Krishnanagar

অধিকার বুঝে নিতে রাস্তায় নেমেছেন মানুষ

রাজ্য

বিজন বিশ্বাস: কৃষ্ণনগর 
রাজ্যজুড়ে মুখ্যমন্ত্রীর ছবির সঙ্গে সততার প্রতীক লেখা হোর্ডিং ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে, রাস্তায় বাড়ছে লাল ঝান্ডার স্রোত। বৃহস্পতিবার নদীয়ার কৃষ্ণনগর শহরে জেলা বামফ্রন্টের ডাকে বিশাল মিছিলের পরে জনসমাবেশে সিপিআই(এম)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী এই মন্তব্য করে বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী আগে দূরবীন দিয়েও লাল ঝান্ডা দেখতে পাচ্ছিলেন না, এখন লাল ঝান্ডা হাতে জনস্রোত দেখে নবান্নে কাঁপুনি ধরে গেছে। বাংলার মানুষ এবার নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে লাল ঝান্ডা হাতে রাস্তায় নেমেছেন, সব হিসাব তাঁরা বুঝে নেবেন। 


এদিন কৃষ্ণনগর শহরে বিশাল মিছিল করে হাজার হাজার মানুষ নদীয়া জেলা বামফ্রন্টের ডাকে জেলা সভাধিপতির কাছে স্মারকলিপি দিতে সমবেত হয়েছিলেন। কিন্তু আগাম জানানো সত্ত্বেও নদীয়া জেলা সভাধিপতি এবং অতিরিক্ত জেলা শাসকের কেউই স্মারকলিপি গ্রহণ করার জন্য উপস্থিত থাকেননি। জেলার মানুষের সমস্যা সংক্রান্ত ১৭ দফা দাবির কথা কানে তুলতেই অস্বীকার করল জেলা পরিষদ। সুজন চক্রবর্তী এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, হাজার হাজার মানুষ এখানে উপস্থিত হয়েছেন। তাঁরা এই জেলার মানুষ, অথচ তাঁদের দাবির কথা শুনতেও তৃণমূলের এত ভয়? আসলে জনগণের ভোটে জেলা পরিষদে এরা নির্বাচিত হয়নি, গায়ের জোরে জেলা পরিষদ দখল করেছে। সভাধিপতি এখন পালিয়ে গেলেও পার পাবেন না, মানুষ সোচ্চার হয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছে। আর সরকারি অফিসার যারা নিজেদের টিকি বাঁধা রেখেছেন পিসি ভাইপোর কাছে, তাঁরাও রেহাই পাবেন না জনগণের প্রতি অন্যায় করলে। 


সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, মাঠে ঘাস থাকলে গোরু যেভাবে মাঠে ঢোকে, সেভাবেই তৃণমূল থাকলে বিজেপি ঢুকছে। এই দুই শক্তির হাতেই মানুষের জীবনজীবিকা গণতন্ত্র আক্রান্ত। রাজ্যকে বাঁচাতে তৃণমূলকে হটাতে হবে, তেমনই দেশকে বাঁচাতে বিজেপি-কেও হটাতে হবে। এটাই সময়ের দাবি। তৃণমূল এবং বিজেপি’র কেউ কারো বিকল্প নয়, লাল ঝান্ডাই একমাত্র বিকল্প। 


এদিন কৃষ্ণনগর সদর হসপিটাল মোড় থেকে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে বিরাট এক মিছিল কৃষ্ণনগর কালেক্টরেট মোড়ের অবস্থান-বিক্ষোভ সভায় এসে মিলিত হয়। মোড়ে তখন তিল ধরানোরও জায়গা ছিল না। দৃপ্ত মিছিলের যাত্রা পথের দুধারেও বহু মানুষ উপস্থিত হয়ে মিছিলকে সমর্থন করেছেন, সংহতি জানিয়েছেন। 
অবস্থান-বিক্ষোভসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা বামফ্রন্টের আহ্বায়ক তথা সিপিআই(এম)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুমিত দে। সুজন চক্রবর্তী ছাড়াও সভায় বক্তব্য রাখেন আরএসপি’র নেতা সুবীর ভৌমিক, সিপিআই’র নেত্রী শ্যামশ্রী দাস, ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা অরুণ ধর, সিপিআই(এম) নেতা মেঘলাল শেখ ও অসীম ঘোষ। এছাড়াও মিছিলের নেতৃত্বে ও মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সিপিআই(এম)’র রাজ্য কমিটির সদস্য রমা বিশ্বাস, অলকেশ দাস, আরএসপি নেতা শঙ্কর সরকার প্রমুখ।


সভায় সুজন চক্রবর্তী বলেন, গ্রামে গ্রামে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন গরিব মানুষ। তৃণমূল বিজেপি’র নকল লড়াইয়ের ছক মানুষ বুঝে ফেলেছেন। তাই অমিত শাহকে ছুটে আসতে হচ্ছে। তৃণমূল কাঁথিতে নিজেদের সভা বাতিল করে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর সভাকে সফল করার জন্য ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু অমিত শাহ থেকে নরেন্দ্র মোদী কেউই আর বাঁচাতে পারবে না তৃণমূলকে। লুটের হিসাব মানুষকে দিতেই হবে। ফেরত দিতে হবে গ্রামের পর গ্রাম থেকে নেওয়া তোলাবাজির টাকা। পুলিশ দিয়ে রোখা যাবে না মানুষকে।


তিনি বলেন, নদীয়া জেলার প্রাইমারি শিক্ষা পর্ষদের চেয়ারম্যান বিমলেন্দু সিংহ রায় তৃণমূলের বিধায়ক। তাঁর বিরুদ্ধে তাঁর দলের লোকই অভিযোগ জানাচ্ছেন টাকার বিনিময়ে চাকরি বিক্রির। টেট কেলেঙ্কারি দুর্নীতির নায়ক তৃণমূলের বিধায়ক, অধ্যাপক মানিক ভট্টাচার্য গ্রেপ্তার হয়েছেন। এরকম অনেক মানিক তৃণমূলের ঝুলিতে আছে। তাঁরা চাকরির নামে কোটি কোটি টাকা লুট করেছেন, আর বেকার যুবক-যুবতীদের স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছেন। তার জবাব দিতে হবে না? জেলার মৃৎশিল্প ধ্বংসের মুখে, তাঁত শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত। নদীয়ার চাষের যে বৈচিত্র ছিল বর্তমানে তা ধ্বংসের মুখে। আবাস যোজনার ঘর নিয়েও দুর্নীতি। অবিলম্বে আবাস যোজনার প্রাপকদের তালিকা প্রকাশ্যে আনতে হবে। 


এদিনের মিছিল এবং সভা থেকে অবিলম্বে পলাশী সুগার মিল চালু, লুটের টাকা ফেরত, জেলার কালনা সেতু, বল্লভপাড়া-কাটোয়া সেতু নির্মাণ, সঠিক ও ন্যায্য বাস ভাড়া নির্ধারণ, ৩৪ নং জাতীয় সড়ক সহ জেলার সড়কপথ সম্প্রসারণের কাজ দ্রুত শেষ, পুনর্বাসন ছাড়া বস্তি উচ্ছেদ বন্ধ করা, গঙ্গা সহ নদী ভাঙন রোধের ব্যবস্থা, রাসায়নিক সারের কালোবাজারি রুখতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেশের ও দেশের বাইরে কাজে যাওয়া পরিয়ায়ী শ্রমিকদের সরকারি পরিচয়পত্র প্রদান, অসংগঠিত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় আনা, জলঙ্গি চূর্ণী অঞ্জনা সহ জেলার নদী ও জলাভূমির সংস্কার, একশো দিনের কাজ চালু করা, জেলার কলেজে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে এনে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করা, জেলার শান্তি-শৃঙ্খলা সম্প্রীতির পরিবেশ রক্ষা ও দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ। 


এদিনের সভা মঞ্চে ব্যাঙ্ক কর্মচারী আন্দোলনের সংগঠক চিন্ময় দত্ত গণশক্তির তহবিলের জন্য ১০ হাজার টাকা, জ্যোতি বসু সমাজবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের তহবিলে প্রদীপ বিশ্বাস ৫ হাজার টাকা ও সিপিআই(এম) নেতা শান্তি দাস ২ হাজার টাকা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর হাতে তুলে দেন।

Comments :0

Login to leave a comment