নজরে বেহাল শিক্ষা-২
শিক্ষার অব্যবস্থার বিরুদ্ধে নয়াদিল্লিতে ছাত্রদের বিক্ষোভ কেন্দ্রীয় সরকারকে নাড়িয়ে দিয়েছে। রাজ্যে স্কুলের অব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলেন ইন্দাসের ছাত্র। বিজেপি কর্মীরা খুন করেছে তাঁর বাবাকে। কিন্তু ভয় দেখিয়ে রাজ্যে শিক্ষার অব্যবস্থাকে চাপা দেওয়া যাচ্ছে। স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়— পশ্চিমবঙ্গে বেহাল শিক্ষা ব্যবস্থা। তারই কিছু ছবি তুলে ধরতে এই প্রতিবেদন।
রামশঙ্কর চক্রবর্তী: তমলুক
শিক্ষার হারে রাজ্যের এগিয়ে থাকা জেলা পূর্ব মেদিনীপুরে উচ্চশিক্ষার ছবিই যেন উলটো কথা বলছে। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন জেলার কলেজগুলিতে প্রায় ৭০ শতাংশ আসন ফাঁকা। অর্থাৎ কলেজে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ৩০ শতাংশের মতো পড়ুয়া। কোনও কোনও বিষয়ে ছাত্রসংখ্যা নেমে এসেছে এক-দু’জনে।
উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেও কলেজমুখী হচ্ছেন না বহু পড়ুয়া। তমলুকের অমিতাভ মাইতি ও নন্দকুমারের সৌমেন হাইত এখন তামিলনাড়ুতে ফুলের কাজ করেন। সৌমেনের কথায়, “কলেজে পড়ে চাকরির নিশ্চয়তা না থাকলে তার চেয়ে হাতের কাজ শিখে সংসার চালানো ভালো।” খঞ্চি হাইস্কুলের দুই প্রাক্তন ছাত্র তাপস ও বিমল সাউ গুজরাটে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করছেন। তাঁদের প্রশ্ন, নিয়োগ দুর্নীতির পর নতুন চাকরির নিশ্চয়তা কোথায়?
তাম্রলিপ্ত মহাবিদ্যালয়, মহিষাদল গার্লস কলেজ, মুগবেড়িয়া গঙ্গাধর মহাবিদ্যালয়-সহ জেলার একাধিক কলেজে গত কয়েক বছরে পড়ুয়ার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। শিক্ষামহলের একাংশের মতে, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, শূন্যপদ পূরণ না হওয়া এবং সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট এর অন্যতম কারণ।
জেলায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক মিলিয়ে প্রায় ৯৫২টি বিদ্যালয় রয়েছে। পাশাপাশি ২৫টি ব্লকে গড়ে ১০-১৫টি করে বেসরকারি স্কুল গড়ে উঠেছে। প্রাথমিক স্তর থেকেই বেসরকারি স্কুলের দিকে অভিভাবকদের ঝোঁক বাড়ছে। এক শিক্ষাবিদের মতে, সরকারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি বরাদ্দ কমে যাওয়ার ফলেই এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
অধ্যাপক দেবাশিস মহাপাত্রের বক্তব্য, জেলার বহু স্কুল ও কলেজে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাতও উদ্বেগজনক। এভাবে চলতে থাকলে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সরকার পরোক্ষভাবে শিক্ষার বেসরকারিকরণের পথ প্রশস্ত করছে।
হলদিয়ার দেভোগ পঞ্চায়েত এলাকার একটি মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রে পড়ুয়া মাত্র ৩০ জনের কাছাকাছি। নিয়মিত স্কুলে আসে হাতে গোনা কয়েকজন। শিক্ষক চারজন থাকলেও নেই শিক্ষা কর্মী, বাজে না স্কুলের ঘণ্টা। স্কুলের গেটও নেই। স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, নিয়মিত পঠনপাঠন না হওয়ায় তাঁরা সন্তানদের অন্যত্র পাঠাচ্ছেন।
ভবানীপুরের একটি মাধ্যমিক গার্লস স্কুলেও ছাত্রী সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০। স্থায়ী শিক্ষক চারজন, প্যারা-টিচার দু’জন। পরিস্থিতি সামলাতে শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিজেরাই এলাকায় সচেতনতা কর্মসূচি চালাচ্ছেন। অথচ একই হলদিয়া এলাকায় বেসরকারি স্কুলগুলিতে পড়ুয়ার সংখ্যা ৩০০ বা তার বেশি।
এরই মধ্যে পটাশপুর-১ ও রামনগর-১ ব্লকের দু’টি স্কুলের জমি বিক্রির অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০১১ সালের পর স্কুল পরিচালন কমিটি তুলে প্রশাসক নিয়োগের পর থেকেই বিদ্যালয়গুলিতে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। কলেজগুলিতেও দুর্নীতির অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মহিষাদল রাজ কলেজে অতিথি অধ্যাপক নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সেই বিতর্ককে ফের উসকে দিয়েছে।
Comments :0