অন্যকথা
মুক্তধারা
----------------------------
আইনস্টাইনের মা
----------------------------
তপন কুমার বৈরাগ্য
সন্তানের বড় হওয়ার পিছনে সবার আগে থাকে মায়ের দান।মা ছাড়া একজন সন্তান কিন্তু সত্যিকারের দিশা দেখতে পায় না।ফটোইলেকট্রিক এফেক্ট ও আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ১৯০৫খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কার করে যিনি সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসাবে স্বীকৃতি পান,তিনি হলেন আলবার্ট আইনস্টাইন।
আইনস্টাইন হবার পিছনে যার দান অসামান্য, তিনি হলেন তার মা পাউলিন। আইনস্টাইন ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে পদার্থ বিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। দক্ষিণ জার্মানির বাভারিয়া রাজ্যের উলম শহরে ১৮৯৭খ্রিস্টাব্দর ১৪ই মার্চ তিনি জন্মগ্রহণ করেন।বাবার নাম ছিল হেরম্যান। মা ছেলের নাম রাখলেন অ্যালবার্ট।মায়ের দু'নয়নের মণি এই অ্যালবার্ট।
১৮৯৯খ্রিস্টাব্দে তার বোন মাজা জন্ম নিলো।দু বছর বয়েসেও ছেলে কথা বলতে শেখেনি।মায়ের মহা চিন্তা।আরো ছ'মাস কেটে গেল তবু অ্যালবার্ট মা ডাকও বলতে পারল না।মা থেমে যাওয়ার পাত্রী নয়।মায়ের প্রতিজ্ঞা ছেলেকে তিনি কথা বলা শেখাবেনই।একদিন মা ছ'মাসের মাজাকে বাইরের উঁচু বারান্দায়
রেখে সেখানে অ্যালবার্টকে রেখে পাশে লুকিয়ে রইলেন। ছেলে পুতুলের মতন বোনের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকলো।কিছুক্ষণ পর মাজা একটু একটু করে গড়িয়ে উঠানের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।অ্যালবার্ট খুব উদগ্রীব হয়ে উঠল। আরেকটু পর বোন উঠানে গড়িয়ে পড়ে যাবে। সাংঘাতিকভাবে আঘাত পাবে।
এদিকে অ্যালবার্ট মাকেও দেখতে পাচ্ছে না।ভয়ে তার মুখ থেকে প্রথম বেড়িয়ে এলো মা ডাক। মা ছুটে এসে ছেলে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগলেন।এটায় ছিল অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের প্রথম কথা বলা। তার মায়ের উপস্থিত বুদ্ধির জন্য আইনস্টাইনের মুখে প্রথম
মা ডাক বেড়িয়ে এসেছিল। ছেলেমেয়ে যাতে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখে সেজন্য তার মা প্রতি রবিবারে পাহাড় পর্বত,নদী,বন ,সাগরের ধারে তাদের বেড়াতে নিয়ে যেতেন।সেখানে প্রকৃতির কোলে তাদের ছেড়ে দিতেন।এইভাবে তাদের প্রকৃতির জীবজন্তু,গাছগাছালি ,পাখপাখালির সাথে পরিচয় ঘটে।বিশ্বব্রহ্মান্ড সম্পর্কে অ্যালবার্ট এইভাবে ছোটবেলা থেকে আগ্রহী হয়ে ওঠে।ছেলেমেয়ের ভালোভাবে যাতে পড়াশুনা হয় তাই ব্যাবসায়ী স্বামীকে নিয়ে মিউনিখ শহরে চলে এলেন।সেইখানেই হেরম্যান নতুন করে ব্যাবসা শুরু করলেন।এখানকার স্থানীয় বিদ্যালয়ে মা, ভাইবোনকে একসাথে ভর্তি করে দিলেন।তিনি নিজেই ছেলেমেয়েকে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিতেন এবং বাড়ি নিয়ে আসতেন।পড়াশোনায় যদিও অ্যালবার্ট খুব একটা ভালো ছিল না;তবুও ঘষেমেজে মা তাকে বেশ ধারালো করে তুলেছিলেন।মায়ের চেষ্টাতেই তিনি গণিত এবং বিজ্ঞানকে ভালোবেসে ফেললেন। মা খুব ভালো ভায়োলিন বাজাতে পারতেন। ছ'বছর বয়েসে তিনি মায়ের কাছ থেকে ভায়োলিন বাজানো শিখে নিলেন। মা তার হাতে যে ভায়োলিন তুলে দিয়েছিলেন, তিনি সারাজীবন
সেই ভায়োলিন নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন।এই ভায়োলিন তাকে সময়ে অসময়ে আনন্দ দিয়েছে।মায়ের মৃত্যুর পর তিনি সাতদিন এই ভায়োলিনে বিষাদের সুর বাজিয়ে গেছেন।আর তার চোখ দিয়ে অনবরত জল ঝরে গেছে।১৯২১খ্রিস্টাব্দে যখন তিনি পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান, তখন মায়ের দেওয়া এই
ভায়োলিন তার হাতে ছিল।নোবেল পুরস্কার হাতে নিয়ে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি জানিয়েছিলেন। ১৯৫৫খ্রিস্টাব্দের ১৮ই এপ্রিল তিনি জার্মানির প্রিন্সটন হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
Comments :0