর্থের উৎস নিয়ে জেরা করছে। পুলিশের কাজ অপরাধের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা। কোনও রাজনৈতিক বা ধর্মীয় সংগঠনের নির্দেশে নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা সঙ্কুচিত করা নয়।
এটাই আসলে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক। প্রতিটি আক্রমণের উদ্দেশ্য শুধু একজন মানুষকে মারধর করা নয়; তার চেয়ে বড় উদ্দেশ্য হলো একটি সম্প্রদায়কে এমনভাবে আতঙ্কিত করে রাখা, যাতে তারা নিজেদের অধিকার প্রয়োগ করতেও ভয় পায়।
দুই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভাষা আলাদা। মুসলমানদের ক্ষেত্রে কখনও গোরু পাচার, কখনও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী, কখনও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে ধর্মান্তর, বিদেশি অর্থ এবং ভারতীয় সংস্কৃতির বিরোধিতার অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে। কিন্তু এই অভিযোগগুলির রাজনৈতিক ব্যবহার লক্ষ্য করলে একটি সাধারণ প্রবণতা চোখে পড়ে। নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিচয়, ধর্মবিশ্বাস এবং জীবনযাপনের স্বাধীনতাকে সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমোদনের অধীন করে ফেলার চেষ্টা।
বাংলার খ্রিস্টান সমাজেরও শিক্ষা, চিকিৎসা, সমাজসেবা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে দীর্ঘ অবদান রয়েছে। কলকাতার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্যকেন্দ্র, আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের শিক্ষাকাজ থেকে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো—বিভিন্ন ক্ষেত্রে খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। তাঁদের ধর্মীয় পরিচয়কে সন্দেহের চোখে দেখা মানে বাংলার সামাজিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে অস্বীকার করা।
বাংলার মুসলমান ও খ্রিস্টান সমাজের মধ্যে এমন অসংখ্য মানুষ রয়েছেন, যাঁরা একই পাড়ায় বসবাস করেন, একই বিদ্যালয়ে পড়েন, একই কর্মক্ষেত্রে কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি ধর্মীয় পরিচয় নয়, দৈনন্দিন জীবনযাপন, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব এবং সামাজিক সহযোগিতা।
এই সামাজিক বন্ধনকে ভাঙতে পারলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির লাভ। কারণ মানুষের প্রকৃত সমস্যাগুলি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে নিয়ে আসা যায়। বেকারত্ব, দারিদ্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিল্পের সঙ্কটের পরিবর্তে তখন আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে কে কোন ধর্ম পালন করছেন, কে কোথায় প্রার্থনা করছেন, কার বাড়িতে কোন ধর্মগ্রন্থ রয়েছে।
সরকার এবং শাসক দলের সাংবিধানিক দায় হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কোনও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ আক্রান্ত হবেন না। যে সংগঠনগুলি ধর্মের নামে নাগরিকদের উপর আক্রমণ করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ ও কঠোর হচ্ছে, সেটাই আসল কথা।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে কয়েকটি সরাসরি প্রশ্ন রয়েছে।
প্রথমত, খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে নথিবদ্ধ অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য কি কোনও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
দ্বিতীয়ত, যেসব এলাকায় গির্জা ও প্রার্থনাসভায় হামলার অভিযোগ উঠেছে, সেখানে আক্রান্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে কি? 
তৃতীয়ত, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলির তদন্ত কত দূর এগিয়েছে?
চতুর্থত, সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় মুখ্যমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে কী অবস্থান নিয়েছেন?
এই প্রশ্নগুলি কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থেকে নয়। এগুলি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন।
কোনও সরকার যদি মনে করে, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট পেয়েছে বলে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় পরিচয়ই রাষ্ট্রের পরিচয় হয়ে উঠবে, তাহলে সেই সরকার গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণাকেই অস্বীকার করে। নির্বাচনে জয়লাভ করার অর্থ সংবিধানের উপর কর্তৃত্ব লাভ করা নয়। ক্ষমতায় আসার অর্থ নাগরিকের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার অধিকার পাওয়া নয়।
সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পরিচয় হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কোনও একটি সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের সঙ্গে রাজনৈতিক হিন্দুত্বকে এক করে দেখার কোনও যুক্তি নেই। অসংখ্য হিন্দু মানুষ নিজের ধর্মবিশ্বাস বজায় রেখেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতা করেন। বাংলার সামাজিক ঐতিহ্য তাঁদেরও। তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার অধিকার কোনও সংগঠনের নেই। একইভাবে খ্রিস্টানদের প্রার্থনা কিংবা মুসলমানদের ধর্মীয় আচারকে জাতীয় সংস্কৃতির বিরোধী বলে চিহ্নিত করার অধিকারও কারও নেই।
পশ্চিমবঙ্গ কোনও পরীক্ষাগার নয়, যেখানে মানুষের বহুত্ববাদী পরিচয়কে মুছে দিয়ে একটি অভিন্ন ধর্মীয় রাজনৈতিক পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া যাবে। এই বাংলা রামমোহনের, বিদ্যাসাগরের, রবীন্দ্রনাথের, নজরুলের, লালনের। এই বাংলা সাঁওতাল, রাজবংশী, মতুয়া, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ এবং হিন্দু—সকলের।
একটি গির্জার উপর আক্রমণ শুধু খ্রিস্টানদের উপর আক্রমণ নয়। একটি মসজিদের উপর আক্রমণ শুধু মুসলমানদের উপর আক্রমণ নয়। এগুলি প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের উপর আক্রমণ। কারণ যে রাষ্ট্র একজনের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কারও স্বাধীনতাই নিশ্চিত করতে পারে না।
বাংলাকে কি আমরা ভয়ের বাংলা হতে দেব? ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকত্বের অধিকার নির্ধারিত হতে দেব? সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপটকেই গণতন্ত্র বলে মেনে নেব? এই প্রশ্নে নীরব থাকার অর্থ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া।
বাংলার মানুষকে আজ স্পষ্ট করে বলতে হবে, ধর্ম যার যার, নাগরিক অধিকার সকলের। গির্জায় প্রার্থনা করার অধিকার যেমন একজন খ্রিস্টানের, মসজিদে নামাজ পড়ার অধিকার তেমনই একজন মুসলমানের। মন্দিরে পুজো করার অধিকারও একজন হিন্দুর। এই অধিকার কোনও রাজনৈতিক দলের দয়া নয়, সংবিধান প্রদত্ত অধিকার।
সরকারের কাছে বাংলার মানুষের দাবি একটাই—ধর্মের নামে গুন্ডামি বন্ধ করুন, আক্রান্তদের নিরাপত্তা দিন, অপরাধীদের গ্রেপ্তার করুন এবং সংবিধান মেনে সরকার পরিচালনা করুন।
বাংলা কোনও ধর্মীয় আধিপত্যবাদের জমিদারি নয়। বাংলা মানুষের, বাংলা বহুত্বের, বাংলা সম্প্রীতির। সেই বাংলাকে রক্ষা করার লড়াই আজ শুধু সংখ্যালঘুদের লড়াই নয়, সমগ্র গণতান্ত্রিক সমাজের লড়াই।

Comments :0

Login to leave a comment