গত ১২ বছরে দেশের গণতন্ত্র, সাংবিধানিক কাঠামো এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শুধু সরকার পরিবর্তন হলেই সেই ক্ষত মুছে যাবে না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় এবং রাজনৈতিক দলগুলির সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। দ্য হিন্দু সংবাদপত্রকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এভাবেই নরেন্দ্র মোদি সরকারকে নিশানা করলেন কংগ্রেসের প্রবীণ নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। তার দাবি, দেশের মানুষ এখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হচ্ছেন। তাদের মধ্যে অসন্তোষও বাড়ছে।
আগামী ১০ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত হতে চলেছে সোনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথা 'Belonging: A Journey Of Love'। সেই বই প্রকাশের আগে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ এবং বিজেপি সরকারের শাসন নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন তিনি।
ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসের একসময়ের একচ্ছত্র আধিপত্য এখন অতীত। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি কতটা আশাবাদী, সেই প্রশ্নের উত্তরে সোনিয়া বলেন, তিনি এতটা হতাশ নন। তার কথায়, “গত ১২ বছরে আমাদের দেশের কাঠামো, গণতন্ত্র এবং প্রতিষ্ঠানগুলির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই সরকার চলে যাওয়ার পরেও আমাদের ব্যবস্থাকে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে। রাজনৈতিক দলগুলিকে তার জন্য বড় ভূমিকা নিতে হবে। মানুষ এখন অস্থির হয়ে উঠছেন এবং ক্ষতির বিষয়টি বুঝতে পারছেন। তবে আমি আশাবাদী। দেশের মানুষ সুশাসনের প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানাবেন।”
২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতাচ্যুত হলে দেশের রাজনীতি আবার নীতি ও কর্মসূচিভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে ফিরবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও সরব হয়েছেন সোনিয়া। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া এবং ভোটার তালিকা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার বিরুদ্ধে কংগ্রেসের আন্দোলনের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে সাক্ষাৎকারে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরব বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে। কংগ্রেসের অভিযোগ, বিভিন্ন নির্বাচনে ভোট চুরির ঘটনা ঘটেছে। সেই কারণেই ব্যালট পেপারে ভোট ফিরিয়ে আনার দাবিও তুলেছে দলটি।
সোনিয়ার অভিযোগ, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিরোধী দলগুলিকে কোনঠাসা করা হচ্ছে। তার কথায়, “এই সরকারের আমলে কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলি কখনও সমান সুযোগ পায়নি। সমস্ত প্রতিষ্ঠানের উপর তাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন, সংবাদমাধ্যম, বিপুল অর্থবল এবং ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার সবকিছুকেই তারা কাজে লাগাচ্ছে।”
তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও কংগ্রেস লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন তিনি। সোনিয়ার বক্তব্য, বিজেপি ও আরএসএসের আক্রমণের মুখেও কংগ্রেসই একমাত্র দল, যারা ধারাবাহিকভাবে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি ও সহনশীলতা দেখিয়েছে। দলের নেতা-কর্মীদের সাহসের প্রশংসা করে তিনি বলেন, নানা ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও হয়রানির মুখেও দেশের প্রতিটি গ্রাম ও জেলায় কংগ্রেস কর্মীরা সংবিধানের মূল্যবোধ রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে এসআইআর প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশি ১০ মাসে ১৪ বার আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এই প্রতিবেদনকে সামনে রেখেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে কংগ্রেস।
অন্যদিকে, সোনিয়া গান্ধীর গণতন্ত্র সংক্রান্ত মন্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল। তিনি কংগ্রেস নেত্রীকে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মেঘওয়ালের বক্তব্য, “সোনিয়া গান্ধী কি ১৯৭৫ সালের কথা ভুলে গিয়েছেন? সেই সময় গণতন্ত্রকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার প্রবীণ নেতাকে জেলে বন্দি করা হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।”
এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশংসা করে আইনমন্ত্রী বলেন, গত ১২ বছরে মোদি গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করেছেন এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতকে 'গণতন্ত্রের জননী' হিসেবে তুলে ধরেছেন।
সাক্ষাৎকারে জোট রাজনীতি নিয়েও কথা বলেছেন সোনিয়া। তার দাবি, কংগ্রেস সমমনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে একযোগে কাজ করছে। দলের নির্বাচনী সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়ছে বলেও আশাবাদী তিনি। রাজনীতিতে কখনও কখনও আপস অনিবার্য হলেও বিজেপি এবং আরএসএসের সঙ্গে কংগ্রেস কখনও আপস করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন তিনি।
Sonia Gandhi
‘১২ বছরে দেশের গণতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠানগুলির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে', মোদি সরকারকে নিশানা সোনিয়া গান্ধীর
×
Comments :0