Tea Gardens Workers

অনুদান নয়, কাজের নিশ্চয়তায় বন্ধ চা বাগান খুলে দেওয়ার দাবি শ্রমিকদের

জেলা

এককালীন আর্থিক সাহায্য ও খাদ্যশস্য দেওয়ার সরকারি ঘোষণায় সাময়িক স্বস্তি মিললেও বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকদের জীবনে কাটছে না অনিশ্চয়তা। দীর্ঘদিন ধরে কাজ নেই, নিয়মিত আয় নেই, বকেয়া পাওনা নিয়েও দুশ্চিন্তা। এই পরিস্থিতিতে উত্তরবঙ্গের ২১টি বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকদের দাবি, অনুদান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অবিলম্বে বাগান খুলে উৎপাদন চালু করতে হবে। সরকারকে দায়িত্বশীল মালিকের হাতে বাগান পরিচালনার ভার দিয়ে নিয়মিত কাজ ও মজুরির নিশ্চয়তা দিতে হবে।
শিলিগুড়িতে রাজ্য সরকার দীপাবলি, কালীপুজো ও ছটপুজো উপলক্ষে উত্তরবঙ্গের ২১টি বন্ধ চা বাগানের প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার শ্রমিকের জন্য এককালীন পাঁচ হাজার টাকা এবং পরিবারপিছু ৫০ কেজি চাল দেওয়ার ঘোষণা করেছে। বর্তমানে চা শ্রমিক পরিবারগুলি মাসে ৩৫ কেজি খাদ্যশস্য পায়। আগামী জানুয়ারি থেকে তা বাড়িয়ে ৫০ কেজি করার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। বন্ধ বাগান খোলার বিষয়ে শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিংকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানিয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের বক্তব্য, চাল ও নগদ অর্থ দিয়ে কয়েকদিনের সংসার চালানো গেলেও জীবিকার স্থায়ী বন্দোবস্ত হয় না। বাগান বন্ধ থাকলে কাজের সুযোগ তৈরি হবে না, নিয়মিত উপার্জন ফিরবে না। তাই শুধু আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা নয়, বাগান খোলার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।
বর্তমানে পাহাড়ের ৯টি, জলপাইগুড়ির ৬টি এবং আলিপুরদুয়ারের ৬টি চা বাগান বন্ধ রয়েছে। পাহাড়ের আলুবাড়ি, চংটং, দোতেরিয়া, কালেজভ্যালি, মুণ্ডকোঠি, পেশক, রংমুক-সিডার ও সিংসেম-সহ একাধিক বাগানে উৎপাদন বন্ধ। জলপাইগুড়ির আমবাড়ি, সুরেন্দ্রনগর, রেডব্যাংক, চামুর্চি, রায়পুর ও সোনালি এবং আলিপুরদুয়ারের বান্দাপানি, কালচিনি, লঙ্কাপাড়া, মধু, রায়মাটাং ও রামঝোরা বাগানও বন্ধের তালিকায় রয়েছে।
জলপাইগুড়ি জেলায় পরিস্থিতি বিশেষ ভাবে উদ্বেগজনক। গত বছরের পুজোর আগে থেকে বন্ধ রেডব্যাংক ও সুরেন্দ্রনগর। প্রায় ১১ মাস বন্ধ থাকার পর গত ২৮ অক্টোবর আমবাড়ি চা বাগান খুললেও লাগোয়া চামুর্চি এখনও বন্ধ। রেডব্যাংক ও সুরেন্দ্রনগর দীর্ঘদিন একই মালিকানাধীন। মাঝের কয়েক মাস বাদ দিলে গত ২২ বছর ধরে এই দুই বাগানের শ্রমিকদের জীবন কেটেছে কাজ হারানো ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাগান বন্ধ হওয়ার পর ফের খোলার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে। কাজের অভাবে আর্থিক সংকটের পাশাপাশি শ্রমিক পরিবার গুলির সামাজিক জীবনেও প্রভাব পড়ছে।
রেডব্যাংকের ফ্যাক্টরি লাইনের শ্রমিক রাজেশ ওঁরাও বলেন, সরকারি সাহায্যের জন্য তাঁরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ বাগান চালু করা এবং সৎ ও দায়িত্বশীল মালিকের হাতে পরিচালনার ভার তুলে দেওয়া। সুরেন্দ্রনগরের শ্রমিক সুমন লকড়া বলেন, তাঁরা কাজ করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চান। বাগান চালু হলে শ্রমিকদের পাশাপাশি নন-ওয়ার্কার পরিবারগুলিও উপকৃত হবে। চামুর্চির শ্রমিক আশা তামাংয়ের কথায়, প্রতিদিনই তাঁরা বাগান খোলার সুসংবাদের অপেক্ষায় থাকেন। সরকারি সাহায্যে সাময়িকভাবে সংসার চললেও তা কাজের বিকল্প হতে পারে না।
চামুর্চির চা বাগান মজদুর ইউনিয়নের নেতা রফিক আনসারীর বক্তব্য, ত্রাণে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু জীবিকার নিশ্চয়তা আসে কাজ থেকেই।বন্ধ বাগান খুলে উৎপাদন চালু করা, বকেয়া পাওনা মেটানো এবং নিয়মিত মজুরি নিশ্চিত করাই এখন শ্রমিকদের প্রধান দাবি।
শুধু বন্ধ বাগান নয়, ডুয়ার্সের একাধিক চালু চা বাগানেও বোনাস ও মজুরি নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। মেটেলির কিলকোট ও নাগেশ্বরী,নাগরাকাটার বামনডাঙ্গা-টণ্ড ও ধরণীপুর এবং মালবাজারের বাগড়াকোট চা বাগানে বোনাস বকেয়া থাকার অভিযোগ উঠেছে। ধরণীপুরের শ্রমিক চামেলী ওঁরাও জানান, কিছু শ্রমিক বোনাস পেলেও বাকিরা এখনও বঞ্চিত। মজুরি নিয়েও অনিশ্চয়তা থাকায় শ্রমিকদের একাংশ কাজে যাওয়া বন্ধ করেছেন। বাগান স্বাভাবিক করার দাবিতে জেলা প্রশাসনের কাছেও আবেদন জানানো হয়েছে।
সিআইটিইউ'র জলপাইগুড়ি জেলা সভাপতি রামলাল মুর্মু বলেন, অনুদান দিয়ে শ্রমিকদের স্থায়ী সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বন্ধ চা বাগান খুলে শ্রমিকদের কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে বন্ধ বাগান অধিগ্রহণ করে সরকারি উদ্যোগে পুনরায় উৎপাদন চালু করতে হবে। যতদিন বাগান না খুলছে, ততদিন শ্রমিকদের জন্য ১০০ দিনের কাজের ব্যবস্থা করার দাবিও জানান।

Comments :0

Login to leave a comment