রামশঙ্কর চক্রবর্ত্তী: তমলুক
আনন্দপুরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া, তমলুক, ময়নায়, নন্দকুমারে এখন শুধুই হাহাকার। উৎকন্ঠায় পরিবার গুলি। এখনও পর্যন্ত যা জানা গেছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এই তিনটি ব্লকের প্রায় ১৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। পাঁশকুড়া ব্লকের শ্রীকৃষ্ণ মাইতি, বাপন মাঝি, সমরেশ ফাদিকার, তপন দোলাই ময়না ব্লকের বুদ্ধদেব জানা, সৌমিত্র মন্ডল তমলুক ব্লকের দেবাদিত্য দিন্দা, বিমল মাইতি, গোবিন্দ মন্ডল, রামপদ মন্ডল, ক্ষুদিরাম দিন্দা, শশাঙ্ক জানা নন্দকুমার ব্লকের সন্দীপ মাইতি প্রত্যেকেই নিখোঁজ রয়েছেন।
অগ্নিকাণ্ডে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ময়নার দুই যুবক বুদ্ধদেব জানা এবং সৌমিত্র মন্ডলের পরিবার এখন স্বজন হারানোর কান্না। দীর্ঘদিন ধরে দুজনেই ফুলের কাজ করত এঁরা। বুদ্ধদেব জানার পরিবারের লোক জানান, অগ্নিকাণ্ডের দিন সন্ধ্যায় সাড়ে সাতটা নাগাদ ফোনে শেষ কথা হয়েছিল। সকালে খবর পেয়ে ফোন করলে দেখা যায় বুদ্ধদেবের ফোন সুইচ অফ রয়েছে। এখন খোঁজ পাওয়া যায়নি তাঁর। দুই পরিবারের লোকজন উৎকণ্ঠায় রয়েছে। একমাত্র রোজগেরে ছিল তারা। অন্যদিকে ২ বছর আনন্দপুরে ফুলের কাজ করতেন বছর ৩৫’র তপন দোলই। ২০ তারিখ বাড়ি থেকে কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যান তিনি। ২৫ তারিখ রাত ১১ টায় পরিবারের সাথে শেষ কথা হয়। পরিবারের কাছে ফোন আসে কারখানায় আগুন লেগেছে। তারপর একাধিক বার ফোন করেও ফোন সুইচ অফ পায় পরিবারের লোক। এদিকে ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত নিখোঁজ তমলুকের নীলকুণ্ঠা গ্রামের বিমল মাইতি। চোখের জলে বাড়ির ছেলেকে ফিরিয়ে দেওয়ার করুন আর্তি পরিবারের।
সোমবার ভোররাতে আগুন লাগে আনন্দপুর কারখানায়। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কার্যত জতুগৃহে পরিণত হয় কারখানাটি। পূর্ব মেদিনীপুরের মোট ১৩ জন এখনও পর্যন্ত নিখোঁজ। তাদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছাচ্ছে প্রশাসনের লোকজন। নন্দকুমারের বরগোদার বাসিন্দা সন্দীপ মাইতি তিনিও নিখোঁজ। সন্দীপ মাইতির মাধ্যমেই। নীলকুন্ঠার বিমল মাইতি লেবার হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছিলেন প্রায় ১২ বছর আগে। ঘটনার পর থেকে দুজনেই নিখোঁজ।
সূত্রের খবর, যে সব পরিবার এখনও পর্যন্ত নিখোঁজের তথ্য লিখিয়েছেন, তাঁদের সকলকে মঙ্গলবার নরেন্দ্রপুর থানায় গিয়ে ডিএনএ নমুনা দেওয়ার জন্য জানানো হয় পুলিশের তরফে। সেই মতো পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নিখোঁজ পরিবার গুলির লোকজন গিয়ে নমুনা দিয়েছে। এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে পলাতক থাকা কারখানার মালিক গঙ্গাধর দাস গ্রেপ্তার হয়েছে।
আনন্দপুরে বিধ্বংসী আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে মোমো কারখানা। ওই কারখানার পাশেই ছিল একটি ডেকরেটরসের কারখানা ও গোডাউন। সেটিও সম্পূর্ণ পুড়ে গিয়েছে। ওই কারখানায় থাকা কর্মীদেরও মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারখানার মালিক গঙ্গাধর দাস পলাতক ছিল। জতুগৃহ আনন্দপুরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮ হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে বহুজন। বেশীরভাগ পূর্ব মেদিনীপুরের। স্বজনহারাদের কান্না আর্তনাদ এখন আনন্দপুর থেকে মেদিনীপুর জুড়ে। মোমো দোকানের পাশে থাকা কারখানাটি কিসের ছিল?
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার খেজুরি থানার পূর্বচড়া এলাকার বাসিন্দা গঙ্গাধর দাস ৪০ বছর ধরে ডেকোরেটর এর ব্যবসা করেন। দেশের বিভিন্ন রাজ্য সহ বিদেশ থেকে প্লাস্টিক ফুল আমদানি করা হত। অনুষ্ঠান বাড়ি, সভা, সমিতির মঞ্চ সহ বিভিন্ন জায়গা সাজানোর কাজ অর্ডার ধরে করে গঙ্গাধর দাস। পূর্ব মেদিনীপুরের পাশাপাশি আনন্দপুরেও গঙ্গাধর দাসের কারখানা ও গোডাউন ছিল। সেখানেই রবিবার রাতে ভয়াবহ আগুন লাগে। আরও জানা গিয়েছে, আনন্দপুরে প্রায় চার বিঘা জমির উপর রয়েছে এই কারখানা। সরকারি বরাত অনুযায়ী কাজ করত গঙ্গাধর দাস। এই কারখানায় প্রায় ২০০ জন শ্রমিক কাজ কনেন। ব্যবসার এইসব উপকরণ দেশের বিভিন্ন অংশ, বিদেশ এনে আনন্দপুরের এই গোডাউনে রাখা হয়। প্লাস্টিকের সরঞ্জাম, ফুল, কাঠ, কাপড়, চেয়ার সহ ডেকোরেশনের বিপুল সামগ্রী মজুত ছিল কারখানায়। সবই প্রায় দাহ্যবস্তু থাকায়। দ্রুত সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পর থেকেই গঙ্গাধর দাসের খেজুরির বাড়িও বন্ধ থেকেছে। পলাতক ছিলেন গঙ্গাধর দাস। তার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকে। মাঝেমধ্যে গঙ্গাধর দাস গ্রামের বাড়িতে যেত বলে জানা গেছে। খেজুরিতে একটি নার্সারি স্কুল ও একটি বিএড কলেজ রয়েছে তার। কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা চালায় এই গঙ্গাধর। নরেন্দ্রপুর থানায় তার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়। অবশেষে গ্রেপ্তার হয় গঙ্গাধর দাস।
Anandapur Fire
স্বজনহারাদের কান্না আর্তনাদ আনন্দপুর থেকে পূর্ব মেদিনীপুরে
×
Comments :0