রাজ্যের মিড ডে মিল প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়ে দিল ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’।
২০২৬-২৭ আর্থিক বর্ষ শুরু হয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গ ব্যস্ত ছিল বিধানসভা নির্বাচনে। তাই পশ্চিমবঙ্গের প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে মিড ডে মিল দেওয়ার প্রকল্পের পর্যালোচনা বৈঠকও পিছিয়ে গিয়েছিল। সম্প্রতি তা হয়েছে। নয়াদিল্লিতে সেই বৈঠকে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের আধিকারিকরা বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকে ২০২৬-২৭ আর্থিক বছরে রাজ্যের মিড ডে মিল প্রকল্পের বরাদ্দ এবং অন্যান্য পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে।
বৈঠকে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের আধিকারিকরা পশ্চিমবঙ্গের প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক স্তরের পড়াশোনার হাল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাই স্বাভাবিক। রাজ্য সরকারের আধিকারিকরা যে তথ্য পেশ করেছেন তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ক্লাস হওয়ার কথা ছিল ২৪৮দিন। হয়েছে ২১৫দিন। প্রশ্ন উঠেছে, কেন? রাজ্যের আধিকারিকদের কৈফিয়ত হলো, দুর্গাপূজা এবং গরমের ছুটির সময় বাড়ানোর কারণে প্রায় ৩৩ দিন কম ক্লাস হয়েছে স্কুলগুলিতে। এর দায় তৎকালীন তৃণমূল সরকারের। বিশেষত তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির।
বৈঠকে কেন্দ্রীয় সরকারের আধিকারিকরা বলেছেন, ‘‘এটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, গত পাঁচ বছরে লাগাতার স্কুলগুলিতে ছাত্রভর্তি কমেছে। কমেছে ‘কভারেজ’ (লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় মিড ডে মিল খাওয়া ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা)। ২০২১-২২-এ স্কুলগুলিতে ছাত্রভর্তি হয়েছিল ১ কোটি ১৮ লক্ষ ৫৯ হাজার। তা ২০২৫-২৬-এ নেমে এসেছে ১ কোটি ৯ লক্ষ ৯০ হাজারে। একইভাবে ওই পাঁচ বছরে কভারেজ নেমে এসেছে ১ কোটি ১৬ লক্ষ ২২ হাজার থেকে ৭৩ লক্ষ ৬০ হাজারে।’’ কভারেজ কমে যাওয়ার অর্থ হলো, বছরের গোড়ায় যত ছাত্র-ছাত্রী স্কুলে ভর্তি হচ্ছে, তাদের একাংশ স্কুলে যাচ্ছে না। অর্থাৎ ২০২৫-২৬-এ রাজ্যের প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক স্কুলগুলিতে যত ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়েছে গড়ে মিড ডে মিল খেয়েছে তার ৬৭ শতাংশ। কেন এই হাল, সেই বিষয়ে উদ্বেগ জানানোর পাশাপাশি রাজ্য সরকারকে একটি সমীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন কেন্দ্রের শিক্ষা মন্ত্রকের আধিকারিকরা। প্রতিটি জেলার ১০-২০টি বিদ্যালয় বেছে নিয়ে এই সমীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রকের বক্তব্য, ‘‘...পরিযান, ড্রপ আউট, জনবিন্যাসের পরিবর্তন, প্রজনন হার কমে যাওয়া এবং ছাত্র-ছাত্রীদের বেসরকারি স্কুলে ভর্তি হওয়া, এমন কোন কোন কারণগুলি এই সমস্যার পিছনে রয়েছে তা খতিয়ে দেখতে হবে।’’
রাজ্যের বড় অংশের মানুষের পরিযায়ী হওয়া, বেসরকারি স্কুল গজিয়ে ওঠার মতো কারণগুলি রাজ্যে সরকারি স্কুলে ছাত্রভর্তির সমস্যা হিসাবে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত। কিন্তু সমস্যা হিসাবে ‘জনবিন্যাসের পরিবর্তন’ এই প্রথম উচ্চারিত হলো। প্রসঙ্গত, বিজেপি এবং আরএসএস লাগাতার প্রচার চালাচ্ছে যে, অনুপ্রবেশের কারণে পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষ এসে এই জনবিন্যাস পালটে দিচ্ছে। এই প্রচারকে এবার সরকারি সমীক্ষার উপাদান করে তুলতে চাইছে কেন্দ্র এবং রাজ্যের বিজেপি সরকার।
রাজ্যে শিশুদের শিক্ষা যখন এমন সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে বলে কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকার মনে করছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আশা করা যায় যে, মিড ডে মিলে বাড়বে বরাদ্দ। আরও বেশি ছাত্র-ছাত্রীকে মিড ডে মিলের আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হবে। কিন্তু তেমন হয়নি। উলটো হয়েছে। গত আর্থিক বছরে রাজ্যে মিড ডে মিলের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ ছিল ১১৯৫ কোটি ৬৬ লক্ষ ৭১ হাজার টাকা। ২০২৬-২৭’এ তা হয়েছে ১১৪৪ কোটি ৮৯ লক্ষ টাকা। কমেছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। কমানো হয়েছে রাজ্য সরকারের শেয়ারও। ২০২৫-২৬-এ রাজ্য সরকারের বরাদ্দ ছিল ৭০৮ কোটি ৬৮ লক্ষ ৮২ হাজার টাকা। এবার তা নামিয়ে আনা হয়েছে ৬৮১ কোটি ৮২ লক্ষ টাকায়। সব মিলিয়ে গত আর্থিক বছরের তুলনায় বরাদ্দ কমেছে ৭৭ কোটি টাকার বেশি।
মিড ডে মিল সারা দেশে চালু হয়েছিল ২০০১ সালের ২৮ নভেম্বরে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারে। পশ্চিমবঙ্গে তা চালু হয়েছে ২০০৩-এ। পশ্চিমবঙ্গ দেশে তৃতীয় রাজ্য, যেখানে মিড ডে মিল চালু হয়েছিল। গরিব পরিবারের সন্তানদের স্কুলমুখী করা, তাদের সামান্য পুষ্টির বন্দোবস্ত করাই ছিল এই প্রকল্পের লক্ষ্য। পশ্চিমবঙ্গে চালুর দু’বছরের মধ্যেই দেখা যায় স্কুলমুখী ছাত্র-ছাত্রী ৮ শতাংশ বেড়েছিল। গত দেড় দশকে রাজ্যে অবহেলিত হয়েছে এই প্রকল্প। পশ্চিমবঙ্গে গ্রাম বেশি। স্কুলগুলি স্বভাবতই গ্রামে বেশি। ছাত্র-ছাত্রীদের বড় অংশ খেতমজুর সহ কৃষিজীবী এবং ভ্যানচালক, ইটভাটার শ্রমিকদের মতো অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক পরিবারের সন্তান। শিক্ষার অঙ্গন থেকে ছিটকে যাচ্ছে মূলত তারাই।
কিন্তু রাজ্যে সরকার গঠনের পর ‘ভরসা ইন’ দাবি করা বিজেপি’র ভূমিকা এই ক্ষেত্রে গরিব পরিবারের ছাত্রদের ক্ষেত্রে ভরসাযোগ্য হলো না। প্রসঙ্গত, গত এক বছরে রাজ্যে প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয় কমেছে প্রায় ৭৫০টি। ছিল ৮১,৭৮৯। হয়েছে ৮১,০১২টি। গত এক বছরে রাজ্যের প্রাথমিক স্কুলগুলিতে ছাত্রভর্তি কমেছে ৪ শতাংশ। উচ্চ প্রাথমিকে তা ২ শতাংশ। তবে মিড-ডে মিল পাওয়া ছাত্র-ছাত্রী প্রাথমিকে গত বছরের তুলনায় কমেছে ৫ শতাংশ। উচ্চ প্রাথমিকে তা ৬ শতাংশ।
Mid day meal
এ রাজ্যের মিড ডে মিলে বরাদ্দ কমালো ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’
×
Comments :0