Editorials

দুর্নীতির হিসাব দিতেই হবে

সম্পাদকীয়


লুটের হিসাব চাইছে গ্রাম বাংলা। বিপদে পড়েছে রাজ্য সরকার। ভুয়ো হিসাব দেখিয়ে রেগার সাফল্য নিয়ে প্রচার শুরু হয়েছিল। গরিব মানুষ বিরুদ্ধে মুখ খোলায় আর বাড়াবাড়ি করেনি। সুকৌশলে চেপে গেছে সরকার। আর চলতি বছরে তেমন বৃষ্টি না হওয়ায় বিপুল পরিমাণে কমেছে আমন চাষ। এর ফলে কাজ কমেছে খেতমজুরদের। যেটুকু কাজ হয়েছিল, তার মজুরি বকেয়া। সেই বকেয়া আদায়ের দাবিতে পঞ্চায়েত দপ্তরে একাধিকবার গিয়েও কাজ হয়নি। পঞ্চায়েত কর্তারা ভেবেছিলেন সব ‘ম্যানেজ’ করে নেবেন।
ভোট লুট করে গ্রাম পঞ্চায়েত দখল করার পর রাজ্যের শাসক দলের নেতাদের মনে হয়েছিল এইসব মানুষকে দমিয়ে রাখা যাবে। সেই লক্ষ্য পূরণে তৈরি করা হয় ভয়ের বাতাবরণ। হুমকি, মারধর, জরিমানা এবং ঘরছাড়া করা। এরও শেষ আছে। আর দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না। অন্যায়, দুর্নীতি আর লুটের প্রতিবাদে দেওয়ালে পিঠ ঠেকা মানুষগুলি সঙ্ঘবদ্ধ হতেই সিঁদুরে মেঘ দেখে সরকার।
রেগায় কাজ দিতে না পারায় তাদের বিকল্প কাজের কথা বলে ক্ষোভ চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। সেখানেও ব্যর্থ রাজ্য। লুটের অভিযোগে বরাদ্দ বন্ধ রেখে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল আসে জেলায় জেলায়। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়ে। তাঁদের সামনে পেয়েই ক্ষোভ উগরে দেন প্রতারিত মানুষেরা। ঘরের বরাদ্দ নিয়ে আস্ফালনের পরেই শুরু হয় লুটের মহোৎসব। প্রতিবাদে লাল ঝান্ডা নিয়ে বুক চিতিয়ে দিয়েছিলেন সিপিআই(এম) কর্মীরা। সাহসে ভর করে ঘুরে দাঁড়ানো শুরু। তারপর গ্রামের মানুষই সামনে এনেছেন তৃণমূলের একের পর এক দুর্নীতি। আর রোখা যায়নি। দমে কুলোয়নি লুটেরাদের।
স্বর বদলে যায় নবান্নের। ১০ মাসে মাত্র ১৮দিন কাজ দিয়ে গ্রামের অর্থনীতিকে চুরমার করে দিয়েছে। বেড়েছে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা। এখন উদ্বেগ প্রকাশ করে আর কোন লাভ নেই। লুট হওয়া টাকা উদ্ধারে নামার গল্প শুনে গরিব মানুষের পেট ভরবে না। নবান্নের তথ্যই বলছে মুর্শিদাবাদ, পুরুলিয়া, কোচবিহার, বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম বর্ধমানের মতো জেলাগুলিতে আতকে ওঠা ছবি! মিথ্যার ফানুস আর ওড়ানো যাচ্ছে না। সর্বত্রই কাজের আকালের ছবি ধরা পড়েছে। ২০২১ সালে রেগায় এই সময়ে ১ কোটি ১১ লক্ষের বেশি জবকার্ড হোল্ডার কাজ পেয়েছিলেন। আর এবার সরকারের তথ্যই বলছে, এখন পর্যন্ত কাজ জুটেছে মাত্র ২৮ লক্ষ জবকার্ড গ্রাহকের। একবছর আগে শ্রমদিবস তৈরি হয়েছিল ৩২ কোটি। এবার মাত্র ৫কোটির কিছু বেশি। এই পার্থক্যই বলে দিচ্ছে বাংলার গ্রামে গ্রামে কাজের জন্য কতটা হাহাকার চলছে। অর্থনৈতিক সঙ্কট আরও গভীর হয়েছে। 
সবগুলি দপ্তর মিলিয়ে ৬৪ হাজার প্রকল্প হাতে রয়েছে বলে দাবি রাজ্য সরকারের। এর মধ্যে ৫১ হাজারই পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের। তাহলে বাকি দপ্তরগুলির কাজ কী? ব্যর্থতাই স্পষ্ট। ভোট বড় বালাই। গ্রামের মানুষের ভোট। ক্ষোভ সামাল দিতে সরকারি প্রকল্পে একশো দিনের শ্রমিকদের যুক্ত করতে বলা হয়েছে। দুর্নীতিতে ডুবুডুবু সরকার এখন মমতাময়। শেষরক্ষা হবে কি? দুর্নীতির পাহাড়কে চাপা দেওয়া যাবে? যখন ক্ষুব্ধ মানুষের মিছিল পা রেখেছেন গ্রামের রাস্তায়, যখন প্রধান, পঞ্চায়েত সদস্যদের নাম ধরে ধরে তারা লুটের টাকার হিসাব চাইছেন! ধান কাটার মরশুমেও গোধূলি বিকেলজুড়ে পদযাত্রা হচ্ছে। সন্ধ্যায় স্লোগানে মুখর হচ্ছে গ্রাম! ঠান্ডা পড়েনি এখনো। পঞ্চায়েত থেকে তৃণমূলীদের তাড়াতেই তাদের এই অভিযান। চুরি, লুটে অভিযুক্তদের সংখ্যা বাড়ায় উদ্বেগ তো থাকবেই। সেটাই ধরা পড়েছে রাজ্য সরকারের রিপোর্টে।   
 

0 Comments

Login to leave a comment