MUKTADHARA | DIPABALI 1433 | STORY | MOMBATI | SOURISH MISHRA | 8 NOVEMBER 2026 | 4th YEAR

মুক্তধারা | দীপাবলি ১৪৩৩ | গল্প | মোমবাতি | সৌরীশ মিশ্র | ৮ নভেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

MUKTADHARA  DIPABALI 1433  STORY  MOMBATI  SOURISH MISHRA  8 NOVEMBER 2026  4th YEAR

মুক্তধারা

দীপাবলি ১৪৩৩

গল্প : মোমবাতি

সৌরীশ মিশ্র

৮ নভেম্বর ২০২৬ - ৪র্থ বর্ষ

 

অসীমবাবু বাড়ি থেকে বাইরে পা দেওয়া মাত্র আবহাওয়ায় যে শীতের শিরশিরানিটা আজ একটু বেশিই সেটা বেশ অনুভব করলেন। গায়ের পাতলা চাদরটা গলার কাছটায় ভালো করে জড়িয়ে নিলেন তিনি। এখন সকাল সাড়ে পাঁচটা বাজে। অসীমবাবুর হাতে একটা ফুলের সাজি। ওনার বাড়ির ঠিক সামনে রয়েছে একটা শিউলি গাছ। এই সময়টায় অগুনতি ফুল দেয় গাছটা প্রতিদিন। ঐ ফুল তুলতেই চলেছেন অসীমবাবু। সিঁড়ি দিয়ে নেমে প্যাসেজে পড়লেন তিনি। একটু একটু খোঁড়াচ্ছেন উনি। গত ক'দিন হলো পায়ের ব্যাথাটা চাগাড় দিয়েছে তাঁর আবার। এই ব্যাপারটা তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়। ফি বছর সারাটা শীত ভোগায় তাঁকে এই পায়ের ব্যাথা। কাজ থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকেই এই রোগটা বাসা বেঁধেছে তাঁর শরীরে। 
যাই হোক। অসীমবাবু এইবার প্যাসেজ থেকে বাঁ পাশে ঘুরলেন। এই পাশেই শিউলি গাছখানা। আর তখনই সামনের বাউন্ডারি ওয়ালের বাইরে একটা ছোট্ট মেয়েকে দেখতে পেলেন অসীমবাবু। মেয়েটার বয়স বছর দশেকের বেশি হবে না কোনোমতেই। মেয়েটা লক্ষ্য করেনি অসীমবাবুকে। অসীমবাবু দেখলেন, মেয়েটা এক মনে বাউন্ডারি ওয়ালটার ওপর থেকে কি যেন খুঁটে খুঁটে তুলে অন্য হাতে নিচ্ছে। মেয়েটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে, আর অসীমবাবুও চশমা ছাড়া দূরের জিনিস একটু আবছাই দেখেন, তাই অসীমবাবু ভালো দেখতে পেলেন না কি খুঁটে খুঁটে তুলছে মেয়েটা। তাই, তিনি মেয়েটার উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, "অ্যাই মেয়ে, কি নিচ্ছিস তুই পাঁচিল থেকে খুঁটে খুঁটে?"
আচমকা অসীমবাবুর গলা পেয়ে চমকে উঠল পুরো মেয়েটা। তারপর ওর বাঁ হাতটা এগিয়ে দিল সে অসীমবাবুর দিকে। 
অসীমবাবু কয়েক পা এগিয়ে গেলেন এবং দেখলেন, পাঁচ-ছ'টা ভাঙা মোমবাতি মেয়েটার ঐ হাতে। অসীমবাবুর বুঝতে অসুবিধা হলো না, গতকাল কালীপুজোর রাতে যে মোমবাতি গুলো এই পাঁচিলে জ্বালিয়ে ছিলেন তিনি, সেগুলোর যেগুলো জ্বলেনি সেইগুলোই তুলছিল মেয়েটা। অসীমবাবু এইবার জিজ্ঞেস করেন মেয়েটিকে, "কি করবি তুই এগুলো?"
জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা বলতে থাকে এইবার, "আমার বাবা প্রতি বছর মোম কিনে দেয় আমায় কালীপুজোয়। আমি ঐ দিয়ে আমাদের যে ঘরটা আছে সেইটা সাজাই। আমার খুব ভালো লাগে। এইবার বাবার তো শরীর খারাপ। কাজ করতে পারছে না কিছুদিন। টাকা নেই বাবার কাছে। তাই এইবার বাবা কিনে দিতে পারে নি আমায় মোম। আমরা তো থাকি, তোমাদের পিছনে খালপাড়ের যে ঝুপড়িগুলো আছে না, সেখানে। আমি তো প্রতিদিন তোমার বাড়ির এই শিউলি গাছটা থেকে ফুল তুলে নিয়ে যাই বাড়িতে। আজ এসে দেখলাম, অনেক কটা মোম এই পাঁচিলে রয়েছে যেগুলো কিছুটা জ্বলে জ্বলে নিভে গেছে। তাই নিচ্ছিলাম। আজ জ্বালাতাম ঘরে।" টানা কথাগুলো বলে থামে মেয়েটা এইবার।
মেয়েটার কথা শুনে চোখে জল এসে যায় অসীমবাবুর। কোনো মতে সেই আবেগ সামলে বলে উঠলেন তিনি, "শোন মেয়ে, তুই একটু দাঁড়া এখানে, কেমন? আমি আসছি। যাবি না কিন্তু।"
মেয়েটা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ে। 
অসীমবাবু এইবার দ্রুত পা চালিয়ে চললেন। প্যাসেজ থেকে এইবার সিঁড়ি ভাঙছেন তিনি। তাড়াতাড়ি সিঁড়ি ভাঙছেন বলে পায়ের ব্যাথাটা টনটন করছে তাঁর। তবু সেই ব্যাথাটা গ্রাহ্যর মধ্যেই আনছেন না অসীমবাবু। তাঁকে এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শোওয়ার ঘরে যেতে হবে। সেই ঘরেই একটা তাকে রাখা আছে একটা মোমবাতির পুরো প্যাকেট। কালীপুজোর জন্য দুটো প্যাকেট কিনে এনেছিলেন তিনি। একটা লেগেছে ওর মধ্যে। আর একটা যেটা তাকে রাখা আছে সেটা ধরাই হয় নি। ঐ প্যাকেটটা মেয়েটার হাতে তুলে দিতে পারলে তবে নিশ্চিন্ত হবেন তিনি।
অসীমবাবু খোঁড়াচ্ছেন এখন রীতিমতো। তবু, যতটা সম্ভব জোড়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি। চোখের সামনে ভেসে ভেসে উঠছে কেবল তাঁর, সেই ছোট্ট মেয়েটার মুখখানা।

 

--------------------

Comments :0

Login to leave a comment