editorial

বিপজ্জনক প্রবণতা

সম্পাদকীয় বিভাগ

বিরোধী শাসিত দক্ষিণ ভারতের তিন রাজ্য তামিলনাডু, কেরালাও কর্নাটকে বিধানসভার অধিবেশন শুরুতে রাজ্যপালের ভাষণকে কেন্দ্র করে অনেকটা একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। মাত্র দু’তিন দিনের ব্যবধানে তিন রাজ্যেই শুরু হয়েছে বাজেট অধিবেশন। প্রতি বছর বাজেট অধিবেশন শুরু হয় রাজ্যপালের ভাষণ দিয়ে। চিরাচরিত প্রথা অনুসারে এই অধিবেশনে রাজ্যপাল যে ভাষণটি পাঠ করেন সেটি রাজ্য মন্ত্রিসভা তৈরি করে দেয়। তাতে রাজ্য সরকারের নীতিগত অবস্থান, ভাবনা, উন্নয়নের গতিমুখ, লক্ষ্য, দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি থাকে। রাজ্যপাল যেহেতু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নন, কেন্দ্রীয় সরকার মনোনীত ও নিযুক্ত সাংবিধানিক পদে রাজ্য সরকারের নিয়মতান্ত্রিক প্রধান হিসাবে কাজ করেন তাই তাঁকে নির্বাচিত রাজ্য সরকারের তৈরি করে দেওয়া ভাষণ পাঠ করতে হয়। এখানে রাজ্যপালের ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের কোনও জায়গা নেই। তিনি রাজ্য সরকারের নিয়মতান্ত্রিক প্রধান হিসাবে রাজ্য সরকারের বক্তব্যই তুলে ধরেন তাঁর আনুষ্ঠানিক প্রথাগত ভাষণে।
কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো তিন রাজ্যের রাজ্যপালই তাদের সরকারের তৈরি করা ভাষণ পড়েননি বা আংশিক পড়েছেন। তামিলনাডুর রাজ্যপাল আর এন রবি প্রথামাফিক ভাষণের দু’-তিন লাইন পড়ে বাকি মূল ভাষণ না পড়ে সভা ছেড়ে চলে যান। কর্নাটকের রাজ্যপাল থরহরচাঁদ গেহলটও অনেকটা একই কায়দায় শুরুতে দু’-তিন লাইন পড়ে সভা ত্যাগ করেন। কেরালার রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকার অবশ্য তাঁর বাছাই করা কিছু অংশ বাদ দিয়ে বাকি অংশটা পড়েছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, ভাষণের যে যে অংশে কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা আছে সেগুলিই বাদ দিয়ে ভাষণ পাঠ হয়েছে। তামিলনাডু ও কর্নাটকের রাজ্যপালরা আরও এক ধাপ এগিয়ে অতি বিপ্লবীয়ানা দেখানোর চেষ্টা করেছেন গোটা ভাষণটাই না পড়ে সভা ছেড়ে চলে গিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হলো রাজ্যপালরা এমন আচরণ করতে পারেন কি না। রাজ্যপাল নিতান্তই একটি নিয়মতান্ত্রিক সাংবিধানিক পদ। নীতি নির্ধারণ করার অধিকার বা ক্ষমতা নেই। রাজ্য মন্ত্রিসভাই চূড়ান্ত নীতি নির্ধারক। এক্ষেত্রে রাজ্যপালরা অনধিকার চর্চা করেছেন। সংবিধান প্রদত্ত দায়িত্ব পালনে অস্বীকার করেছেন। এটা রাজ্যপালরা করতে পারেন না।
তিন রাজ্যে রকমফেরে অনেকটা একই রকম ঘটনা মোটেই কাকতালীয় নয় বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কেন্দ্রীয় শাসকদলের রাজনৈতিক অবস্থান অনুসরণ করে রাজ্যপালরা একাজ করেছেন। তাতে কেন্দ্রীয় সরকারের এবং বিজেপি’র পূর্ণ সমর্থন ও মদত ছিল। বিরোধী সরকারকে হেনস্তা করার জন্য আগাম পরিকল্পনা করে কেন্দ্রী‌‌য় নির্দেশে রাজ্যপালরা এমন কাজ করেছেন সন্দেহ নেই। কেন্দ্রীয় মদত বা ইন্ধন ছাড়া কোনও রাজ্যপাল এমন ঔদ্ধত্য দেখাতে পারেন না। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার উপর এটা আঘাত। কেন্দ্রের মনোনীত এক রাজনৈতিক ব্যক্তি রাজ্যের নির্বাচিত সরকারকে অস্বীকার করছে। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে অশুভ লক্ষণ। এমনিতেই রাজ্যপাল পদটিকে অপ্রয়োজনীয় সাদা হাতি পোষা বলে বিতর্ক আছে। মনে করা হয় কেন্দ্রীয় শাসকরা রাজ্যে রাজ্যে বিরোধী দলের সরকারের বিরুদ্ধে সঙ্কীর্ণ রা‍‌জনৈতিক স্বার্থে রাজ্যপালদের ব্যবহার করে। মোদী জমানার এটা ন্যক্কারজনক জায়গায় পৌঁছে গেছে। এহেন আচরণের মধ্য দিয়ে সংবিধানের অনাস্থা, গণতান্ত্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে দুর্বল করার বার্তাই প্রকট হয়। এমনটা কোনও অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না।

Comments :0

Login to leave a comment