Delhi Pollution

দূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু পরালি পোড়ানো নয়, দায়ী অভিজাতদের বিলাসবহুল গাড়িও: সুপ্রিম কোর্ট

জাতীয়

দিল্লি-সহ জাতীয় রাজধানী অঞ্চল (এনসিআর)-এর ভয়াবহ বায়ুদূষণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট। দূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু কৃষকদের খড় বা ফসলের অবশিষ্টাংশ (পরালি) পোড়ানো বন্ধ করলেই হবে না, শহরের অভিজাত শ্রেণির বিলাসবহুল গাড়ি এবং যানবাহনের ধোঁয়াও সমানভাবে দায়ী বলে মন্তব্য করল শীর্ষ আদালত। একই সঙ্গে পরালি সংগ্রহের মূল্য আগেভাগে ঘোষণা করা এবং তা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির হাতে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আদালত।
শুক্রবার দিল্লির বায়ুদূষণ সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ জানায়। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনা। শুনানির শুরুতেই দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি নিয়ে কটাক্ষের সুরে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আশা করি দিল্লির আবহাওয়া আপনারা সবাই উপভোগ করছেন।’
শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, সুপ্রিম কোর্ট যত বেশি নির্দেশ দেবে, নির্দেশ অমান্য করার ঘটনাও তত বেশি সামনে আসবে। তার কথায়, ‘এটা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি।’
আদালতকে দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত করেন মামলায় আদালতকে সহায়তাকারী অ্যামিকাস কিউরি তথা সিনিয়র আইনজীবী অপরাজিতা সিং। তিনি জানান, দিল্লির বায়ুদূষণের মাত্রা এখনও 'সিভিয়ার' বা ভয়াবহ পর্যায়ে রয়েছে। দূষণের প্রভাব তার নিজের কণ্ঠস্বরেও পড়েছে বলে জানান তিনি। তার বক্তব্য, দিল্লি-এনসিআরের বাতাসে শ্বাস নেওয়া প্রতিদিন ৩০টি সিগারেট খাওয়ার সমান।
অপরাজিতা সিং জানান, বৃষ্টির কারণে সাময়িকভাবে দূষণের মাত্রা কমেছিল। তবে কৃষকদের পরবর্তী চাষের মরশুমের প্রস্তুতির আগে পরালি পোড়ানো বন্ধ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। তার দাবি, দিল্লির মোট দূষণের প্রায় ১৪ শতাংশের জন্য দায়ী পরালি পোড়ানো। এমনিতেই দিল্লির দূষণের মাত্রা বিপজ্জনক, তার উপর কৃষিক্ষেত্রে আগুন লাগানোর ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তাই পরালি পোড়ানো বন্ধ করার পাশাপাশি শহরের ভিতরে আবর্জনা পোড়ানো-সহ স্থানীয় স্তরের দূষণ নিয়ন্ত্রণেও দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তবে দূষণের দায় শুধু কৃষকদের উপর চাপানো যায় কি না, সেই প্রশ্ন তোলে সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতিরা জানতে চান, দিল্লির দূষণের জন্য কি শুধুই পরালি পোড়ানো দায়ী, নাকি শহরের ধনী ও অভিজাত শ্রেণির ব্যক্তিগত গাড়িও বড় ভূমিকা পালন করছে?
আদালতের পর্যবেক্ষণ, পরালি পোড়ানো নিয়ে বারবার আলোচনা হচ্ছে। কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কিন্তু শহরের অভিজাত শ্রেণির মানুষদের ব্যবহৃত বিলাসবহুল গাড়ি এবং বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিগত যানবাহনের দূষণ নিয়েও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। যানবাহনের ধোঁয়া যে দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ, তা স্পষ্ট করে দেয় শীর্ষ আদালত।
অপরাজিতা সিংও স্বীকার করেন, দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলে বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস হল যানবাহন। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকার রাস্তায় যানজটের কারণে গাড়িগুলি দীর্ঘক্ষণ একে অপরের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে। বাম্পার-টু-বাম্পার যান চলাচলের ফলে গাড়ির ইঞ্জিন থেকে নির্গত ধোঁয়া দূষণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে উপস্থিত অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্য ভাটি আদালতকে জানান, পরালি পোড়ানো বন্ধ করতে ইতিমধ্যেই সরকারি প্রকল্প রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলের পরিস্থিতি অনুযায়ী কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানিয়ে কেন্দ্র আদালতে একটি নোটও জমা দিয়েছে।
যানবাহনজনিত দূষণ নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রের পদক্ষেপের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিএস-৬ (ভারত স্টেজ-৬) মান পূরণ করে না, এমন যানবাহনের দিল্লিতে প্রবেশ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে ডিজেলচালিত অটোরিকশা সরিয়ে ফেলা এবং অন্য শহর থেকে দিল্লিতে প্রবেশকারী বাসগুলির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঐশ্বর্য ভাটি আরও জানান, যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ শংসাপত্র বা পলিউশন আন্ডার কন্ট্রোল (পিইউসি) সার্টিফিকেটের সঙ্গে জিও-ট্যাগিং ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। বৈধ দূষণ শংসাপত্র ছাড়া জ্বালানি সরবরাহও করা হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি। গণপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি তাৎক্ষণিক এবং মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েও সরকার কাজ করছে বলে আদালতকে জানান কেন্দ্রের আইনজীবী।
তবে সরকারি নির্দেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে শুনানিতে। অপরাজিতা সিং জানান, টোল প্লাজায় গাড়ি দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে না রাখার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আগের নির্দেশ এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এনসিআর থেকে আসা গাড়িগুলিকে দিল্লির সীমানায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে। ইঞ্জিন চালু অবস্থায় গাড়িগুলি দাঁড়িয়ে থাকায় সেখান থেকেও বিপুল পরিমাণ দূষণ ছড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়, দিল্লির ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শীতকালে দূষিত বাতাস সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। ফলে দূষণের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান বা গ্র্যাপ (GRAP) কার্যকর করা হয়েছে। কেন্দ্রের আইনজীবী বলেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাগুলিকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলা ঠিক হবে না।
কিন্তু কেন্দ্রের এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে পারেনি আদালত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত পাল্টা প্রশ্ন করেন, যখন দিল্লির এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) ইতিমধ্যেই ৪০০ ছুঁতে চলেছে, তখন কীভাবে এই ব্যবস্থাগুলির সাফল্যের দাবি করা যায়? জবাবে ঐশ্বর্য ভাটি বলেন, বিভিন্ন ধরনের কার্যকলাপ থেকেই দূষণ তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও উৎসবের মরশুমেও দূষণের চাপ বেড়েছে।
সব মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট, দিল্লির দূষণ মোকাবিলায় কৃষকদের পরালি পোড়ানো বন্ধ করার পাশাপাশি যানবাহন, শিল্প এবং শহরের অভ্যন্তরীণ দূষণের উৎসগুলির বিরুদ্ধেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। শুধু নির্দেশ জারি নয়, সেই নির্দেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার উপরও নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার দিকটি এ দিনের শুনানিতে উঠে এসেছে।

Comments :0

Login to leave a comment