আশঙ্কা প্রথম থেকেই ছিল। এসআইআর ঘিরে এরাজ্যে মানুষের উদ্বেগ আতঙ্ক বহুদিক থেকেই সত্যি। শুরুর পর থেকে দিন যত গড়িয়েছে ফন্দি-ফিকিরগুলোও ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে, যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়াই এসআইআর করতে নামায় সাধারণ মানুষ যেভাবে হয়রানির শিকার, ফলত ৯ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন যখন তালিকা প্রকাশ করবে তা আদৌ ত্রুটিপূর্ণ থাকবে না এমন আশা করাটাই কঠিন হয়ে পড়ছে। দেখে শুনে মনে হচ্ছে নির্বাচন কমিশন কার্যত দুই শাসক দলের ক্রীড়নক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজেপি আর তৃণমূলের ফন্দি সফল করতে নেমেছে নির্বাচন কমিশন, তাই তাড়াহুড়ো করে এসআইআর। যার জন্য না ছিল পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না ছিল কর্মীবর্গের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, যার ফলে এসআইআর’র কার্যত মানুষকে জেরবার করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে তা হয়ে উঠেছে কমিশনের নির্মম হঠকারিতার উদাহরণ। আর এই সমস্ত আপাত কাণ্ডজ্ঞানহীন কার্যকলাপের আবহতেই আশঙ্কা হচ্ছে খসড়া তালিকা ত্রুটিহীন হবে না। খসড়া তালিকায় নাম না থাকলে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হয়ে ওঠা কিছু অস্বাভাবিক নয়। সেখানেই তৃণমূল-বিজেপি’র ভোটের খেলা। যদি খসড়া তালিকায় কারো নাম না থাকে, তবে ধৈর্য ধরেই তার মোকাবিলা করতে হবে। নাম না থাকলে আতঙ্কিত না হয়ে বরং আবেদন করতে হবে কমিশনে। ভরসার বিষয়, যেভাবে সিপিআই(এম) কর্মীরা এসআইআর-এ নাম নথিভুক্ত করার সময় মানুষকে সহায়তা দিচ্ছেন, সেভাবেই পরবর্তী সময়ে কমিশনের শুনানিতেও তাঁরা মানুষের পাশে থাকবেন, ভোটারদের সহায়তা দেবেন। কোনও প্রকৃত ভোটারের ভোটাধিকার যাতে কেড়ে না নেওয়া হয় সেদিকে কড়া নজর রাখবেন সিপিআই(এম) কর্মীরা।
মাসাধিককাল ধরে স্কুলে পড়ানো বন্ধ হলো, সরকারি কাজ বন্ধ, পরিষেবা শিকেয় তুলে দিয়ে এসআইআর-এ নেমেছিল নির্বাচন কমিশন। বিএলও-দের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি, সার্ভারের অবস্থা শোচনীয়, আপলোড করতে তাঁদের প্রাণান্তকর অবস্থা। অথচ কাজ শেষ করার জন্য বিএলও-দের চাপ বাড়ছে। আতঙ্কে, আশঙ্কায় কঠিন অবস্থায় তাঁরাও। কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনাও সামনে এসেছে। অথচ রাজ্যে ভোটের এখনও বেশ কয়েক মাস দেরি আছে, তাহলে কেন এই তাড়াহুড়ো? সময় নিয়ে, প্রস্তুতি নিয়ে একাজ করার মতো অনেকটাই সময় ছিল কমিশনের হাতে। মৃতদের নাম তালিকা থেকে আগেই বাদ দেওয়া যেত, এই দাবিতো বামপন্থীরা অনেকদিন ধরেই করছে। যদি একাজ আগেই সেরে ফেলা হতো তাহলে এসআইআর-এ চাপ কমতো, এত ফর্ম বিলি করার দরকার হতো না। কমিশন নিজের দায়িত্ব পালন না করে এখন নথির পর নথি চেয়ে মানুষকে হয়রানি করছে। কিন্তু প্রান্তিক মানুষের কাছে সব নথি থাকে না। বহু সরকারি নথিতে তথ্য ভুল থাকে, নাম পদবির বানান একেক জায়গায় একেকরকম থাকে, এই সব কিছু যন্ত্রণার দায় সাধারণ মানুষকে চাপানো হয়েছে এসআইআর’র নামে।
আসলে যা হচ্ছে তা বিজেপি এবং তৃণমূলের রাজনৈতিক পরিকল্পনার অঙ্গ, কমিশন তার দোসর মাত্র। তৃণমূল ভোট লুট করে আর বিজেপি মানুষকে ভাগাভাগি করে ভোটাধিকার কাড়ে। আরএসএস তাদের হিন্দুরাষ্ট্রের পরিকল্পিত উদ্যোগের অংশ হিসাবে সর্বজনীন ভোটাধিকার কাড়তে সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করছে। এলাকা, জাতি, ধর্ম নির্দিষ্ট করে কোথায় কাদের কত ভোটার কমাবে, কত ভুয়ো ভোটার ঢোকাবে তারই চিত্রনাট্য কার্যকর হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে। সার্বজনীন ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই তাই আরও তীব্র করতে হবে। এই লড়াইয়ের সামনে আছে বামপন্থীরাই।
Editorial
আশঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে
×
Comments :0